
>করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, শনাক্ত রোগী ও মৃত্যু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।
রোগের পরীক্ষা কিছুটা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি বেশি শনাক্ত হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সংক্রমণ, শনাক্ত রোগী ও মৃত্যু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি রোগী বাড়ছে।
গতকাল শুক্রবার কোভিড–১৯–এ নতুন ৯৪ জন শনাক্ত এবং ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর আগের দিন শনাক্ত হয়েছিলেন ১১২ জন, মারা গিয়েছিলেন ১ জন। এই নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগী বেড়ে হয়েছেন ৪২৪ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ২৭ জন।
দেশ এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে। এই ভাইরাস ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা অতিদ্রুত ছড়াচ্ছে। রাজধানীর ৬০টির বেশি এলাকায় ২৩৩ জন সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। ঢাকার বাইরে ২২ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে। রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৯১ জন।
কবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ হবে, তা কেউ জানেন না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণ ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি, লকডাউনসহ বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ধরনের উদ্যোগকে সর্বশক্তি দিয়ে আরও জোরালো করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এফ এম এ ফয়েজ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সবচেয়ে জোর দিতে হবে কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ), সামাজিক দূরত্বে এবং আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের (কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং) ওপর। কন্ট্রাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্নকরণ) নিতে হবে। এসব ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ হার কমিয়ে রাখা যাবে। হাসপাতালে চাপ কমবে।
হাসপাতালে শয্যা কম
রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে কোভিড–১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা চলছে। এই দুই হাসপাতালে ৭০০ শয্যা আছে। রোগ শনাক্ত করার পর দেখা যাচ্ছে, রোগী বাড়ছে।
এত দিন রোগীর চিকিৎসা হচ্ছিল মূলত কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে। এখানে মোট শয্যা ২০০। এগুলোর মধ্যে আইসিইউ শয্যা আছে ২৬টি। এখন রোগী বেড়ে যাওয়ায় কুর্মিটোলা হাসপাতালকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে শয্যা আছে ৫০০। এগুলোর মধ্যে আইসিইউ শয্যা আছে ২২টি।
গতকাল বিকেলে একটি সূত্র জানিয়েছে, এই হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডেই প্রায় ৫০ জন কোভিড–১৯ রোগী ভর্তি ছিলেন।
এ ছাড়া পাঁচ–ছয়জন রোগী ভর্তি আছেন ঢাকা মহানগর হাসপাতালে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৩৬৪ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে তাঁদের সংখ্যা জানা যায়নি।
ঢাকা শহরে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য সরকার কুর্মিটোলা, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী, ঢাকা মহানগরসহ মোট ৯টি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করেছে। এসব হাসপাতালে শয্যা আছে ১ হাজার ৩৩০টি। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ইউনিট খুলেছে সরকার। সেগুলো মূলত রোগী শনাক্তকরণ পরীক্ষার জন্য। এখন পর্যন্ত করোনার চিকিৎসার জন্য ঢাকার বাইরে কোনো হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা হয়নি।
সরকার গত সপ্তাহে পরীক্ষার আওতা বাড়িয়েছে। এখন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মোট ১৭টি ল্যাবরেটরিতে রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে, বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। দিনে চার হাজার পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে ল্যাবরেটরিগুলোর। গতকাল ১ হাজার ১৮৪টি পরীক্ষায় রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৯৪ জন। এর আগের দিন ৯০৫টি পরীক্ষা করে ১১২ জনের রোগ শনাক্ত হয়েছিল। এসব ল্যাবের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করলে প্রতিদিন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বাড়বে।
সেই হিসাবে অনেকের আশঙ্কা, রোগী বেশি হলে তাঁরা কোথায় ভর্তি হবেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা) আমিনুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টো লিভার হাসপাতাল সম্পূর্ণ তৈরি আছে।
তবে বাকি সরকার নির্ধারিত বাকি পাঁচটি হাসপাতাল পুরোপুরি তৈরি নয় বলে জানা গেছে।
এদিকে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান ইতিমধ্যে কোভিড–১৯–এ আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার কমপক্ষে চারজন আক্রান্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমেদুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতি একা সামাল দিতে পারবে না। রোগী কমাতে হবে। রোগী কমাতে হলে কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্বের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি কঠোর হতে হবে। অন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্ত করতে হবে।
মানুষকে ঘরে রাখা জরুরি
মানুষকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ যেন না ছড়ায়, সে জন্য জনসাধারণকে ঘরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিজ্ঞানীরাও একই কথা বলছেন। কিন্তু মানুষ ঘরে থাকছে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের ঘরের বাইরে আসা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাড়ায়, মহল্লায় পুলিশ ও সেনা টহল বাড়াতে হবে।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সরকারের নির্দেশমতো কাজ করছেন। কারও ওপর জোর করছেন না।
তবে প্রয়োজনে সান্ধ্য আইন জারির কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমেদুল কবির। তিনি বলেন, মানুষকে ঘরে না ঢোকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
অবশ্য সান্ধ্য আইন জারি করলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়বে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, সংক্রমণ কত দিন চলবে, কেউ জানে না। তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন কাজ করবে না। সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের। জোর করলে মানুষ রোগ লুকাবে।
মানুষ রোগ লুকাচ্ছে
তবে গতকাল সন্ধ্যায় ভিন্ন অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, সরকারের কয়েকটি কর্তৃপক্ষের কাছে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল দিতে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ করে কোনো এলাকা লকডাউন করা হচ্ছে। মাইকিংও করা হচ্ছে। এতে মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে। অনেকে রোগ লুকাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ১১২ জন নতুন শনাক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ২১ জনের পরীক্ষার ফলাফল জানানো যায়নি। কারণ, তাঁদের মুঠোফোন নমুনা নেওয়ার পর থেকেই বন্ধ পান আইইডিসিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। কিন্তু তাঁরা কোথায়, তা কেউ জানেন না।
এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের আরও বোঝাপড়ার সঙ্গে কাজ করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এখন দুশ্চিন্তার বড় কারণ হচ্ছে, অনেকে রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু পরীক্ষা করাতে আসছেন না সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।’
দেশে সামগ্রিক করোনা পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বিশ্বের কোনো দেশেরই নেই বা ছিল না। ধনী দেশ যেমন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি উন্নয়নশীল কিছু দেশ আশার আলো দেখিয়েছে। ঠিক সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ ছিল।