বিরল আবাসিক পাখি

সাতছড়ির কইরিদি টিয়ে

কইরিদি টিয়ে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে মান্দারগাছে। ছবি: লেখক
কইরিদি টিয়ে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে মান্দারগাছে।  ছবি: লেখক

বেলা তিনটা নাগাদ হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পৌঁছালাম। হাত–মুখ ধুয়ে বনের দিকে পা বাড়ালাম। শুরুতেই দেখা হয়ে গেল বিরল পাখিটি, সপরিবার। উঁচু একটি গাছের মগডালে বসা।

ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শাটারে ক্লিক করলাম। একি! ক্লিক তো হচ্ছে না। অগত্যা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলাম। এরপর বছর চারেক সাতছড়ি যাওয়া হয়নি। এ বছরের ৬ মার্চ সাতছড়ি যাওয়ার সুযোগ হলো। মান্দারগাছে টকটকে লাল ফুল ফুটেছে। ফুলের পাপড়ি-মধুরেণু খেতে নিশ্চয়ই ওরা আসবে। কিন্তু দুঘণ্টা ওয়াচ টাওয়ারে অপেক্ষা করেও পেলাম না।

টাওয়ার থেকে নেমে পুণ্যি পুকুরে যাওয়ার পথ ধরলাম। মাটিতে প্রচুর মান্দার ফুল পড়ে আছে। একবারে তাজা। ওপরে তাকিয়ে দেখি সদলবলে ওরা ফুলের পাপড়ি খাচ্ছে। টাওয়ারে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার অভাবে হয়তো বিকল্প গাছ খুঁজে নিয়েছে।

বিরল এই আবাসিক পাখিগুলো কইরিদি বা ফুলমাথা টিয়ে। ইংরেজি নাম ব্লসম-হেডেড প্যারাকিট। সিটাসিডি পরিবারের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম psittacula roseata। এশিয়াজুড়ে এরা বিস্তৃত।

কইরিদি টিয়ে দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ সেন্টিমিটার। ওজন ৮০-৮৫ গ্রাম। রং একনজরে হীরামন টিয়ার মতো। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য আছে। পুরুষের মাথা বাদে পুরো দেহ মোটামুটি সবুজ। মাথা ফ্যাকাশে বেগুনি-লাল; যা ঘাড়-গলায় গিয়ে কালো চিকন বন্ধনীতে শেষ হয়েছে।

স্ত্রীর ধূসর মাথা বাদে বাকি দেহ মোটামুটি সবুজ। ঘাড়-গলা হলুদাভ-সবুজ। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ওপরের চঞ্চু হলুদ ও নিচেরটা কালো। নীলাভ-সবুজ লেজের আগা হলদে। উভয়েরই কাঁধে রয়েছে লাল পট্টি।

অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো হলেও মাথা সবুজ। হীরামন টিয়ার সঙ্গে এদের মূল পার্থক্য অপেক্ষাকৃত খাটো লেজে; যার আগা হলদে।

কইরিদি টিয়ে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বন এবং সুন্দরবনে বাস করে। সচরাচর ছোট থেকে মাঝারি দলে বিচরণ করে। শস্যদানা, ফল, কুঁড়ি, ফুলের পাপড়ি ও মধুরেণু খায়। উড়ন্ত অবস্থায় ‘টুউই-টুউই-টুউই’ শব্দে ডাকে।

জানুয়ারি-এপ্রিল প্রজননকাল। এরা গাছের খোঁড়লে বাসা বাঁধে। প্রায়ই কাঠঠোকরা, বসন্তবাউরি বা অন্য খোঁড়লবাসী পাখির বাসা দখল করে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। ডিম পাড়ে চার-পাঁচটি, ফোটে ২২-২৪ দিনে। বাসা বানানো ও ডিমে তা দেওয়ার কাজ স্ত্রী একাই করে। পুরুষ বাসা পাহারা দেয় ও ডিমে তা দেওয়ার সময় স্ত্রীকে খাইয়ে দেয়। বাঁচে সাত-আট বছর।