
১২ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী ভিআইপি হাউজিং এলাকায় পাহাড় কেটে প্লট তৈরির অভিযোগে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেই মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিচার শুরু হওয়ার পর গত সাত বছরে এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে হাজির হননি খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরাও। বছরের পর বছর শুধু তারিখ পড়ছে।
সরকারি কৌঁসুলি বলছেন, নানা চেষ্টা করেও সাক্ষীদের হাজির করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আসামিরা খালাস পেতে পারেন মামলায়। ২০১৫ সালের ১৪ জুন এই মামলায় আনোয়ারুল হক চৌধুরীসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। শুরুতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাফ সাক্ষ্য দেন।
এরপর থেকে আর একজন সাক্ষীও হাজির হননি। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কোনো সাক্ষী না আসায় আদালত আগামী ১৭ জুলাই পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
সাক্ষী না এলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে অপরাধী পার পেয়ে যাবে। এরা পার পেয়ে গেলে অন্যরা উৎসাহিত হবে। পরিবেশ ধ্বংসকারীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।শরীফ চৌহান, পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি
এভাবে ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ৩৬টি তারিখ পড়ে এই মামলায়। অথচ মামলায় সাক্ষী রয়েছেন মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে একজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকি ১১ জনের কেউ হাজির হচ্ছেন না। তাঁদের মধ্যে সাতজন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী। তিনজন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী—পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী বায়োকেমিস্ট আবদুল্লাহ আল মামুন ও গাড়িচালক শাহ আলম।
বাকি একজন জেলা প্রশাসনের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর নাম লুৎফর রহমান। জানতে চাইলে সিনিয়র কেমিস্ট মোস্তাফিজুর রহমান আগামী ধার্য দিনে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা জানান।
সাক্ষীদের হাজির করতে ২০১৯ ও ২০২১ সালে পরিবেশ আদালতের বিচারক পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি দেন। এরপরও সাক্ষীদের হাজির করা যাচ্ছে না। জানতে চাইলে স্থানীয় সাক্ষী আবদুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। পরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সাক্ষীর বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলাটি হয়। তদন্ত শেষে পরিবেশ অধিদপ্তর স্থানীয় আনোয়ারুল হক চৌধুরী, মো. বাবুল, মো. সিরাজ, শাহ আলম, মো. জাহেদ ও হাসানকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয়। তাঁদের মধ্যে আনোয়ারুল ও জাহেদ পলাতক। বাকিরা জামিনে।
শুধু পাহাড় কাটার ওই মামলা নয়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালতে পাহাড় কাটা, দূষণসহ পরিবেশের ২৭১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ ১১ জেলার এসব মামলায় শুধু তারিখ পড়ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ১৬০ মামলায় ৪৮০ সাক্ষীকে ডাকা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৫ জন সাক্ষ্য দেন। এপ্রিল মাস থেকে আদালতের বিচারক ছুটিতে থাকায় একজন যুগ্ম জেলা জজ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অন্য আদালতের দায়িত্বে থাকায় মামলার ট্রায়াল (বিচার) কাজ করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এস এইচ এম হুমায়ুন রশিদ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সমন, পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীদের হাজির করা যাচ্ছে না। খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজনও আসছেন না। সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন।
খুলশীর মতো অবস্থা নগরের আকবর শাহ থানার লতিফপুর এলাকার আরেকটি পাহাড় কাটার মামলায়। দুটি পাহাড় কেটে আবাসিক প্লট তৈরির অভিযোগে ২০১৪ সালের ৩ এপ্রিল মামলাটি হয়। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর পর থেকে শুধু একজনের সাক্ষ্য হয়েছে। বাকি চার সাক্ষীর একজনও হাজির হননি। তাঁদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সাবেক পরিদর্শক হারুন অর রশিদ পাঠান, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বাকি তিনজন।
তিন বছর আগে বদলি হওয়া হারুন অর রশিদ বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর জেলার সহকারী পরিচালক। মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলাম। বিচারক ছুটিতে থাকায় হয়নি। এই মামলার কোনো কাগজপত্র পায়নি। পেলে অবশ্যই সাক্ষ্য দেব।’
কাগজ না পাওয়ার বিষয়ে সরকারি কৌঁসুলি এস এইচ এম হুমায়ুন রশিদ তালুকদার জানান, অভিযোগপত্র যখন দেওয়া হয়, তখন যেখানে কর্মরত থাকেন সেই ঠিকানা ও পদবি উল্লেখ থাকে।
পরে অন্য জায়গায় বদলি হলেও আগের ঠিকানায় পাওয়া যায় না। এ কারণে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে সাক্ষীদের হাজিরার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই মামলায় সর্বশেষ গত ৯ মার্চ সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। সাক্ষী না আসায় আদালত আগামী ১ সেপ্টেম্বর পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে (২০১৭) থেকে এখন পর্যন্ত এই মামলায় ১৬টি তারিখ পড়ে। এই মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আরফান উদ্দিন ও শাহ আলম জামিনে গিয়ে পলাতক রয়েছেন।
২০০২ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালত চালু হয়। এরপর থেকে ২০ বছরে এখানে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৪৫টি মামলা। তবে বেশির ভাগ মামলায় অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। গত বছর (২০২১) পরিবেশের ছয়টি মামলার রায় হয়। সেখানেও সব আসামিকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
পরিবেশ ধ্বংসকারীদের আইনের আওতায় আনার মত দিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরীফ চৌহান প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষী না এলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে অপরাধী পার পেয়ে যাবে। এরা পার পেয়ে গেলে অন্যরা উৎসাহিত হবে। পরিবেশ ধ্বংসকারীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।