
পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঠিকানা ২২৮ বছর পর বদল হলো। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড থেকে এই কারাগারের ঠিকানা হলো কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ার রাজেন্দ্রপুর। গতকাল শুক্রবার সকালে বন্দীদের আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঠিকানায় স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডেপুটি জেলার মাজাহারুল ইসলাম হাতে রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বন্দীদের বরণ করে নেন।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ইকবাল হাসান বলেন, সকাল ছয়টা থেকে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৬ হাজার ৪০০ পুরুষ বন্দীকে গতকাল রাতে নতুন কারাগারে নেওয়া হয়েছে। রাত সাড়ে ৯টায় যাওয়া সর্বশেষ বহরে বন্দী ছিল ১৮৪ জন।
এর আগে বিভিন্ন সময় নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগার থেকে নারী বন্দী, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও ডিভিশন পাওয়া বন্দীদের কাশিমপুরের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বন্দী স্থানান্তর উপলক্ষে নাজিমউদ্দিন রোড ও এর আশপাশ এবং কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ২ হাজার ৬০০ সদস্য নাজিম উদ্দিন রোড থেকে মেয়র হানিফ উড়ালপথ-দোলাইরপাড়-পোস্তগোলা হয়ে কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর বাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ ঘিরে রাখেন। প্রিজন ভ্যানের বহরে বন্দী স্থানান্তর চলে এই পথ দিয়ে। এই পথ দিয়ে যানবাহন চলাচল ছিল নিয়ন্ত্রিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়া এই পথ দিয়ে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি।
কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, বন্দী স্থানান্তরের কাজে ২৫টি প্রিজন ভ্যান কাজ করেছে। প্রতিটি বহরে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন বন্দী নতুন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, প্রতিটি বহরে ছিল সাত-আটটি প্রিজন ভ্যান। বহরের সামনে ও পেছনে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ অ্যাম্বুলেন্স ছিল।
বন্দী স্থানান্তর নিয়ে বেলা ১১টায় বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করেন কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন। তিনি বলেন, নতুন কারাগারে নারী বন্দীদের রাখার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের আগেই কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় কারাগার দীর্ঘদিন নাজিমউদ্দিন রোডে থাকায় এখানে একধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। নতুন কারাগারে স্থানান্তর হওয়ায় এই সিন্ডিকেট ভেঙে পড়বে।
নাজিমউদ্দিন রোডে ১৭৮৮ সালে ১৭ একর জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, পুরোনো কারাগারের জায়গায় দুটি জাদুঘর, কনভেনশন সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ওপেন থিয়েটার ও খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকবে। কারাগারের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণ করে এই জায়গাকে পুরান ঢাকার ‘ব্রিথিং স্পেস’ হিসেবে তৈরি করা হবে।
নতুন কারাগার: নাজিমউদ্দিন রোড থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে ঢাকা-মাওয়া সড়কের পাশে রাজেন্দ্রপুরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নতুন অবস্থান। ১৯৪ একর জমির ওপর ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই কারাগারের নির্মাণকাজ চলতি বছর শেষ হয়। গত ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে কারাগারটির উদ্বোধন করেন। এখানে ৪ হাজার ৫৯০ জন বন্দী রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ছয়তলা ভবনে থাকবেন চার হাজার সাধারণ বন্দী। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের রাখার জন্য আলাদা চারটি চারতলা ভবন (ডেঞ্জার সেল) রয়েছে। ডিভিশনপ্রাপ্তদের জন্য রয়েছে আলাদা ভবন। মানসিক রোগী ও প্রতিবন্ধী বন্দীদের জন্য আলাদা একটি দ্বিতীয় তলা ভবন রয়েছে। এ ছাড়া ২৭০ জন নারী বন্দীর জন্য আলাদা একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
ডেঞ্জার সেলের ৩ নম্বর ভবনের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে একসঙ্গে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা যাবে।
বন্দীদের সুযোগ-সুবিধার জন্য গ্রন্থাগার কেন্দ্র, ওয়ার্কশপ, লন্ড্রি, সেলুন, গুদাম ও গম থেকে আটা তৈরির কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্দীদের বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে।