ডিক্যাব টকে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে
ডিক্যাব টকে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে

ডিক্যাব টকে সারাহ কুক

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ২৫ কোটি পাউন্ডের বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ

বাংলাদেশ সরকার পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি ব্যক্তিদের ২৫ কোটি পাউন্ডের বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের জুন থেকে এসব সম্পদ জব্দ করেছে বলে ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনার সারাহ কুক জানিয়েছেন।

তবে জব্দ হওয়া এসব অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে উল্লেখ করে সারাহ কুক বলেছেন, ‘আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করতে হলে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণের প্রয়োজন হয়ে থাকে।’

আজ মঙ্গলবার ডিক্যাব টক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন হাইকমিশনার সারাহ কুক। দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে ডিক্যাব টকের আয়োজন করে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)। ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বলেন, ‘গত ১৮ মাস থেকে দুই বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছি। আমরা এ ক্ষেত্রে আরও কাজ করতে অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা নিয়ে কথা বলতে পারি না। সেগুলোর সব কটিতেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এটি আমাদের জন্য একটি উচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।’

সম্পদ জব্দের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন বজায় রাখার প্রতি যুক্তরাজ্যের দৃঢ় অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ বলেও উল্লেখ করেন সারাহ কুক। অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধে কী করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

সারাহ কুক বলেন, ‘এটি এমন কিছু নয়, যা রাতারাতি ঘটে যেতে পারে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জব্দ হওয়া অর্থ ফেরাতে হবে।’ এ ধরনের আর্থিক অপরাধ দমনে সহযোগিতার জন্য যুক্তরাজ্য এই গ্রীষ্মে লন্ডনে একটি ইলিসিট ফিন্যান্স সামিট (অবৈধ অর্থায়ন শীর্ষক সম্মেলন) আয়োজন করবে, যেখানে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার লক্ষ্যে প্রণীত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বলেন, স্পষ্টতই বাংলাদেশে এখন একটি সংসদ রয়েছে এবং একটি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ সদস্যদেরই দায়িত্ব হলো সংসদে একত্র হয়ে বিতর্ক ও আলোচনা করা। সংস্কারগুলো ও জুলাই সনদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম কর্মপন্থা নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের। এটি জাতীয় সংসদে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো বিষয় নয়।

যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে সংস্কারের দৃঢ় সমর্থক বলে উল্লেখ করেন সারাহ কুক। এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এমন কয়েকটি ক্ষেত্র ইতিমধ্যে তুলে ধরেছি, যেখানে আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি এবং এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে পারি তা নিয়ে আলোচনা করছি। অর্থনৈতিক সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমরা কীভাবে একত্রে কাজ করতে পারি, সে বিষয়েও কথা বলেছি।’

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের অংশীদারত্বের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে উল্লেখ করে সারাহ কুক বলেন, ‘আমরা সেদিকেই মনোযোগ দিতে চাই, কীভাবে এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও গভীর করতে পারি, সেদিকেও নজর দিতে চাই।’

মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে বর্তমান সংসদের ভূমিকার বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন বিষয়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। আমরা এমন সংস্কারের সমর্থক, যা দেশে সুশাসন, মানবাধিকার ও স্থিতিশীলতা উন্নত করে। আপনি যে নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, তা সংসদের বিষয়। এখন একটি কার্যকর সংসদ রয়েছে। সুতরাং কোন সংস্কার এবং কোন আইন ও অধ্যাদেশগুলো এগিয়ে যাবে, তা নির্ধারণ করা সংসদের কাজ।’

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও গণতন্ত্রের গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, সে প্রশ্নের জবাবে সারাহ কুক বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব রয়েছে। আমরা বিগত সময়ে গণতান্ত্রিক সংস্কারে একসঙ্গে কাজ করেছি। যুক্তরাজ্য নির্বাচন কমিশনকে সমর্থন করেছে এবং আরও অন্যান্য কাজের ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারে সমর্থন দিচ্ছি। সুতরাং এ ক্ষেত্রগুলোতে আমরা ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’

অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে সারাহ কুক বলেন, ‘আমরা কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে অনেক কাজ করছি, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিডার সঙ্গে কাজ করছি। কিন্তু অবশ্যই, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী যা ঘটছে তার দ্বারাও প্রভাবিত। সুতরাং এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই একটি চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই আমরা এই কঠিন অর্থনৈতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাই।’

দু্ই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে কি না জানতে চাইলে সারাহ কুক বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। আমরা একটি সমীক্ষা জাহাজ হস্তান্তরের জন্য দুই দেশের সরকার চুক্তি সই করেছে। আমরা ভবিষ্যৎ সামরিক নেতৃত্ব গঠনে প্রশিক্ষণে সহায়তা করার জন্যও একসঙ্গে কাজ করছি।’

মানবাধিকার ও মব সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্নে সারাহ কুক বলেন, বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশনের বৈশ্বিক সহসভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এটিও মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারের একটি অত্যন্ত জোরালো সংকেত।

‘সুতরাং আমি আশা করি, এটি প্রমাণ করে যে আমরা এ বিষয়গুলোকে কতটা গুরুত্ব দিই এবং আমাদের কাজের অংশ হিসেবে আমরা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা চালিয়ে যাব। আর বাংলাদেশের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে যে আইনের শাসনের ওপর মনোযোগ দেওয়াই তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য এবং এটি অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,’ বলেন তিনি।

এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ চুক্তি সই করেছিল। এ নিয়ে অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বলেন, ‘এটি দুই দেশের সরকারের মধ্যকার চুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিমান চলাচল খাতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে অংশীদারত্বকে উন্নত বা শক্তিশালী করা। একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে বাংলাদেশের। যুক্তরাজ্য সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়তা করতে পারে। তাই আমরা চুক্তিটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছি।’