দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের দাবি ২০২০-২১ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করছেন এসব জাতিসত্তার প্রতিনিধি, গবেষক ও বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা এসব জাতির মানুষের সুরক্ষায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন। করোনা মহামারির এ সময়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের দাবিও করেছেন।
‘করোনাকালে জাতীয় বাজেট ও আদিবাসী’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় এসব দাবি উঠে আসে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেট অধিবেশনের পর এ আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।
‘আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের’ আহ্বায়ক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ২০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ৮০ কোটি টাকা বার্ষিক বরাদ্দ আসলে কিছুই না। তাদের উন্নয়নে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ দরকার। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য জন্য যেহেতু এখনো কোনো মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় একটি অধিদপ্তর খুলে বাজেট বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা দরকার।
আলোচনার শুরুতে আদিবাসী ফোরামের সদস্য সোহেল হাজং বলেন, সংসদে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করা হলো, সেখানে বরাবরের মতো দেশের ৩০ লাখ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ উপেক্ষিত হয়েছে। এই করোনাকালেও দেশের অবহেলিত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট হয়নি।
সোহেল হাজং বলেন, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের জন্য প্রতিবছর ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা’ নামে যে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয় সেখানে বরাদ্দ আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৫০ কোটি টাকা, আগামী অর্থবছরের জন্য তা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ৮০ কোটি টাকা। এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আর্থসামাজিক ও জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। যদিও এটি শুধু পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য বরাদ্দ নয়। এই মন্ত্রণালয়ের সব পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় এবং পাহাড়ি জাতিসত্তার মানুষ ছাড়াও প্রায় সমপরিমাণ পুনর্বাসিত বাঙালি মানুষের বাজেটও এখানে অন্তর্ভুক্ত।
আলোচনায় বেসরকারি সংগঠন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, যাদের জন্য বাজেট, তাদের বাজেট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত করতে না পারলে লাভ নেই। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য শুধু বরাদ্দ রাখলে হবে না, বাজেট বাস্তবায়নের সুষ্ঠু পর্যালোচনাও থাকা উচিত। আমলানির্ভর বাজেট না করে দেশের সব শ্রেণির লোকজনকে যুক্ত করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে বাজেট নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
আলোচনা সঞ্চালনা করেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, ‘সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। আবারও এ দাবি করছি। সংসদে বাজেট পেশ হলেও চূড়ান্ত বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত বা আরও কত সম্পূরক বাজেট সংযুক্তির মাধ্যমে বাজেটে সংশোধন আনা যায়, বাজেট সংশোধনীতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। আবার সেই বরাদ্দ আসলে এসব মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই বাজেট বাস্তবায়নেও একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বেসরকারি সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের প্রতি চেয়ে থাকতে হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে। আঞ্চলিক পরিষদের জন্য জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার দাবি জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আদিবাসী ফোরামের সদস্য মেনথেইন প্রমিলা, রিপন বানাই ও জয়েনশাহী আদিবাসী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক। আলোচনায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে ২৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।