‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত বুধবার অনুষ্ঠিত হয়
‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত বুধবার অনুষ্ঠিত হয়

অনলাইন আলোচনা

সচেতনতা বাড়ালেই ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি কমবে

ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ, এখনো অনেকেই রোগটি একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চিকিৎসার জন্য আসছেন। তাই সময়মতো লক্ষণ চিহ্নিত করা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ক্যানসার নিয়ে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। এতে ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি কমবে।

‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় কথাগুলো উঠে আসে। এতে ক্যানসার নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক পরামর্শ দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ল্যাপারোস্কপিক অ্যান্ড হিস্টোরেস্কোপিক সার্জন অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সরোজ কান্তি চৌধুরী এবং মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাগরিকা শারমিন। পর্বটি বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো, এসকেএফ অনকোলজি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন নাসিহা তাহসিন। ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে গত বুধবার অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে এসকেএফ অনকোলজি।

ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোলের (ইউআইসিসি) উদ্যোগে প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ‘বিশ্ব ক্যানসার দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘অনন্যতায় ঐক্য’।

অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থাপক জানতে চান, বাংলাদেশে কোন ক্যানসারের হার সবচেয়ে বেশি?

উত্তরে ডা. আলী আসগর চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে ব্রেস্ট, মুখগহ্বর ও জরায়ুমুখের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে ক্যানসার শনাক্তকরণের হার বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি অনেক লেট স্টেজে বা দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে, যার ফলে মৃত্যুর হার এখনো অনেক বেশি। দেশে প্রতিবছর আনুমানিক আড়াই থেকে ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন।

এরপর উপস্থাপক ক্যানসারের সাধারণ কিছু লক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আলী আসগর চৌধুরী বলেন, ক্যানসারের বেশ কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে। যেমন স্তন বা শরীরের যেকোনো জায়গায় চাকা হওয়া, তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, মলমূত্র ত্যাগের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন, খেতে গেলে গলায় আটকানো এবং কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যানসার নিশ্চিত, বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপক জানতে চান, বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে বর্তমানে কোন ধরনের ক্যানসারের হার বেশি এবং কেন?

উত্তরে অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নারীরা স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব, বিশেষ করে এই অঙ্গগুলো নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করা, স্ক্রিনিং না করা, অতিরিক্ত ওজন এবং এইচপিভি (HPV) ভাইরাসের সংক্রমণ।

অনিয়মিত পিরিয়ড বা তলপেটব্যথা কখন ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে এবং সারভাইক্যাল বা ওভারিয়ান ক্যানসারের মূল লক্ষণগুলো কী?

উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী বলেন, অনিয়মিত পিরিয়ড বা তলপেটে ব্যথা সব সময় ভয়ের কারণ নয়। তবে অতিরিক্ত ওজন এবং হরমোনের ভারসাম্যের অভাব দীর্ঘ মেয়াদে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। আর জরায়ুমুখ বা সারভাইক্যাল ক্যানসারের প্রধান লক্ষণগুলো হলো দুর্গন্ধযুক্ত অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, সহবাসের পর রক্তক্ষরণ এবং বিশেষ করে মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রক্তস্রাব শুরু হওয়া। অন্যদিকে ওভারিয়ান বা ডিম্বাশয় ক্যানসারের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো শুরুতে বেশ অস্পষ্ট থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই পেট ফুলে যাওয়া, খাবারে তীব্র অরুচি এবং অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার সঙ্গে ক্যানসারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না? জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী বলেন, ইনফার্টিলিটির চিকিৎসার ওষুধের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও যাঁরা ইনফার্টিলিটিতে ভোগেন, তাঁদের এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া ওবেসিটি, হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিস থাকলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।

প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপক জানতে চান, জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি ভ্যাকসিনের নিয়ম কী?

অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী জানান, ‘৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের জন্য ২ ডোজ ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর। এ ছাড়া ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত নারীরা ৩ ডোজ ভ্যাকসিন নিতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, স্কুলগামী মেয়েদের জন্য একটি ডোজই যথেষ্ট।

স্তন ক্যানসারের সচেতনতায় নারীরা ঘরে বসে কীভাবে সেলফ এক্সামিনেশন করতে পারেন? জানতে চাইলে ডা. সাগরিকা শারমিন বলেন, ‘সেলফ এক্সামিনেশনে পিরিয়ড শেষ হওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে স্তন পরীক্ষা করতে হয়। আয়নায় দেখতে হবে দুই স্তন একই রকম কি না, নিপল ভেতরে ঢুকে গেছে কি না বা চামড়া লাল হয়ে কমলার খোসার মতো হয়েছে কি না। এরপর দেখতে হবে, কোথাও কোনো চাকা আছে কি না। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও প্রতি মাসে নির্দিষ্ট তারিখে এই পরীক্ষা করা জরুরি। তবে স্ক্রিনিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৪০ বছর হয়ে গেলে প্রত্যেক নারীর উচিত স্ক্রিনিং করা।

‘বিশ্ব ক্যানসার দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশে ক্যানসারের বর্তমান পরিস্থিতি, রোগনির্ণয়, ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা-সুবিধা বিষয়ে পরামর্শ দেন ডা. আলী আসগর চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী, ডা. সরোজ কান্তি চৌধুরী ও ডা. সাগরিকা শারমিন

এরপর উপস্থাপক জানতে চান, বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসারের হার কেমন?

এ প্রসঙ্গে ডা. আলী আসগর চৌধুরী জানান, ‘ফুসফুস ক্যানসার আমাদের দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তামাক ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে বাতাসে প্লাস্টিকের কণা ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে অধূমপায়ী এবং নারীদের মধ্যেও এর প্রকোপ লক্ষ করা যাচ্ছে।’

এরপর উপস্থাপক জানতে চান, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া কি সব সময় ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ?

উত্তরে ডা. সরোজ কান্তি চৌধুরী বলেন, কাশির সঙ্গে রক্ত গেলে সব সময় সেটি ক্যানসারের লক্ষণ নয়। এটি অনেক সময় যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হার্টের সমস্যা বা ইনফেকশনের কারণেও হতে পারে। যক্ষ্মার ক্ষেত্রে জ্বর, অরুচি ও রাতে ঘাম হওয়ার মতো লক্ষণ থাকে। তবে দীর্ঘদিনের খুসখুসে কাশি, ওজন হ্রাস ও ঝুঁকির কারণগুলো যেমন স্মোকিং বা কাজের পরিবেশ ইত্যাদি বিচার করে চিকিৎসক ক্যানসার শনাক্ত করেন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে ডা. সরোজ কান্তি চৌধুরী বলেন, সাধারণত ধারণা করা হয় কেবল ধূমপান করলেই ফুসফুসের ক্যানসার হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। বাতাসের মান খারাপ হওয়া, বিশেষ করে বাতাসে ভাসমান প্লাস্টিক কণা এবং কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া অধূমপায়ীদের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল ধূমপান ত্যাগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং পরিবেশদূষণ রোধে সচেতন হওয়া এবং দূষিত পরিবেশে কাজের সময় মাস্ক বা যথাযথ প্রোটেক্টিভ গিয়ার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।