
দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা সহিংসতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩ জন নিহত এবং মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংসতা ঘটে। এসব সহিংসতায় নিহত ১৩৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন রয়েছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ জন।
মব সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক মামলার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ২৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ হাজার ৯৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৪২ হাজার ৫২৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান ও বিভিন্ন মামলায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সাংবাদিকদের পরিস্থিতি বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত এবং ১৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
* মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ১৬৮, আহত ২৪৮* হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩৯ জন সাংবাদিক* কারাগারে ৩০ কয়েদি ও ৬২ হাজতির মৃত্যু* ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিহত ৩২, আহত ও আটক ১০২* নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২০৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু
হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, নির্যাতন ও গুলিতে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন সংঘর্ষ বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া কারাগারে ও কারা হেফাজতে ৩০ জন কয়েদি ও ৬২ জন হাজতিসহ মোট ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নারী ও শিশুর মানবাধিকার পরিস্থিতিও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ৮২৮ জন, যাদের মধ্যে ৪৭৪টি শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮ জনকে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৩৭১ শিশু। নিহত হয়েছে ২৮৮ শিশু।
সীমান্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম প্রতিবেদনে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।