সমবায় সমিতির নিবন্ধন নিয়ে শরীয়তপুরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ব্যাংকের আদলে সমিতিগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন মেয়াদি আমানত জমা রাখছে। অধিক মুনাফার আশায় সমিতিগুলোতে আমানত রেখে অনেক গ্রাহক সর্বস্ব হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা ও আমানত জমা রাখায় গ্রাহকের কয়েক শ কোটি টাকা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
গত মে মাসে ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ফিউচার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামে দুটি সমিতি গ্রাহকদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায়।
জেলা সমবায় কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সমবায় সমিতির নিবন্ধন নিয়ে শরীয়তপুরে ১২০টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে ব্যাংকের আদলে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিপিএস আমানত, এককালীন আমানত, মাসিক মুনাফা আমানত, পেনশন স্কিমসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে। সমিতিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমও চালাচ্ছে।
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিধিমালা অনুযায়ী বার্ষিক সাধারণ সভার অনুমোদন ছাড়া কোনো সমিতি সদস্যদের কাছ থেকে আমানত ও ঋণ গ্রহণ করতে পারবে না। শরীয়তপুরে কোনো সমবায় সমিতি বার্ষিক সাধারণ সভা করে না। এদিকে সমিতির সদস্য ছাড়া আমানত সংগ্রহ না করার নির্দেশ থাকলেও তা অমান্য করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, জেলায় এক হাজার ৪৯২টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি সমিতি অবৈধভাবে ব্যাংকের আদলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে ও আমানত সংগ্রহ করছে। সমিতিগুলো গ্রাহকের আমানতের টাকা দিয়ে কর্মকর্তাদের নামে জমি কিনছে। মূলধনের ২৫ শতাংশ হারে তফশিলভুক্ত ব্যাংকে জমা রাখার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
ম্যাক্সিমাম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামে একটি সমিতি অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১২০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে চার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে। প্রতি মাসে মুনাফা বাবদ গ্রাহকদের নয় লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের টাকা দিয়ে শরীয়তপুরে আসবাবের একটি দোকান, পোশাকের একটি দোকান ও ২৭ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করেছে। আমানতের টাকা ফেরত না দিয়েই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আত্মগোপন করতে পারেন, এমন আশঙ্কা গ্রাহকদের।
সমবায় আইন ভঙ্গ করে সমাজ উন্নয়ন সমবায় সমিতি তিনটি শাখা খুলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। সমিতিটি প্রায় দুই হাজার গ্রাহকের মধ্যে দুই কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নড়িয়া উপজেলার বৈশাখীপাড়া গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রতি লাখে মাসিক দুই হাজার টাকা মুনাফা পাওয়ার শর্তে সমাজ উন্নয়ন সমবায় সমিতিতে তিন লাখ টাকা আমানত রেখেছি। সম্প্রতি কয়েকটি সমিতি গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। এ আতঙ্কে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করছি। কিন্তু তারা টাকা ফেরত দিচ্ছে না।
সদর উপজেলার সুবচনি গ্রামের আবদুস সালাম বলেন, ‘ম্যাক্সিমাম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে দেড় লাখ টাকা আমানত রেখেছি। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। এ জন্য আতঙ্কে দিন কাটছে।’
ম্যাক্সিমাম বহুমুখী সমবায় সমিতির পরিচালক আবদুস সালাম হাওলাদার বলেন, অনেক গ্রাহক টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন। অনেকের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সমাজ উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সমবায় আইন অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কয়েকটি সমিতি গ্রাহকদের টাকা নিয়ে চলে যাওয়ায় আমরাও চাপের মধ্যে আছি।’
জেলা সমবায় কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল বলেন, শরীয়তপুরে বেশ কিছু সমিতি নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা ও গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। সমিতিগুলোকে চিঠি দিয়ে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।