তিনতলা বাড়িটা রংচটা, দেখে মনে হয় বেশ পুরোনো। সামনে অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল পড়ে আছে, সব কটিই অচল। বাড়ির অবস্থা কিংবা সামনের পরিবেশ দেখে বিশ্বাস করা কঠিন যে এটা একটা থানা। সামনে অপেক্ষমাণ পুলিশের গাড়িতে লেখা নাম পড়ে বোঝা গেল, এটাই শাহ আলী থানা।
রাজধানীর অন্যতম ঘন বসতিপূর্ণ মিরপুর এলাকার জনগণের নাগরিক সুবিধা বাড়াতে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহ আলী থানা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাড়া বাড়িতে চলছে এর কার্যক্রম। এখন কার্যক্রম চলছে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে বি ব্লকের ২৯ নম্বর রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে। জনবলসহ নানা সংকটে ভুগছে এই থানা।
প্রশাসনিক সব কার্যক্রম, হাজতখানা, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষ, সেরেস্তাদারের কক্ষ ও গুদামঘর—এই সবকিছুই একসঙ্গে বাড়ির নিচতলায়। ছোট হাজতখানায় ১০ জন হাজতির জায়গা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই সেখানে গাদাগাদি করে প্রায় দ্বিগুণ কয়েদি রাখতে হয়।
আরও বড় সমস্যা হয় কোনো নারী গ্রেপ্তার হলে। থানায় দায়িত্বরত কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম বলেন, নারী আসামি রাখার জন্য শাহ আলী থানায় কোনো জায়গা নেই। নারী পুলিশের প্রহরায় গুদামঘরে রাখা হয় তাঁদের।
বাড়ির ওপরের দুই তলা উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলদের বিশ্রাম নেওয়া ও থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের নির্দেশনায় আছে, থানার সামনে সিটিজেন চার্টার থাকতে হবে। কিন্তু এ থানায় তা নেই। প্রতি থানার সামনে এলাকার কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনারের ফোন নম্বরসংবলিত যে তালিকা থাকার কথা, তা-ও নেই। এই এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে থানার ট্রাফিক বিভাগের কী কার্যক্রম চলছে, সে বিষয়েও কোনো তালিকা চোখে পড়েনি।
আহত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের সাহায্যার্থে তৈরি হয়নি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার কিংবা দ্রুত সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত কার্যক্রম ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাই, নিজেদের প্রশাসনিক কাজ ঠিকভাবে করার জায়গাই তো এখনো পাইনি। এগুলো কীভাবে করব! আপনি যে তালিকার কথা বললেন, ওগুলো কয়েক দিন আগে ঝড়ে ছিঁড়ে গেছে। আবার লাগানো হবে।’
থানার সামনের রাস্তা ধরে ডান দিকে এগোলে দেখা যায়, সেখানে একতলা একটা টিনশেড কক্ষে বসে এক পুলিশ কর্মকর্তা লেখালেখি করছেন।
দায়িত্বরত কর্মকর্তা বলেন, ‘ওখানেও (টিনশেড কক্ষে) প্রশাসনিক কাজ চলে। এই থানায় অবকাঠামো সমস্যা এত বেশি যে কখনো কখনো মামলা লেখার জন্যও কোনো জায়গা পাওয়া যায় না। গতকাল আমাকে মামলা লিখতে হয়েছে বাড়িতে বসে।’
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেনের কাছে অবকাঠামোগত এই সমস্যার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা থানায় স্থায়ী ভবনের জন্য দুটি জায়গা চিহ্নিত করেছি। পুলিশের মহাপরিদর্শককে সে বিষয়ে জানিয়েছি। কিছুটা সময় লাগলেও আশা করছি অবকাঠামো সমস্যার সমাধান হবে।’
আনোয়ার হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, এই থানায় কাজ করেন প্রায় ১৩০ জন পুলিশ। আর থানার জনসংখ্যা এক লাখের বেশি। উপরন্তু প্রায়ই সরকারি নানা প্রয়োজনে এই পুলিশদের অনেককে অন্যত্র দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়।
এই জনবলে চলে কি না জানতে চাইলে আনোয়ার বলেন, ‘বোঝাই যাচ্ছে, এটা যথেষ্ট নয়। তবে ভাই, আমি চাইলেই তো আর সবকিছু হবে না।’