হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সেই স্কুলের গল্প

পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতিতে গড়া বিদ্যালয়ের ভবনটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। ৩০ জন শিক্ষার্থী বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে। হাজার চারেক বই নিয়ে আছে ছিমছাম একটি গ্রন্থাগার। ১৪টি কম্পিউটার ও দুটি প্রজেক্টর নিয়ে আছে একটি ল্যাব। নিয়মিত পাঠদানের বাইরেও শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন শিক্ষকেরা। ফলাফলেও স্কুলটি ঈর্ষণীয়। জেএসসি, এসএসসিতে শতভাগ পাস তো আছেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গোটা জেলায় বেশ কয়েকবার তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।

শহরের নামীদামি কোনো স্কুল নয়। এটি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পাড়াগাঁয়ের একটি স্কুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদের গ্রামের বাড়ি কুতুবপুরে। জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিকের নিজ হাতে গড়া স্কুল এটি। নাম শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্বপ্ন দেখতেন, একদিন শহর থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসবে তাঁর স্কুলে। এখন শহর থেকে না হলেও এখানে পড়ার জন্য আশপাশের ৫৬টি গ্রামের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসে। শ খানেক মেয়ে রোজ আসে সাইকেলে চেপে।

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। ছবি: আবুল হাসনাত

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আফসোস, ভালো ফল আছে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষার্থীও আছে। তারপরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সরকারীকরণ, এমনকি এমপিওভুক্ত করা হয়নি আজ অবধি।

স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ২০০০ সালে তিন একর জমির ওপর স্কুলটি গড়ে তুলেছিলেন হ‌ুমায়ূন আহমেদ। সে সময় দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসত ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর এই স্কুল দেখতে। এখন সেই স্কুলের ভগ্নদশা।

কেন্দুয়া থেকে রয়্যালবাড়ি ইউনিয়ন হয়ে কুতুবপুর আসতে মাঝে দু-তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। মাঝে বঙ্গবাজার। সেই বাজার থেকে পাকা সরু সড়কটি চলে গেছে সোজা কুতুবপুর। সড়কটির নাম শহীদ ফয়জুর রহমান (হ‌ুমায়ূন আহমেদের বাবা) সড়ক। সেই সড়কের শেষ মাথায় বাঁ দিকের ঢাল ধরে এগুলোই একটা পুকুর। এরপরই বড় মাঠ। মাঠের পেছনে সাদা দেয়াল, লাল টিনের সেই ভবন। আলাদা আলাদা একেকটা কক্ষ দাঁড়িয়ে। এর পেছনে একই সারিতে আছে আরও কয়েকটি কক্ষ। মাঝের বড় কক্ষের একপাশে শিক্ষক মিলনায়তন। অন্যপাশে পাঠাগার। বড় কক্ষের দুই পাশে ছয়টি করে মোট ১২টি শ্রেণিকক্ষ।

শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে শিক্ষার্থীদের জন্য আছে সুদৃশ্য মাঠ। ছবি: আবুল হাসনাত

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের সব কটি কক্ষের জানালার কাচ ভাঙা। বর্ষায় পানি ঢুকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। কাঠের দরজার স্থানে স্থানে ভাঙা। মেঝেতে ফাটল ধরেছে কোথাও কোথাও। দেয়ালে শেওলা জমে কালো রং ধারণ করেছে অনেক স্থানে।

‘স্কুলের এমন অবস্থা দেখতে খারাপ লাগে। কিন্তু এখানে পড়ার পদ্ধতি ভালো। নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়া হয়।’ বলল দশম শ্রেণির ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা।

কুতুবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও অভিভাবক মোজাম্মেল হক বলেন, হ‌ুমায়ূন আহমেদ এমন একটি স্কুল করতে চেয়েছিলেন, যেখানে শহর থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসবে।

শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের লাইব্রেরি। ছবি: আবুল হাসনাত

স্কুলের এমন করুণ হাল কেন, তা জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, স্যারের মৃত্যুর পর অর্থাভাবে স্কুলের তেমন কোনো সংস্কার হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালের দিকে ভবনটিতে রং করা হয়েছিল। আর সরকারি অনুদানে গ্রিল লাগানোর কাজ হয়েছিল। কিন্তু জানালাগুলোতে কাচ না থাকায় বৃষ্টির পানি শ্রেণিকক্ষে ও অফিসরুমে ঢুকে পড়ে।

শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, প্রতিবছরই স্কুলের সংস্কারকাজ করা হয়। আসছে জানুয়ারিতে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগে আবার সংস্কার করা হবে।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় স্কুলটিতে। ২০০৮ সাল থেকে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়েছে এখানে। স্কুলটিতে ছাত্রছাত্রী আছে ৩২৭ জন, আর শিক্ষক ১৫ জন। এর মধ্যে ১০ জনই খণ্ডকালীন শিক্ষক।

এই স্কুলে নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসও নেওয়া হয়। ছবি: আবুল হাসনাত

শিক্ষার্থী কম কেন জানতে চাইলে শিক্ষক মাইনুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনার মান ঠিক রাখতে প্রতিটি কক্ষে ৩০ জন ছাত্রছাত্রী বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কক্ষগুলো সেভাবেই নকশা করা। দুটি সেকশনে ৩০ জন করে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে একেকটি ক্লাসে।

প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, নেত্রকোনা জেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে যে কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, তার মধ্যে শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ তৃতীয় স্থানে আছে। ২০১৫ সালে ৫২ জন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সবাই পাস করে। ১২ জন জিপিএ-৫, ৩৮ জন এ-গ্রেড পায়। ২০১৪-তে ৫৬ জন পরীক্ষা দিয়ে সবাই পাস করে। এর মধ্যে নয়জন জিপিএ-৫ পায়। তবে জেএসসির ফল আরও ভালো। ২০১৫-তে ৬২ জন পরীক্ষা দিয়ে ৩৫ জন জিপিএ-৫ পায়।

অজপাড়াগাঁয়ে এমন চমৎকার ফল খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই আছে উল্লেখ করে সদ্য সাবেক কেন্দুয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (বর্তমানে গৌরীপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে) মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে এমপিওভুক্ত করার জন্য আমাদের তরফ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’ এমপিওভুক্তির জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যা যা থাকা আবশ্যক, তার সবই শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের আছে বলে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।

শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে মাঠের পাশেই আছে সাইকেল রাখার জায়গাও। ছবি: আবুল হাসনাত

শিক্ষা পরিদর্শক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির দিকে নজর দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটি বিবেচনা করবেন বলে জানান মন্ত্রী।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বলতাম, স্যার, আমাদের স্কুলটা এমপিওভুক্ত করা দরকার। তখন স্যার বলতেন, “এটা নিয়ে তোমাদের বিন্দুমাত্র চিন্তা করার দরকার নেই। আমি স্কুল করেছি। সরকার আমার স্কুল নিয়ে নেবে। আমি দেশের জন্য অনেক করেছি। একটা তৈরি করা স্কুল সরকারের নিতে তো কোনো সমস্যা নেই।”’