সামনের মাসে, মার্চের ১২ তারিখে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ৯১ পূর্ণ করবেন। শুরু করবেন জীবনের ৯২তম বর্ষের নতুন অধ্যায়। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ। স্থান কলকাতার এলগিন রোডের একটি নার্সিং হোম। বাবা খন্দকার ফজলে সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আইসিএস কর্মকর্তা, পরে পাকিস্তান আমলে পুলিশের উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পৈতৃক নিবাস মুর্শিদাবাদে। মা হাশমত আরা ঢাকার নবাব পরিবারের উত্তরাধিকারী। পরিবারে বাবা বাংলাভাষী, মা উর্দুভাষী হওয়ায় শৈশব থেকেই তিনি দুই ভাষার পরিবেশে বড় হন।
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো সাক্ষৎকারগুচ্ছের অংশ হিসেবে রেহমান সোবহানের ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। সেখানে তাঁর জীবনের গল্প আমরা শুনি তাঁর নিজের মুখে।
তিন বছর বয়সে তাঁকে কলকাতার লরেটো কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্যার মজা করে বললেন, ওই সময় তাঁর প্রতিভা ছিল, দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে বাড়ির আয়াসহ অনেকের হাতে মালা এঁকে দেওয়া। স্কুলে তাঁর এই ‘শিল্পপ্রতিভা’র কদর করা হয়নি।
সাত বছর বয়সে তাঁকে দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে পাঠানো হয়। এটি ছিল বোর্ডিং স্কুল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানে পড়াশোনা করেন। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে খাবার ও অন্যান্য সুযোগ ছিল সীমিত। সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে গোসল, রেশনিংয়ের খাবার—এই পরিবেশেই কেটেছে তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ। খেলাধুলায় তিনি সক্রিয় ছিলেন। ফুটবল, হকি ও অ্যাথলেটিকসে অংশ নিতেন।
১৫ বছর বয়সে তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর পড়াশোনা করেন লাহোরের এইচিসন কলেজে। এ সময় পর্যন্ত রাজনীতি তাঁর জীবনে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কলেজজীবন শেষে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কেমব্রিজে থাকার সময় তিনি সমকালীন ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তা, সমাজতন্ত্র, শ্রমিক আন্দোলন ও উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হন। লেবার সোসাইটি ও অন্যান্য বামধারার ছাত্রগোষ্ঠীর কার্যক্রম তাঁকে প্রভাবিত করে।
১৯৫৭ সালে, ২১ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় ফেরেন। তখন তিনি বাংলায় পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা বাংলা সাহিত্য তাঁর পাঠের কেন্দ্রে ছিল না। ইলিশ মাছের স্বাদ তখনো তিনি পাননি।
তাঁর নানা (নানির ভাই) খাজা নাজিমউদ্দিন, তাঁর আত্মীয়স্বজন অনেকেই কলকাতা, লাহোর। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় আসার। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আই ওয়াজ অ্যান আইডিওলজিক্যাল বাঙালি।’ বামপন্থার আদর্শে তখন তিনি দীক্ষিত, সুন্দর বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি দরকার। তিনি ভাবলেন, পূর্ব বাংলা হলো সেই ভূমি।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই তাঁর পেশাগত ও বৌদ্ধিক জীবনের নতুন পর্ব শুরু হয়।
ষাটের দশকের শুরুতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজেট–কাঠামোর কারণে দুই অঞ্চলের মধ্যে সুস্পষ্ট বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তিনি এ অবস্থাকে ‘দুই অর্থনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান প্রকাশ্যে বলেন, পাকিস্তানের অর্থনীতি একটি। এর বিপরীতে রেহমান সোবহানের বক্তব্য জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক। পাকিস্তান অবজারভার–এ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বক্তব্যের পাশাপাশি ২৭ বছরের অধ্যাপকের উদ্ধৃতি ছাপা হলো।
এ সময় তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, কামাল হোসেনসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ছয় দফা আন্দোলনের অর্থনৈতিক যুক্তি নির্মাণে তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না, তবে অর্থনৈতিক যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে প্রভাবিত করেন।
তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন সালমা সোবহান। তিনি আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ছিলেন। তাঁদের সংসারজীবনে পেশাগত স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে তিনি অধ্যাপক রওনক জাহানকে বিয়ে করেন। শিল্পকলা ও সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত তিনি নিয়মিত শুনতেন। আমাদের এই সাক্ষাৎকারে ভাস্কর নভেরার সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্বের স্মৃতি তিনি স্মরণ করেন। বিটোফেনের সিম্ফনি শুনে নভেরা একদিন অজ্ঞানের মতো হয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রেহমান সোবহান আগরতলা যাওয়ার জন্য মুস্তাফা মনোয়ার আর অধ্যাপক আনিসুর রহমানের সঙ্গে যখন বেরিয়ে পড়েন, তখন তাঁর পরনে নতুন লুঙ্গি, বেল্ট দিয়ে পরা। পথে, এক লঞ্চে তিনি বাঙালিদের সন্দেহের কবলে পড়লে কীভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন, সেই সব গল্প আমরা আবার শুনি। তারপর আগরতলা। সেখান থেকে দিল্লি। তাজউদ্দীন আহমদকে শনাক্ত করে দিয়েছিলেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে। পরে তাজউদ্দীন তাঁকে নিয়োগ করেন আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি তুলে ধরার কাজে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ফিরে তিনি বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেন। তিনি সরকারে আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে না থাকলেও পরামর্শক ও গবেষক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
৯০ বছরে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনপথে শৈশব, শিক্ষা, শিক্ষকতা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ—এই সব পর্ব একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। কলকাতা, দার্জিলিং, লাহোর, কেমব্রিজ ও ঢাকা—এই শহরগুলো তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্তরকে চিহ্নিত করে। তাঁর জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল ঢাকায় ফিরে কাজ করা এবং এই সমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া।
রেহমান সোবহানের জীবনকথা ব্যক্তিগত স্মৃতির চেয়ে সময় ও রাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে বেশি যুক্ত। তাঁর লেখালেখি ও বক্তব্যে সেই ইতিহাসের অর্থনৈতিক দিকটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। জন্মসূত্রে নয়, চিন্তা ও অবস্থানের মাধ্যমে তিনি যে পরিচয় বেছে নিয়েছিলেন, তার ছাপ তাঁর কাজের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তিনি মনে করেন, কোনো ‘বন্দোবস্ত’ এখনো হয়নি, সব রাজনৈতিক পক্ষকেই ঐকমত্যে আসতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে তা হবে না। তা যত দিন না হচ্ছে, তত দিন আমাদের দুঃখের রজনী সত্যিকার অর্থে পোহাবে না।