
পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা, নাশকতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া গত মে মাসে রাজধানীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী, দস্যু ও মাদক কারবারিসহ ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান। ঈদুল আজহার ছুটিতে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিএমপির সব ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলেও জানান তিনি।
কমিশনার বলেন, পশুর হাট, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শপিং মল, আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ঈদের জামাতস্থল এবং ফাঁকা বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ঈদের ছুটিতে সাত দিনে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষের এই মহানগরে চাঞ্চল্যকর কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি স্থিতিশীল।
মে মাসের অপরাধ চিত্র ও অভিযান
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গত ১ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৬৫৪ জন চাঁদাবাজ, ৯৭১ জন ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী ও দস্যু এবং ১ হাজার ২১৫ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৭৪৪ কেজি গাঁজা, ১ লাখ ৭৯ হাজার ইয়াবা বড়ি, ৪০৫ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ২৮১ বোতল ফেনসিডিল, ২৯ গ্রাম আইস এবং বেশ কিছু দেশি-বিদেশি মদ। এ ছাড়া ৬টি পিস্তল, ২১টি গুলি, ৪টি ম্যাগাজিন, ১১টি ককটেল ও ১২টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জন চীনের নাগরিকসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সময়ে ৫২৩টি মুঠোফোন, ২৯৩টি সিম কার্ড এবং ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে মোট ৪১টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের তথ্য প্রকাশ করা হবে।
ট্রাফিক আইনে ৩৮ হাজার মামলা, ৮ কোটি টাকা জরিমানা
ডিএমপি কমিশনার জানান, মে মাসে ট্রাফিক বিভাগ সড়ক পরিবহন আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ৩৮ হাজার ২৮৪টি মামলা করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক এনফোর্সমেন্টের মাধ্যমে ৮ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০১ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৩৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি করে একজনকে কারাদণ্ড ও অন্যদের ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কমিশনার বলেন, বর্তমানে ৫৭টি পয়েন্টে ৭০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে। পরে যাচাই-বাছাই শেষে মামলা করা হয়। ট্রাফিক মামলার নামে পাঠানো ফিশিং লিংকের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ডিএমপির সাইবার দল এটি নিয়ে কাজ করছে। নগরবাসী যেন কোনো সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ না করেন। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে তিনি জানান, এগুলো মোটরযান না হওয়ায় মামলা করা সম্ভব হয় না, তবে নিয়মিত উচ্ছেদ ও ডাম্পিং কার্যক্রম চলছে।
আলোচিত মামলার অগ্রগতি
কমিশনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগে করা মামলার আসামিকে সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার এবং ছয় দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানান তিনি। আগামী রোববার এই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। এ ছাড়া মুগদায় সৌদিপ্রবাসী মোকাররম হত্যা, যাত্রাবাড়ীতে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা এবং ডেমরায় ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের তথ্য দেন তিনি।
উত্তরা ও গাজীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৪ লাখ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং বংশালের নয়াবাজারে নেসার আলী হত্যাকাণ্ডের রহস্য পাঁচ দিনের মধ্যে উদ্ঘাটন করার কথাও জানান কমিশনার। আদাবরে ৫০০ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় অপহরণকারী চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা ডিএমপির অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশি সেবা ও জননিরাপত্তা
উত্তরা, মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই বৃদ্ধির অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার বলেন, এই এলাকাগুলো ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে—এমন বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। তিনি জানান, মোহাম্মদপুরে ‘আকাশ বাহিনী’র প্রধানসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে।
থানায় জিডি বা অভিযোগ করতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমার জানা নেই। তবে কোনো কর্মকর্তা জনগণের সেবা দিতে গাফিলতি করলে বা অনিয়মে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ডিএমপির সব থানাকে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
সরকারি গাড়ির আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান। সরকারি হোক বা বেসরকারি—আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে হর্ন বা হুটার ব্যবহার নিষিদ্ধ, সেখানে যথাযথ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ট্রাফিক সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ঢাকা গড়তে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।