রওনক জাহান
রওনক জাহান

ক্রাউন সিমেন্ট ‘অভিজ্ঞতার আলো’

রওনক জাহান: শিক্ষা, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রভাবনার এক দীর্ঘ যাত্রা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের মুখোমুখি হয়েছিলাম ৮ এপ্রিল ২০২৬, তাঁর গুলশানের বাসায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতির নিবিড় পর্যবেক্ষক, এ বিষয়ে একাধিক গবেষণাগ্রন্থের প্রণেতা, হার্ভার্ডের পিএইচডি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে অতীত আর বর্তমানের কত কী যে জানতে পারলাম। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক আয়োজনের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর।

১৯৪৪ সালের ২ মার্চ, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার খাতরায় তাঁর জন্ম। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের শিকড় গড়ে ওঠে পূর্ব বাংলার নানা জনপদে—কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে। বাবার চাকরির সূত্রে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে বেড়ানো এই শৈশব তাঁকে দিয়েছে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। তাঁর বাবা আহমদুল্লাহ ছিলেন নীতিমান সরকারি কর্মকর্তা; আইন ও ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন। সেই পরিবেশেই রওনক জাহানের মধ্যে গড়ে ওঠে ন্যায়বোধ, যুক্তিবোধ এবং শিক্ষার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

শৈশবের এক স্মৃতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে তাঁর ভর্তি হওয়া। নিয়মের ফাঁক গলিয়ে বাবা তাঁকে ভর্তি করালেও ক্লাসে বসার অনুমতি ছিল না; শুধু পরীক্ষার সময় আলাদা কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হতো। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে প্রশ্ন তোলে—শিক্ষা কি লিঙ্গভিত্তিক হতে পারে? পরবর্তীকালে নারীবাদী চিন্তার সঙ্গে তাঁর সংযোগ যেন এই বাস্তব অভিজ্ঞতারই বীজ থেকে জন্ম নেয়।

তাঁর পরিচয়ের শিকড় গড়ে ওঠে পূর্ব বাংলার নানা জনপদে—কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে। বাবার চাকরির সূত্রে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে বেড়ানো এই শৈশব তাঁকে দিয়েছে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা।

মুন্সিগঞ্জের এভিজেএম গার্লস স্কুলে শিক্ষক চিন্তাহরণ দে তাঁর জীবনে এক বড় প্রভাব ফেলেন। শিক্ষকের উৎসাহ যে একজন ছাত্রীর আত্মবিশ্বাস গড়ে দিতে পারে, তা তিনি নিজের জীবনে অনুভব করেন। সেই অনুপ্রেরণায় তিনি মেধাতালিকায় স্থান পান, যা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর অগ্রযাত্রার প্রতীকও।

ইডেন কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল আরেক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। সহশিক্ষার পরিবেশেও মেয়েদের জন্য ছিল অদৃশ্য দেয়াল—কমনরুমে সীমাবদ্ধতা, ক্লাসে কথা বলার সংকোচ, সামাজিক নজরদারি। তবু তিনি এগিয়ে যান, নিজের জায়গা তৈরি করেন।

১৯৬৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দেওয়া তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ভাষাগত অস্বস্তি, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা—সবকিছু মিলিয়ে শুরুটা ছিল কঠিন। কিন্তু তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস—‘ডুবব না, সাঁতার কাটব’—তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। হার্ভার্ডের চার বছরকে তিনি নিজেই বলেন ‘রূপান্তরমূলক সময়’। এখানেই তিনি নিজের কণ্ঠ খুঁজে পান, আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে ১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘উইমেন ফর উইমেন’—বাংলাদেশে নারীবিষয়ক গবেষণা ও চিন্তার অন্যতম প্রথম সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নির্যাতিত নারীদের বাস্তবতা, নারীর অর্থনৈতিক অবদান, আইনি ও সামাজিক অবস্থান—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণার অভাব তাঁকে এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মতে, কোনো সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রথম দরকার তথ্য, তারপর যুক্তি।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ গভীর ও বাস্তবসম্মত। তিনি মনে করেন, দেশে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা সব সময়ই ছিল এবং আছে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে—নিয়ম, প্রক্রিয়া ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্র কোনো একদিনে অর্জিত কিছু নয়; এটি প্রতিদিন চর্চা করতে হয়।

নারী আন্দোলন প্রসঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, শুধু প্রতিবাদ নয়—প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি, বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি। মধ্যবিত্ত নারীদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে গ্রামীণ ও শ্রমজীবী নারীদের যুক্ত করতে না পারলে আন্দোলন টেকসই হয় না। একই সঙ্গে পুরুষদেরও এই লড়াইয়ে অংশীদার করতে হবে।

১৯৬৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দেওয়া তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ভাষাগত অস্বস্তি, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা—সবকিছু মিলিয়ে শুরুটা ছিল কঠিন। কিন্তু তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস—‘ডুবব না, সাঁতার কাটব’—তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। হার্ভার্ডের চার বছরকে তিনি নিজেই বলেন ‘রূপান্তরমূলক সময়’। এখানেই তিনি নিজের কণ্ঠ খুঁজে পান, আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন।

ব্যক্তিজীবনে দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর সচেতন পছন্দ, নিজস্ব স্বাধীনতা ও কাজের প্রতি নিবেদনের কারণে। পরে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযাত্রা, গবেষণা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই তাঁদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এই সম্পর্কের মূল শক্তি রয়ে গেছে পারস্পরিক সম্মান ও চিন্তার আদান-প্রদান; যেখানে বৌদ্ধিক বন্ধুত্বই বেশি প্রাধান্য পায়।

বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের মানুষের সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা এবং প্রতিবাদের ক্ষমতা ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। তাঁর মতে, আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। সেই মানুষই বারবার প্রমাণ করেছে, পরিবর্তন সম্ভব।