
মাগুরায় এক বছরের বেশি সময় আগের আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি হাইকোর্টে শুনানি শুরুর পূর্বপ্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে।
শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ছাপা পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত করতে হয়। সরকারি ছাপাখানা থেকে ছাপানো সেই পেপারবুক আজ সোমবার হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছেছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এখন আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াগুলো চলছে। সংশ্লিষ্ট শাখার কার্যক্রম ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এরপর বেঞ্চ নির্ধারণ ও শুনানি শুরুর পালা।
মাগুরায় আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গত বছরের ১৭ মে রায় দেন মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ যাবতীয় নথি গত বছরের ২১ মে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়।
ফৌজদারি কোনো মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত। এ অনুসারে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দণ্ডিত আসামি রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও আপিল করতে পারেন। এ ছাড়া আসামির বিবিধ আবেদনও করার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের জেল আপিল, আপিল ও বিবিধ আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়ে থাকে। তবে শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত করতে হয়। এতে মামলার এজাহার, অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারিক আদালতের রায়সহ বৃত্তান্ত সন্নিবেশিত থাকে।
মাগুরার আলোচিত ওই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৫ জুন হাইকোর্টে আপিল করেন হিটু শেখ। এই আপিলের গ্রহণযোগ্যতার ওপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ১ জুলাই হাইকোর্টে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের রায়ে তাঁকে দেওয়া অর্থদণ্ড স্থগিত করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণের পর এ-সংক্রান্ত নথি সংশ্লিষ্ট শাখায় আসে। শাখা পেপারবুক টাইপ করে। আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে তা ছাপানোর জন্য সরকারি ছাপাখানায় পাঠায়। ছাপানো পেপারবুক আজ সকালে ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়।
আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পেপারবুক প্রস্তুতসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে প্রধান বিচারপতি ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন।
সাধারণত বছর ও মামলার ক্রম অনুসারে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়ে থাকে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতে প্রায় ১ হাজার ২০০ ডেথ রেফারেন্স মামলা এখন বিচারাধীন। ২০১৮ সালে আসা ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এখন শেষ পর্যায়ে।
অবশ্য গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতেও ডেথ রেফারেন্স শুনানির নজির রয়েছে। ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য হাইকোর্টে চারটি বেঞ্চ রয়েছে।
হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় গতকাল রোববার রায় দেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এক ব্রিফিংয়ে গতকাল এ জাতীয় মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শুনতে হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন ও আগামী রোববার থেকে তা কার্যকর হওয়ার বিষয়ে জানান।
মানুষের যে উদ্বেগ, নিম্ন আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও আপিল শুনানিতে বিলম্ব ঘটার কারণে সে রায় কার্যকর মানুষ দেখতে পান না, বিলম্ব ঘটে—এ বিষয় উন্মুক্ত আদালতে গতকাল প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস। গতকাল তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধান বিচারপতিকে এটাও বলেছি যে দেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য, সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট যে ভূমিকা পালন করছেন, সেটি কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাছে প্রতিভাত হয় না।...প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ করেছি যে মানুষের যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা, অত্যন্ত যৌক্তিক। এটা নিরসনের জন্য প্রধান বিচারপতির উদ্যোগী ও কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘তখন প্রধান বিচারপতি এই বিচারের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন এই জাতীয় মামলা, অর্থাৎ পল্লবীর শিশুসহ এই সমস্ত মামলাগুলো শুনানির জন্য হাইকোর্টে একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ উনি গঠন করবেন, যেটা আগামী রোববার থেকে কার্যকর হবে।’
এর মধ্যে মাগুরায় আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা হাইকোর্টে শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ছাপা পেপারবুক আজ ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছেছে।
মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার সেই ঘটনা
শিশুটি বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। গত বছরের ৬ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাকে অচেতন অবস্থায় মাগুরার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে গত বছরের ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। গত বছরের ৮ মার্চ শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে গত বছরের ১৭ এপ্রিল মামলাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয় এবং গত বছরের ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। গত বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছরের ৬ মার্চ ঘটনার দিন থেকে গণনা করলে ৭৩ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করেন বিচারিক আদালত।
বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) ও দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামির করা আপিল হাইকোর্টে শুনানি শুরুর অপেক্ষায়।