ক্লড এআই
ক্লড এআই

১৬ মাস ধরে এআই দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া খবর, গাইবান্ধার এক ব্যক্তি শনাক্ত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে বন্ধ করে দিয়েছে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক।

প্রতিষ্ঠানটির তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার এক ব্যক্তি ১৬ মাস ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া খবর তৈরি করেছেন। এ সময় তিনি ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অন্তত দেড় হাজার ভুয়া শিরোনাম, দেড় হাজার ভুয়া ছবি ও ৩০০টি বানোয়াট প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা (প্রম্পট) তৈরি করেন।

গত বৃহস্পতিবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক। প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশে এআইয়ের অপব্যবহারের বেশ কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ-সংক্রান্ত ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘জিটিটি-৫৪০০৬’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের রিপোর্ট

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির প্রথম আলোকে বলেন, এআইয়ের ব্যবহার বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে হচ্ছে। ফলে কোনটি এআইয়ের অপব্যবহার আর কোনটি সঠিক ব্যবহার—তা নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তবে এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে এআই কোম্পানিগুলোকে নিয়মিতভাবে তদারকি ও নজরদারি করতে হবে। এআইয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত এসব কোম্পানিরই।

তিনি বলেন, এআই ব্যবহার করে যেন প্রতারণা, অপতথ্য ছড়ানো বা এ ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোকে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর এই তদারকির ক্ষেত্রে শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে মানুষের মাধ্যমে নজরদারি করানো প্রয়োজন।

অ্যানথ্রপিক বলছে, ওই নেটওয়ার্কের তৈরি কনটেন্ট ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে। তবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা বা অর্থায়নের পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রমাণ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদন বলছে, গাইবান্ধার ওই ব্যক্তি শনাক্তকরণ ও প্ল্যাটফর্মের সীমাবদ্ধতা এড়াতে ঘুরেফিরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন। তিনি একটি নিজস্ব সফটওয়্যারও তৈরি করেছিলেন। সফটওয়্যারটি সরাসরি ক্লডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কাঠামোয় কনটেন্ট তৈরি করত।

সফটওয়্যারটি একসঙ্গে ১৫টি ভুয়া শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট প্রতিবেদন ও ছবি তৈরির জন্য ১৫টি নির্দেশনা বা ‘প্রম্পট’ তৈরি করত। অ্যানথ্রপিকের হিসাবে, এভাবে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বয়ান এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হয়। ক্লডের নিজস্ব ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য কোনো এআই মডেলে ব্যবহার করে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছে অ্যানথ্রপিক।


লক্ষ্য ছিল গ্রামের মানুষ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাইবান্ধার ওই ব্যক্তি তাঁর তৈরি কনটেন্টকে অভ্যন্তরীণভাবে ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কনটেন্টগুলোকে তিনি ‘উত্তেজক’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ রাখার পাশাপাশি এমন সহজ ভাষায় তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যাতে গ্রামের মানুষও তা বুঝতে পারেন।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে দর্শকের কাছে সেগুলো সত্যিকারের সংবাদ বলে মনে হয়। এসব কনটেন্ট মূলত গ্রামীণ এলাকার সীমিত সাক্ষরতার আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হতো।


সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের পরিকল্পনা
তৈরি করা কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের লাইভস্ট্রিমে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কনটেন্ট তৈরির পর তা নির্দিষ্ট ক্লাউড-স্টোরেজ ফোল্ডারে রাখা হতো। পরে সেগুলো অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর করা হতো।

এ ছাড়া ওই ব্যক্তি ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে ভিডিও একসঙ্গে আপলোড করার জন্য আলাদা একটি স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছিলেন। অ্যানথ্রপিক বলছে, তৃতীয় পক্ষের একটি কনটিনিউয়াস-ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে ভিডিওগুলো নির্ধারিত সময়ে প্রকাশের জন্য আগেই—এমনকি এক মাস আগে—সাজিয়ে রাখা যেত।

প্রতিবেদনের একটি অংশে বলা হয়েছে, এই আপলোড ব্যবস্থায় ব্যবহৃত তৃতীয় পক্ষের সেবার মাধ্যমে ওই ব্যক্তির আইপি ঠিকানা আড়াল করার ব্যবস্থাও ছিল।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির বিরুদ্ধে প্রচারণা

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, নেটওয়ার্কটির তৈরি কনটেন্ট ছিল ‘ইউনিফর্মলি’ বা ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগপন্থী। এতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি (বর্তমান এনসিপি), অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

প্রতিবেদনে ভুয়া প্রচারণার চারটি প্রধান বয়ান বা কৌশলের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, ধর্মীয় উগ্রবাদের বয়ানে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে তালেবান-ধাঁচের শরিয়াভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনাকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের বয়ানে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট হত্যার পরিকল্পনা ও ‘হিট স্কোয়াডে’র গল্প ছড়ানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

চতুর্থত, বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে বানোয়াট আর্থিক দুর্নীতি এবং গোপন আন্তদলীয় জোটের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

কিছু বয়ান ভারতের স্বার্থের সঙ্গে মেলে
অ্যানথ্রপিক বলেছে, নেটওয়ার্কটির তৈরি কিছু বয়ান ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এ কার্যক্রমের পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়ন ছিল, এমন প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি।

অ্যানথ্রপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, ঘটনাটিকে ক্যাটাগরি থ্রি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যানেল ও অ্যাকাউন্টে ওই নেটওয়ার্কের তৈরি কনটেন্টের সঙ্গে মিলে যায়, এমন ভিডিও পাওয়া গেছে।


অ্যানথ্রপিকের পদক্ষেপ
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ক্লড অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তি নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে একই কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাঁর কার্যক্রমের আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার ব্যবস্থাও তৈরি করেছে অ্যানথ্রপিক।