অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ। আজ সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ। আজ সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

ফুলেল শ্রদ্ধায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে চিরবিদায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে গুণী শিক্ষকেরা তাঁদের কর্মের মাধ্যমে আলোকিত করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তাঁকে শেষবিদায় জানাতে গিয়ে এমন করেই তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করলেন বিশিষ্টজনেরা। আজ সোমবার মধ্যাহ্নে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে শেষবারের মতো আনা হয়েছিল তাঁকে। উপাচার্য, কলা অনুষদের ডিন, বাংলা বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও গুণগ্রাহীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এই প্রিয় শিক্ষক, রাজনৈতিক চিন্তক, গবেষক ও লেখককে।

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক গতকাল রোববার দুপুরে আকস্মিক হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। রাতে ফ্রিজিং গাড়িতে মরদেহ তাঁর মিরপুরের পল্লবীর বাড়িতে রাখা হয়েছিল। আজ সোমবার ফজরের পর পল্লবী জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা হয়।

সকাল সাড়ে দশটায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ বাংলা একাডেমিতে আনা হয়। এখানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রী নিতাই চন্দ্র রায় ও বাংলা একাডেমির পক্ষে মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ স্মৃতিসংঘ ও বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানান হয়।

জাতীয় কবিতা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরে মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা করা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বেলা ১১টায় এখানে আনা হয় মরদেহ। বিভিন্ন শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অবদান তুলে ধরেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রজন্মের অত্যন্ত মেধাবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি কেবল শিক্ষকতাই করেননি, দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তাঁর লেখা, অসংখ্য বক্তৃতায় সমাজ ও মানবকল্যাণের আহ্বান রয়েছে। এসব কাজের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে লেখক–অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। আজ সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে 

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শারমিন মুর্শিদ বলেন, তিনি সমাজ, রাজনীতির জটিল বিষয়গুলো গভীরভাবে ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করতে পারতেন। দেশ তাঁর মতো গুণী মানুষকে হারিয়েছে। এটা অনেক বড় ক্ষতি, তাঁর আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু কখনো আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হননি। দেশ জাতির কীভাবে উন্নতি হতে পারে, আমরা সেখানে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারি, সব সময় তা ভেবেছেন।’

অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, শিক্ষায়তনের আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সব সময় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পাওয়া যেতে। তাঁর কাছে খুব সহজগম্যতা ছিল।

পরিবারের পক্ষে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মেয়ে অধ্যাপক শুচিতা শারমিন ও নাতি আন্দালীব হাসান শ্রদ্ধা জানাতে আসার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চান তাঁরা।

যেসব দল ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, নয়া গণতান্ত্রিক মোর্চা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, সোনার বাংলা পার্টি, বাংলাদেশ জনঅধিকার পার্টি, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, যুব ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, রাষ্ট্রভাষা রক্ষা কমিটি, সাংস্কৃতিক সংগীত সমগীত, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউপিএল, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সাহিত্য পত্রিকা কাব্যমালাঞ্জালি, স্বপ্নযাত্রা-৭৮, দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব সঞ্চালনা করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আজ সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে 

শহীদ মিনার থেকে মরদেহ আনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে। এ সময় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে কলাভবনের সামনে নিচের তলার লবিতে মরদেহ রাখা হয়। প্রথমেই বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আবুল কালাম সরকার, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ ও উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। উপাচার্য বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর কর্মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোকিত করেছেন। তিনি শুধু শিক্ষকতা নয়, সমাজের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। উত্তরণে পথনির্দেশনা দিতেন। এমন মানুষের চলে যাওয়ায় গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন।

বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, তিনি শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নয়, দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল দেশ ও মানুষ। তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তিনি মানুষকে সমাজ–দেশ নিয়ে সচেতন করতেন, প্রশ্ন করতে অনুপ্রাণিত করতেন।

অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবতাবাদী চিন্তার অধিকারী একজন অনুকরণীয়, অনুসরণীয় মানুষ। ব্যক্তিগত প্রাপ্তির কথা না ভবে তিনি দান করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর তাঁর জানাজা হয়। এরপর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ফুলে ফুলে ঢেকে দেওয়া হয় তাঁর অন্তিম শয্যার স্থানটি।