
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাশাপাশি অন্য সব উৎস থেকে করোনার টিকা সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। দ্রুত সময়ে যাতে টিকা আনা যায়, সে জন্য বহুমুখী যোগাযোগ ও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, প্রয়োজনে টিকা ব্যবহারের জরুরি অনুমোদনও দেওয়া হতে পারে।
সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার জন্য ভারতের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট ও দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে। গতকাল শুক্রবার ভারতে জরুরি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এর এক দিন আগে ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি করোনা টিকার জরুরি ব্যবহারের বৈধতা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়া এটিই প্রথম কোনো টিকা।
বেক্সিমকো মূলত বাংলাদেশে অক্সফোর্ডের টিকা সরবরাহের কাজ করবে। বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশে টিকাটির অনুমোদন দেওয়ার পর সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশকে টিকা দেবে। ছয় মাসে ছয়টি চালানে এই টিকা আসবে। প্রতি চালানে ৫০ লাখ করে টিকা আসবে।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে যেসব টিকা ব্যবহার করা হয়, তার সব কটিই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়া। করোনার টিকার ক্ষেত্রে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করবে কি না, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘প্রতিটি টিকা এ দেশে অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য ও সব ধরনের কাগজপত্র আমরা সংগ্রহ করব। তবে দ্রুতই অনুমোদনের পথে যাব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সম্ভাব্য সব উৎস থেকে দ্রুততম সময়ে টিকা আনার জন্য যা যা করা দরকার, তা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য আইন বা নিয়মকানুন মানা হবে ঠিকই, তবে তার জন্য কালক্ষেপণ করা হবে না।
ভারতে অক্সফোর্ডের অনুমোদন
প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভারতের পুনে শহরের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কোভিশিল্ড’ টিকা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এবার এই সুপারিশ বা ছাড়পত্র বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়ার (ডিসিজিআই) কাছে। ডিসিজিআইয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া ভারতে কোনো ওষুধ বা টিকার ব্যবহার বা প্রয়োগ করা যায় না।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্সফোর্ডের টিকা ব্যবহারে ডিসিজিআই প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। খুব শিগগির করোনা টিকার প্রয়োগ শুরু করতে চায় ভারত। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বুধবার থেকেই তা শুরু হতে পারে।
প্রতিটি টিকা এ দেশে অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য ও সব ধরনের কাগজপত্র আমরা সংগ্রহ করব। তবে দ্রুতই অনুমোদনের পথে যাব।অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগে ভারতে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় (এসআইআই) প্রস্তুত হচ্ছে করোনা প্রতিষেধক ‘কোভিশিল্ড’। এর আগে যুক্তরাজ্য এই টিকা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে। গত বুধবার ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও জরুরি প্রয়োগ নিয়ে বৈঠক করে। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে দুটি বৈঠক হয়। গতকালের বৈঠকেই ঠিক হয় ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের এই বিশেষজ্ঞ কমিটি মূলত টিকার বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে সেটি নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা বিবেচনা করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, গতকালের বৈঠকে সেরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেক তাদের টিকার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিল। ওই বৈঠকে এ দুটি টিকা বিবেচনা করা হয়। একই তালিকায় ছিল ফাইজার-বায়োএনটেকও। তবে ফাইজার বিস্তারিত উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য আরও কিছুদিন সময় চেয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈধতা পেল ফাইজার
ভারতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফাইজার-বায়োএনটেক। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনার টিকার জরুরি ব্যবহারের বৈধতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি গত বৃহস্পতিবার টিকাটির বৈধতার অনুমোদন দেয়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী টিকাটির আমদানি ও বণ্টনের বিষয়টি দ্রুত অনুমোদনের পথ প্রশস্ত হলো।
মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও জার্মানির প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের তথ্যমতে, তাদের উদ্ভাবিত করোনার টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য গত ২ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনার টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ৮ ডিসেম্বর দেশটিতে এই টিকার প্রয়োগ শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বাহরাইন, সৌদি আরব, ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার অনুমোদন দিয়ে তার প্রয়োগ শুরু করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এক বছর আগে চীনে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকাটিই প্রথম সংস্থার কাছ থেকে জরুরি বৈধতা পেল। করোনার টিকার বৈশ্বিক প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটি খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ এবং ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা ডব্লিউএইচওর টিকা সংশ্লিষ্ট শর্তাবলির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও নিরাপদ।
তবে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অতিশীতল তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এই টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি টিকা সে তুলনায় দামে সাশ্রয়ী ও এটি সংরক্ষণ করা সহজ। সাধারণ রেফ্রিজারেটরেই অক্সফোর্ডের টিকা সংরক্ষণ করা যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ভারত এরই মধ্যে গণটিকা দেওয়ার মহড়া শুরু করে দিয়েছে। আজ শনিবার থেকে রাজ্যে রাজ্যে এটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো করেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো, যখন সত্যিকার টিকা দেওয়া হবে, তখন যেন ত্রুটিবিচ্যুতি এড়ানো যায়।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকা কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশে টিকা আসার পর তা যেন অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে দেওয়া সম্ভব হয়, তার জোর প্রস্তুতি চলছে। টিকা দেওয়ার জন্য সুই-সিরিঞ্জসহ আনুষঙ্গিক জিনিস কেনার কাজ চলছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোন শ্রেণি-পেশার মানুষ টিকা পাবেন, তার তালিকা তৈরির পদ্ধতি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। তবে আগেভাগে তালিকা প্রকাশ করতে চায় না স্বাস্থ্য বিভাগ। টিকা দেওয়ার সময় কোন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা জানার জন্য একটি-দুটি জায়গায় মহড়া বা অনুশীলনের পরিকল্পনা আছে।