তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

'প্রমাণিত হলো গোলাম আযম সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য'

মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিচার যে বাংলাদেশের মাটিতে হতে পারল, এটি বড় কথা। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য —এ কথা আজ প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের দায় প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের বিচারশাস্ত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ডের রায় ঘোষণার পর গতকাল সোমবার প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্টজনেরা এ কথা বলেন।

আনিসুজ্জামান

ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আমি যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করে এসেছি। কারও কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি দাবি করিনি। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে বিচারকেরা যে রায় দিয়েছেন, তা আমি সুবিচার বলে গণ্য করি। গোলাম আযমের বিচার যে বাংলাদেশের মাটি হতে পারল, এটি বড় কথা। আদালত বলেছেন, তাঁর কৃত অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমাম যে গণ-আদালত গঠন করেছিলেন, আমি তার একজন বাদী ছিলাম। সেই প্রতীকী আদালতেও বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে গোলাম আযমের কর্মকাণ্ড মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। এত দিন পরে এটাও প্রমাণিত হলো, ২১ বছর আগে আমরা যে প্রতীকী বিচারের আয়োজন করেছিলাম, তা বাংলাদেশের আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল।

সুলতানা কামাল

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক, টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও এই মামলার সাক্ষী সুলতানা কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বয়স বিবেচনায় গোলাম আযমকে নব্বই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তাঁর অপরাধ সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য। গণ-আদালতের রায়েও গোলাম আযমকে মানবতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধে অপরাধী বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় নব্বই বছরের যে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাতে গোলাম আযমের অপরাধের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায় না। গোলাম আযম একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধের দায়ে অপরাধী, এর জন্য তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য—এ কথা আজ প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

এম আমীর-উল ইসলাম

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, সভ্যতার অবমাননা ও মানবতাবিরোধী যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, তার বিচার হয়েছে। একাত্তরের বিজয় আরও সুসংহত হলো। একাত্তরের মনতাবিরোধী অপরাধ ছিল একটি নতুন ফ্যাসিবাদ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা পবিত্র ধর্মের নামে অর্ধম করেছিল। ১৯৪৪ সালে হিটলারের পতনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সভ্যতার বিজয় সূচিত হয়। সেই বিজয় আরও সুসংহত হয়েছিল নুরেনবার্গ ট্রায়েলের মাধ্যমে। বিশ্বজনমত এরপর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ৭০ বছর ধরে কাজ করে চলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। প্রকৃত অর্থে অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মেরও জয় হয়েছে।

মুনতাসীর মামুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং এ মামলার সাক্ষী মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, আমরা এ রায়ের জন্য দীর্ঘ চার দশক অপেক্ষা করেছি। দেশবাসী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ এত দিন ধরে যে রায় শোনার অপেক্ষায় ছিল, আদালত রায়টি দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, প্রতিটি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য। তবে বয়স ও অসুস্থতার কারণে ৯০ বছর শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদের মতো আমিও রায়ে হতাশ। আমি বিচারকদের কাছে অনুরোধ জানাব, ১৯৭১ সালে গোলাম আযমেরা বয়স, শিশু, নারী, পুরুষ কোনো কিছুই বিবেচনায় নেয়নি। বিষয়টি আদালতের ভেবে দেখা উচিত। তবে সামগ্রিকভাবে বিচারে যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এটা বড় পাওয়া। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের দায় প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের বিচারশাস্ত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। রায়ে জামায়াতে ইসলামীকে অপরাধী সংগঠন ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ব্যক্তিকে সরকারি-বেসরকারি কোনো পদে রাখা উচিত নয় বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

মাহবুব উল্লাহ্জা নতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, ‘রায়টি খুবই আলোচিত এবং স্পর্শকাতর। আমাদের দেশে কোনো অপরাধের জন্য সাধারণত সর্বোচ্চ পর্যায়ের শাস্তি হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। কিন্তু এখানে ৯০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। এটা একটা নতুন বিষয় মনে হয়েছে।’ ড. মাহবুব উল্লাহ্ আরও বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে হলে আগে রায় পড়তে হবে। এটা পড়ে ও বুঝে মন্তব্য করাই শ্রেয়।