গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির বিবৃতি

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে উচ্চ ব্যয়ের বরাদ্দ সন্দেহজনক, নতুন সরকারকে বিপদে ফেলবে  

সংস্কার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে অন্তর্বর্তী সরকার উচ্চ ব্যয়ের মধ্য দিয়ে অপচয়ের পথ অনুসরণ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। তারা বলছে, জনগণের কর্মসংস্থান, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ না বাড়িয়ে সরকারি পরিচলন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। এসব বরাদ্দ এবং দেশের জন্য ‘ক্ষতিকর’ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের তৎপরতা নতুন নির্বাচিত সরকারকেও বিপদে ফেলবে।

আজ মঙ্গলবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ করেন। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্যদের পক্ষে বিবৃতিটি পাঠান আনু মুহাম্মদ, মোশাহিদা সুলতানা, সামিনা লুৎফা, নাজমুস সাকিব, দিলীপ রায়, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, ফেরদৌস আরা রুমী, সজীব তানভীর, আবদুল্লাহ মাহফুজ, আকরাম খান, সীমা দত্ত, আফজাল হোসেন ও ফারহানা শারমীন।

বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলেছে, আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর আগে মন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে ২০২৫ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বেড়েছে। গত দেড় বছরে প্রায় কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি এবং নির্বাচনের ৬ দিন আগে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। রুটিন কাজ ছাড়া নীতিনির্ধারণী কাজের কোনো এখতিয়ার বা যৌক্তিকতা এ সরকারের থাকে না। সব যুক্তি, তথ্য এবং জাতীয় স্বার্থ অগ্রাহ্য করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দেওয়া ও যথাযথ আলোচনা ছাড়াই জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের এই তৎপরতায় অস্বচ্ছতা, গোপনীয়তা এবং তাড়াহুড়া খুবই সন্দেহজনক। দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ‘ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক’ এসব তৎপরতায় কমিটির সদস্যরা উদ্বেগ ও নিন্দা জানান।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলেছে, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশে আছে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সংসদের উভয় কক্ষে আলোচনা করতে হবে। এখন দেশে সংসদ নেই, কাদের সঙ্গে আলোচনা করে অন্তর্বর্তী সরকার এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই প্রশ্ন রেখেছে কমিটি। তারা বলছে, এত তাড়াহুড়া করে, রাজনৈতিক দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচনের একদম আগমুহূর্তে এসব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের তৎপরতা বিগত স্বৈরাচারী সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে এবং সংস্কার করার প্রতিশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল উল্লেখ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলেছে, দেখা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই সংস্কার মানছে না। বরং অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জারি রেখে জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি গভীর সংকটে ফেলছে।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্যরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তির ব্যাপারে উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ পর্যায়ে সরকার কীভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে, তা–ও প্রশ্ন। অন্যদিকে জাপান বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে জানিয়েছে যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলো জিএসপি সুবিধা পাবে। ফলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা এমনিতেই বাংলাদেশ পাবে। সে হিসাবে নির্বাচনের ৬ দিন আগে এই ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ। গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার ধারাবাহিকতা হচ্ছে এই সিদ্ধান্তগুলো।

বিভিন্ন দেশি–বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেও মনে করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। তারা বলেছে, সরকারের রাজস্ব আয়ে বিপুল ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয় ব্যাপক বৃদ্ধির প্রবণতার মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারের এই ধরনের চুক্তি ও আর্থিক অপচয়মূলক বরাদ্দের তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানায় গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি মনে। একই সঙ্গে তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী দল এবং জনগণকে সরকারের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ করার আহ্বান জানায়।