শেষ মুহূর্তে ফাঁসি স্থগিত

আবদুল কাদের মোল্লা
আবদুল কাদের মোল্লা

চরম নাটকীয় কয়েকটি ঘণ্টা পার করল বাংলাদেশ। গতকাল সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময়টা কেটেছে রুদ্ধশ্বাস। ঘোষিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির কার্যক্রম স্থগিত করলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি।

১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। ৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। ৮ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়।

সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লার স্ত্রী সানোয়ার জাহানের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। তাতে লেখা ছিল, ‘রাত আট ঘটিকার সময় আপনাকে আবদুল কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানানো হলো। বিষয়টি অতিব জরুরি।’ এর পরই বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হয়।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সংবাদ ব্রিফিং করে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, (গত) রাত ১২টা এক মিনিটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। সে অনুযায়ী সবকিছু প্রস্তুত করা হয়। দেশে এই প্রথম কোনো ব্যক্তির ফাঁসির রায় কার্যকর করার ক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো।

এই ঘোষণার পরপরই কাদের মোল্লার আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের বাসায় হাজির হন। তাঁরা দণ্ড স্থগিতের আবেদন করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চেম্বার বিচারপতি আদেশ দেন, আজ সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ফাঁসির কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গতকাল রাতে কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের বিজয় চিহ্ন (‘ভি’) দেখান তাঁর স্ত্রী ছবি: প্রথম আলো



কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ফাঁসির কার্যকারিতার স্থগিতাদেশ চেয়ে চেম্বার জজের কাছে আবেদন করেছিলাম। চেম্বার বিচারপতি রায়ের কার্যকারিতা বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত স্থগিত করেছেন।’
এর পরই তাঁরা আদেশের কপি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান এবং কারা কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করেন।

৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের আদেশসংবলিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করলেও তাঁর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে কোনো ত্বরিত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তবে তিন দিনের মাথায় মৃত্যু পরোয়ানা জারি হওয়ার পর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন তাঁর আইনজীবীরা। তাঁরা রায় কার্যকর থেকে বিরত থাকার দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেন।

কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে কারা ফটকে কাদের মোল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাঁর আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক ও তাজুল ইসলাম। সকাল সাড়ে ১০টায় তাঁরা কারাগারের ভেতরে ঢোকেন। ৫০ মিনিট পরে তাঁরা বের হন।

কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হবে এমন খবর প্রচার হওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে ভিড় করেন গণমাধ্যমের কর্মীরা। এ সময় কারাগার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক পাহারায় ছিলেন ছবি: প্রথম আলো

আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুটি বিষয়ে তাঁর (কাদের মোল্লা) সঙ্গে কথা বলেছি। এক. রিভিউ ফাইল করা। দুই. রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। তিনি (কাদের মোল্লা) জানান, ২১ অথবা ২২ তারিখের মধ্যে আবার আমাদের সঙ্গে কথা বলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।’
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী বলেন, ‘৮ ডিসেম্বর ওয়ারেন্ট (মৃত্যু পরোয়ানা) পাওয়ার দিন থেকে সাত দিনের মধ্যে তাঁর ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ আছে।’

দুই প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং:
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বাসায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, ‘বিচারিক সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আজকের (গতকাল) রাতের মধ্যে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তা কার্যকর হবে।’
এ সময়ে রায় কার্যকরের বিষয়ে বিভিন্ন আইনি ব্যাখ্যা দেন আইন প্রতিমন্ত্রী।

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি কাদের মোল্লা: আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইনে তাঁর (কাদের মোল্লা) যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আছে, তা নিশ্চিত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর একটি সুযোগ ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার। দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। তিনি বলেছেন, প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। ফলে এখন কেবল রায় কার্যকর করাই বাকি।

কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হবে—এমন খবর প্রচার হওয়ার পর গতকাল রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরে শিবির কর্মীরা বাসে আগুন ধরিয়ে দেন ছবি: প্রথম আলো



বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ: আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে গত রোববার কাদের মোল্লার পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারাগার, ঢাকার ডিসি অফিসসহ যেখানে যেখানে পাঠানোর প্রয়োজন, নিয়মানুযায়ী সব জায়গায় তা পাঠানো হয়েছে। এর পর থেকে রায় কার্যকরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি নিয়েছে।

আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা লক্ষ করলাম, কাদের মোল্লার কয়েকজন আইনজীবী এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। আজ সকালে (গতকাল) কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করে এসে আবদুর রাজ্জাক (কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী) যেসব কথা বলেছেন, তা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য তাঁরা এসব কথা বলছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদিও এই আইনে পর্যালোচনা (রিভিউ) করার কোনো সুযোগ নেই, তবু আমরা ভেবেছিলাম যে পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর দ্রুত তাঁরা সাজা স্থগিতের জন্য হয়তো চেম্বার জজের কাছে যাবেন। কিন্তু রোববার থেকে তিন দিন সময় পেলেও তাঁরা যাননি। সুযোগ গ্রহণ করেননি, বরং বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন।’

উচ্চপর্যায়ে বৈঠক:
এর আগে দুপুরে আইন মন্ত্রণালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রায় কার্যকরের আইনি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর আইন উপদেষ্টা শফিক আহমেদ, আইন প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গত সোমবারও আইন মন্ত্রণালয়ে একই বিষয় নিয়ে বৈঠক হয়েছিল।

সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গতকাল রাতেই যে ফাঁসি কার্যকর করা হবে, সরকার সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগের দিন সোমবার। এই সিদ্ধান্তের কথা সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে জানিয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তাঁর ঢাকা সফরকালে ফাঁসি কার্যকর না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সরকারের উচ্চপর্যায় তাঁর এই অনুরোধ বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছিল।

এরই মধ্যে গতকাল আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। সরকারের দুই প্রতিমন্ত্রী অতি উৎসাহী হয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে রাত ১২টা এক মিনিটে ফাঁসি কার্যকর করার ঘোষণাও দেন। এই ঘোষণার পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ, অতীতে কখনো এভাবে আগাম ঘোষণা দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। দুই প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রী বিরক্তি প্রকাশ করেন।
সরকারের ভেতরে তীব্র সমন্বয়হীনতার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে সরকারের ওই সূত্র মনে করে।

কারাগারে পরিবার:
সন্ধ্যা সাতটার দিকে দুটি গাড়িতে করে কাদের মোল্লার পরিবারের ২৩ সদস্য কারা ফটকে পৌঁছান। রাত আটটার দিকে তাঁরা কারাগারের ভেতরে যান। আটটা ৫০ মিনিটে তাঁরা বের হয়ে আসেন।

বের হয়ে এসে কাদের মোল্লার ছেলে হাসান জামিল বলেন, ‘আমরা আধা ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, সকালে জেল কর্তৃপক্ষ বলেছে, কারাবিধি অনুযায়ী ক্ষমা চাওয়ার জন্য সাত দিন সময় পাবেন। এখন তাড়াহুড়া করা হচ্ছে।’ এটা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন হাসান জামিল।

স্থগিতাদেশ:
রাত সাড়ে আটটার দিকে কাকরাইলের জাজেস কমপ্লেক্সে চেম্বার বিচারপতির বাসায় যান আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুর রাজ্জাক ও তাজুল ইসলাম। তাঁরা কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেন। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেলকে উপস্থিত করার জন্য তাঁদের পরামর্শ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন এবং পরে সরাসরি অ্যাটর্নি জেনারেলের মিনিস্ট্রিয়াল অ্যাপার্টমেন্টের বাসায় যান। সেখানে তাঁকে না পেয়ে রাত সোয়া নয়টার দিকে আইনজীবীরা আবার চেম্বার বিচারপতির বাসায় যান। আদালত আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ফাঁসির কার্যক্রম স্থগিত করেন।

যোগাযোগ করা হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, ‘রাত পৌনে ১১টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাকে আদেশটি দেখিয়েছেন। পরে ওই কর্মকর্তা কারা কর্তৃপক্ষকে আদেশটি অবহিত করতে নিয়ে যান।’

রাত ১২টার দিকে খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা শোনার পর আমরা দুটি আবেদন নিয়ে চেম্বার বিচারপতির বাসায় যাই। একটি পুনর্বিবেচনার আবেদন, অন্যটি দণ্ডাদেশ কার্যকরে স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন। দুটি আবেদনের অনুলিপি দেওয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের বাসায়ও যাই। তবে বাসা তালাবদ্ধ ছিল।

অ্যাটর্নি জেনারেলের নিরাপত্তাকর্মী জানান, আধা ঘণ্টা আগে অ্যাটর্নি জেনারেল বাইরে বেরিয়েছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে গিয়েও তা বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের একজন অফিসার ইন চার্জকে নিয়ে রাত নয়টার দিকে চেম্বার বিচারপতির বাসায় যাই। চেম্বার বিচারপতি আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। এই আবেদনের ওপর আজ নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হবে। আমরা আবেদনে উল্লেখ করেছি, অ্যাটর্নি জেনারেলকে অনুলিপি দিতে পারিনি।’

জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু আমাকে অবহিত করা হয়নি, আদেশ আমার উপস্থিতিতে হয়নি। তাই আদেশ হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে আমি মন্তব্য করতে পারব না। কতগুলো গণমাধ্যমে দেখাচ্ছে, আমি ছিলাম এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এগুলো করানো হচ্ছে।’