
বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের বার্তা নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় এসেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি আগামীকাল শুক্রবার সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। আগামী শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
আজ রাত সোয়া ১০টায় ঢাকায় এসে পৌঁছালে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
এ বছরের মার্চে তুরস্কে দ্বিপক্ষীয় সফরে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে এবার ফিরতি সফরে ঢাকায় আসছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর এটি ছিল কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। একই সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম ঢাকা সফর।
রাজনৈতিক বার্তার গুরুত্ব
ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তুরস্ক দ্রুত ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে সভাপতি পদে বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির সাবেক প্রধান হাকান ফিদানকে দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে তাঁর ঢাকা সফরকে অনেক পর্যবেক্ষক কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সফর হিসেবে দেখছেন।
আলোচনায় কৌশলগত সহযোগিতা
ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আজ শুক্রবার ঢাকায় অনুষ্ঠেয় দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি নেই। তবে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নিরাপত্তা সংলাপ ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয়ের মতো প্রসঙ্গগুলো সামনে আসতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ড্রোন, সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে এরদোয়ানের দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক বাংলাদেশকে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাবনাময় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলোতেও দুই দেশ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার দুপুরের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেবেন।
রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্ক শুরু থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম সক্রিয় সমর্থক দেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আঙ্কারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সফরের মধ্য দিয়ে তুরস্ক ইঙ্গিত দিতে পারে ঢাকা ও আঙ্কারা তাদের সম্পর্ককে বাণিজ্যিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিসরে নিয়ে যেতে আগ্রহী। ফলে হাকান ফিদানের আসন্ন ঢাকা সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।