
প্রস্তাবিত বাজেটে পাচার করা টাকা বিনা প্রশ্নে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখার সমালোচনা করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেছেন, এই বাজেট অনৈতিক বাজেট। কিছুসংখ্যক সুবিধাভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীকে সুযোগ দিতে এই বাজেট করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২২–২৩ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির দুজন সংসদ সদস্য এসব কথা বলেন। আজ থেকে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে সাধারণ আলোচনা শুরু হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান বলেন, অর্থ পাচারকারীদের শাস্তি না দিয়ে নামমাত্র কর দিয়ে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব অনৈতিক। অবৈধ অর্থ ঢালাওভাবে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক—কোনো দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয়। টাকা পাচারকারীদের অর্থ নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি টাকা পাচারকারীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানান।
প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়ে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, এই বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমানোর কার্যকর কোনো কৌশল এই বাজেটে নেই।
প্রস্তাবিত বাজেটকে অনৈতিক বাজেট আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এখানে পাচার করা টাকা বিনা প্রশ্নে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাই এটা অনৈতিক বাজেট। তিনি বলেন, এই বাজেট বৃহৎ ব্যবসাবান্ধব, প্লাস্টিকবান্ধব, তামাক কোম্পানিবান্ধব বাজেট। এই বাজেট সমস্যা সমাধানের বাজেট নয়, গণমুখী নয়। এই বাজেট মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়াবে।
প্রস্তাবিত বাজেটকে সতর্কতার বাজেট হিসেবে বর্ণনা করে জাতীয় পার্টির এই সদস্য বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বিপুল ঘাটতির বাজেট। ৯৮ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে। এটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এই বাজেটের ফলে ব্যাংক, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ চাপে পড়বে। তিনি করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ করা, এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো, কর সক্ষমতা বাড়ানো, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা ৫ শতাংশ করা, প্রবাসীদের পেনশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা, দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনেরও সমালোচনা করেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কারণে বিব্রতকর অবস্থায় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে কী কী প্রশ্ন করতে হবে, তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের টিউটোরিয়াল পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দেশের সাংবাদিকদের এ রকম টিউটোরিয়াল নোট দিয়ে আরেকটি দেশের রাষ্ট্রদূতকে তাঁর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গুম, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করার অনুরোধ করেছেন বলে জানা নেই। এখানে পেশাদারত্ব দরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন চীন–ভারত–যুক্তরাষ্ট্র—এই ‘ট্রায়লাটারিজমের’ মধ্যে পড়ে গেছে। এখন ঐকমত্য ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে না।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বাজেটে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে এই বাজেটে বায়ুদূষণের বিষয়টি স্থান পাওয়া উচিত ছিল। আরেকটি সমস্য সড়ক দুর্ঘটনা। এই সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে কমানো হবে?
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখানে আইন প্রণয়ন করি, কিন্তু তার সুফল জনগণ কতটুকু পাচ্ছেন? আদালতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ২৯ লাখ মামলা ঝুলে আছে। যেগুলো নিষ্পত্তি হয়নি। বাজেটে এই বিষয়ে আমরা উদ্যোগ ও নির্দেশনা দেখতে চাই।’
তামাক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, ‘আমরা তো তামাক কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে সংসদে আসিনি।’
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে তামাকের কারণে। প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যেভাবে চলছে, তাতে ২০৮০ সালেও দেশ তামাকমুক্ত হবে না।
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তো সরকারি দলের। আমি নৌকার টিকিট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছি। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পাশে আমি আছি। সেটা আমি সমর্থন করছি। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি যখন আসে, তখন আমাদের চুজ করতে হয়।
প্রাথমিক যে প্রস্তাবনা অর্থমন্ত্রী এনেছেন, সেখানে স্পষ্টত কনফ্লিক্ট আছে। এই প্রস্তাবনা সংবিধান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, ফেমওয়ার্ক অব টোব্যাকো কনভেনশন এবং আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে। তাহলে আমরা কী করব। আমরা কী ভোটদান থেকে বিরত থাকব? আমরা তো সেটা চাই না। আমরা তো অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবনার সঙ্গে শতভাগ সমর্থন করতে চাই।’
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর বক্তব্যে প্রশ্ন রাখেন কারা টাকা পাচার করেছে, কোথায় পাচার করেছে? তিনি তাদের নাম জানতে চান। তিনি বলেন, তিনি একজনের কথা জানেন, যাঁর পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তিনি কোকো (আরাফাত রহমান)।
অন্যদের মধ্যে সরকারি দলের সংসদ সদস্য রমেশচন্দ্র সেন, হাবিবে মিল্লাত, আবদুস সোবহান, আরমা দত্ত, আনোয়ারুল আবেদিন খান, নাজিম উদ্দীন, সাইফুজ্জামান প্রমুখ বাজেট আলোচনায় অংশ নেন।