‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শিরোনামে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ২৮ জানুয়ারি
‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শিরোনামে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ২৮ জানুয়ারি

গোলটেবিল বৈঠকে ক্ষোভ

নারীদের মনোনয়ন না দিলে ভোট চাইতেও পাঠিয়েন না

রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নারীর ন্যায্য অধিকার। রাজনৈতিক দলগুলো এবার নির্বাচনে নারীদের ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও সেটাও রাখেনি। দেশে যেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী ভোটার, সেখানে এত কমসংখ্যক নারী প্রার্থী থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। আর যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেখানে তৃণমূলের নেতারা বেশি বঞ্চিত। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে ভূমিকা রাখতে হবে।

আজ বুধবার রাজধানীতে ‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শিরোনামে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, যাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ বাবা বা স্বামী রাজনীতি করতেন, সেই বিবেচনা থেকে পেয়েছেন। ফলে তৃণমূলের নারীরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে যদি নারীদের মনোনয়ন দেওয়া না হয়, তাহলে নারীদের দলের প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারেও পাঠানো উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন কেউ কেউ।

বৈঠকের আয়োজন করে যৌথভাবে ঢাকা স্ট্রিম, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, নারীরা ওই সময়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যের সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রার্থীকে ভোট দিতেন। এখন নারীরা কতটা স্বাধীন চিন্তা থেকে ভোট দেন, সেটা নিশ্চিত নয়। আগে যে নারীরা সংসদ সদস্য হতেন, তাঁরা ছিলেন মূলত নারী ও সামাজিক সংগঠন থেকে আসা শহুরে ও শিক্ষিত নারী। তৃণমূল ও শ্রমজীবী নারীদের সম্পৃক্ততা কম ছিল। তিনি বলেন, নারীদের এক পাশে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ভাগে ভাগ না হয়ে নারীদের একত্র হতে হবে। শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বললে হবে না, সমাধান ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কতসংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল রাজনৈতিক দলের। সংস্কার কমিশনের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নারীর ন্যায্য অধিকার। দুর্ভাগ্যবশত তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দলগুলো লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিল ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেবে, সেটাও দেয়নি।

যাঁরা মনোনয়ন দেন, তাঁরা মাঠে গিয়ে জরিপ করে মনোনয়ন দেন না বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, নারীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো চিন্তা করে নারীদের ‘সন্ত্রাসী নেই, মাস্তান নেই’। যে নারীদের বাবা বা স্বামী রাজনীতিতে রয়েছেন, সেই নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা করে। যাঁরা মনোনয়ন দেন, তাঁরা মাঠে গিয়ে জরিপ করে মনোনয়ন দেন না। ফলে মাঠে কাজ করা দলের নারীরা মনোনয়নবঞ্চিত হন। তিনি দলমত–নির্বিশেষে কোনো নারী আক্রান্ত হলে সবাইকে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান।

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী বলেন, নারীরা যদি প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হন, তাহলে নারীরা কীভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটে আস্থা পাবে, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। তিনি বলেন, ৫ শতাংশ মনোনয়নও নারীদের দেওয়া হয়নি। বিএনপি থেকে যে নারীরা মনোনয়ন পেয়েছেন, তাঁরা তা পেয়েছেন ‘পুরুষ কোটায়’ অর্থাৎ বাবা বা স্বামী রাজনীতি করতেন, সেই বিবেচনায়। রাজনীতিকদের নারীদের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ২৮ জানুয়ারি

বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ। তিনি বলেন, যেকোনো আন্দোলনে যখন নারী এসে দাঁড়ায়, তখন পরিস্থিতি বদলায়। তবে পটপরিবর্তন হয়ে গেলে নারীদের ও নারীদের বিষয়কে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাসনপ্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৭৬ জন নারী মনোনয়ন পেয়েছেন, যা মোট মনোনয়নের মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ন্যূনতম ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছিল। পরে জুলাই সনদেও সই করেছে দলগুলো। অথচ সেই অঙ্গীকারও দলগুলো রাখেনি। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সাময়িক পদ্ধতি হিসেবে নেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে সংরক্ষিত আসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা এখনো নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। নারীদের ওপর সহিংসতা চলছে। নির্বাচনী প্রচারে থাকা নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। ৫ শতাংশ নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার মতো অবস্থায় সমাজ এখনো যায়নি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে নারী সহিংসতার শিকার হলে এই দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্ন করেন তিনি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হাবিবা আক্তার চৌধুরী বলেন, অনেক নারী রাজনীতি বিষয়ে সচেতন হলেও রাজনীতি করতে চায় না। এটা একটা সংকট। মেয়েদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। এ কারণে জামায়াত তৃণমূল থেকে নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার কাজ করছে। জামায়াত থেকে নারীরা এবার মনোনয়ন চাননি। এবার নির্বাচনে জিতলে আগামী জাতীয় নির্বাচন থেকে জামায়াতের নারীরা ভোটে প্রার্থী হবেন।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা–১০ আসনের প্রার্থী নাসরীন সুলতানা বলেন, রাজনীতিতে নারীর সঙ্গে ‘প্রেমের চেয়েও বেশি প্রতারণা’ করা হচ্ছে। রাজনীতিতে ন্যায্য অংশীদারি নারী কেন পাবে না, এমন প্রশ্ন রেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি ভালো না অজুহাতে নারীদের মনোনয়ন না দিলে ভোট চাইতেও পাঠিয়েন না।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সামান্তা শারমিন, জয়নাল আবেদীন, হুমায়রা নূর, সিপিবির তাহমিনা ইয়াসমিন নীলা, রাজনীতিবিদ তাজনূভা জাবীন, সাংবাদিক কাজী জেসিন, ডাকসুর নেতা উম্মে ছালমা, ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশের সাদিক আল আরমান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিব্বির আহমদ, একতার বাংলাদেশের প্লাবন তারিক, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সাদাফ সায্ সিদ্দিকী। আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের প্রতিনিধি ও প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন।