
জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি–নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
গতকাল বুধবার রাত পৌনে ১০টার দিকে তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে এ ভাষণ দেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় এ ভাষণ প্রচারিত হয়।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে গতকাল বেলা তিনটায় সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক হয়। পরে রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে তারেক রহমান বলেন, ‘হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি। তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এ যাত্রালগ্নে আমরা দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমি দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা দিতে চাই, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা দল-মত, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে পাহাড় কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।
তারেক রহমান ভাষণে ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসনকাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।’
দেশবাসীকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সবার প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা দয়া করে সতর্ক থাকবেন।’
তারেক রহমান বলেন, রমজান মাসে রোজাদারেরা, বিশেষ করে ইফতার, তারাবিহ, সাহরি—এই সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চান। বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী ও ক্রেতাসাধারণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চায়। সুতরাং সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নিলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, এ ব্যাপারে যেকোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। ক্রেতা-বিক্রেতা, গ্রহীতা—এই সরকার সবারই সরকার।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরেছিলেন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। সেদিনের কথা উল্লেখ করে ভাষণে তারেক রহমান বলেন, ‘সেদিন আমি বলেছিলাম, দেশ এবং জনগণের জন্য “আই হ্যাভ এ প্ল্যান”। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আমার “প্ল্যান-পরিকল্পনার” অনেক কিছুই আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম।...আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশা আল্লাহ।’ এ ক্ষেত্রে সবার সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি।
দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ভাষণে বলেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে আমি দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যাঁরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দল-মত, ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার আমার আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।’
শিক্ষার্থী ও তরুণসমাজের উদ্দেশে নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মেধায়, জ্ঞান–বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যত রকমের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সব রকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
ভাষণে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানানোর আগে আমি সরকারের মন্ত্রী ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি (করমুক্ত) গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট–সুবিধা নেবেন না।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ করবে। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদীয় দলের এসব সিদ্ধান্ত ন্যায়পরায়ণতার আদর্শেরই প্রতিফলন।’
সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে উল্লেখ করে ভাষণে তারেক রহমান বলেন, জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব রকমের কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিচ্ছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি-নিয়মে। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব–প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিভাগীয় শহরগুলোয়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজট প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। হাটে, মাঠে, ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
মানুষ তাঁর নিজ জেলা কিংবা নিজের বাসাবাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থাকে সহজ, সুলভ ও নিরাপদ করা করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।