দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ।
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ।

রেললাইনের জন্য গাছ ও বন আগেই গেছে, এখন চারারও হদিস নেই

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথের দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৭ কিলোমিটার তিনটি গহিন বনের ভেতর দিয়ে গেছে। রেলপথ নির্মাণের সময় কাটা পড়েছিল পাহাড়, হারিয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ গাছ। বনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৭ লাখ ২০ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, হারানো প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেটা হয়নি। রেলওয়ের লাগানো ৪ লাখ ৫৩ হাজার চারার কোনো হদিস নেই।

চারাগুলোর হারিয়ে যাওয়ার তথ্য বন বিভাগের জরিপে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে এ জরিপ করা হয়। জরিপে রেলপথটির ১২ কিলোমিটারজুড়ে সাতটি প্লট নির্বাচন করে দেখা যায়, গড়ে মাত্র ৩৭ শতাংশ গাছের চারা এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই আবার নিষিদ্ধ আকাশমণি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার রেলপথের আশপাশে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল।

টিকে আছে আকাশমণি

লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের সুফিনগর এলাকা। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরেজমিনে এলাকাটি ঘুরে দেখা হয়। এ সময় সুফিনগরের ৭১/৪ পিলার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার রেললাইনের দুই পাশে দেখা যায়, প্রায় জায়গাই খালি। কয়েক কিলোমিটার পর শতাধিক আকাশমণিগাছ।

বন বিভাগের জরিপে রেলপথটির ১২ কিলোমিটারজুড়ে সাতটি প্লট নির্বাচন করে দেখা যায়, গড়ে মাত্র ৩৭ শতাংশ গাছের চারা এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই আবার নিষিদ্ধ আকাশমণি।

কথা হলো সুফিনগর গ্রামের বাসিন্দা নুরুন্নাহার বেগমের (৬৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেই গাছের চারা লাগাতে দেখেছি। প্রথম প্রথম পাহারাদারও দেখেছি। পরে আর দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ চারাই মরে গেছে কিংবা গরু–ছাগলে খেয়েছে। কেউ রক্ষণাবেক্ষণ করেনি।

সুফিনগরের পরেই রাতালগুল গ্রাম। রেললাইন ধরে হেঁটে গিয়ে দেখা গেল, কিছু আকাশমণিগাছ এখনো টিকে আছে। ওই গ্রামের বাসিন্দা আরাফা বেগম বলেন, ‘গাছের চারা লাগাতে দেখেছি দুই থেকে তিন বছর আগে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে চারাগুলো বেঁধে দিয়েছিল। তবে চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে দিলে চারাগুলো বাঁচত।’

বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জ অফিসের পেছনে রেললাইনের দুই পাশে হাতির চলাচল ঠেকাতে প্রতিবন্ধকতা দেয়াল রয়েছে। সেই জায়গায় অনেক আকাশমণি এখনো টিকে আছে। মাঝেমধ্যে কিছু অর্জুন, জাম, চালতা, জলপাই ও জারুলের চারা চোখে পড়ল।

কয়েক বছর আগেই গাছের চারা লাগাতে দেখেছি। প্রথম প্রথম পাহারাদারও দেখেছি। পরে আর দেখিনি।
—নুরুন্নাহার বেগম, স্থানীয় বাসিন্দা

রেললাইনের দুই পাশে আটটি সারিতে এসব চারা রোপণ করা হয়েছে। একেকটি সারিতে একেক প্রজাতির চারা। দুটি চারার মধ্যকার দূরত্ব দেড় থেকে দুই ফুট। কোথাও কোথাও তা তিন থেকে চার ফুট। অথচ বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, চারা রোপণের ক্ষেত্রে দুটির মধ্যে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব রাখতে হয়।

চুনতি রেঞ্জ অফিসের পেছনে রেললাইনের দুই পাশে প্রতিবন্ধকতা দেয়াল থাকায় চারা বেশ ঘন করে লাগানো হয়েছে। প্রায় চার কিলোমিটার রেলপথে এমন প্রতিবন্ধকতা দেয়াল রয়েছে।

রেলওয়ে যা বলছে

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক পরামর্শক ছিলেন বন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা তপন কুমার দে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে এসব গাছের চারার দেখভাল করা হয়েছিল। তখন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চারা বেঁচে ছিল। এরপর রেলওয়েকে পাহারাদার নিয়োগ দিতে বলা হয়েছিল। স্থানীয় লোকজন বলছেন, সেটা না করায় গরু–ছাগলে চারা খেয়ে ফেলেছে।

রেলওয়ে ও বন বিভাগের মধ্যে ২০২০ সালের জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এতে রেললাইনের দুই পাশে লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যার ভার ১০ বছরের জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়। তবে পাঁচ বছরে চারাগুলো বেহাল। বেশির ভাগেরই কোনো হদিস নেই।

রেলওয়ে ও বন বিভাগের মধ্যে ২০২০ সালের জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এতে রেললাইনের দুই পাশে লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যার ভার ১০ বছরের জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়। তবে পাঁচ বছরে চারাগুলো বেহাল। বেশির ভাগেরই কোনো হদিস নেই।

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ। চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের জাঙ্গালিয়া এলাকায়

দোহাজারী–কক্সবাজার প্রকল্পের পরিচালক আসাদুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি ওই সময়ে রেলওয়ের পরামর্শক ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) এ এন এম খসরুর বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।

যোগাযোগ করা হলে এ এন এম খসরু দাবি করেন, ‘প্রায় শতভাগ চারাই টিকে আছে।’

এ এন এম খসরু আরও জানান, এ বছরের এপ্রিলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও বাংলাদেশ রেলওয়ের যৌথ গণনায় ৭ লাখ ২০ হাজার ৩২১টি গাছ পাওয়া গেছে।

দায়িত্ব থেকে বন বিভাগ বাদ

২০১৯ সালের ২০ মে রেললাইনের জন্য বনভূমি অধিগ্রহণের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকা চারটি শর্তের মধ্যে একটি—বনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে তিন গুণ গাছের চারা রোপণ করবে।

কিন্তু পরের বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে হওয়া সমঝোতা স্মারকে চারা রোপণের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থেকে বন বিভাগকে বাদ দেওয়া হয়।

রেললাইনের দুই পাশে বনের জায়গা রেলওয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের সহযোগিতা না পেলে আমরা কিছু করতে পারি না।
—আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাছের চারার প্রজাতি নির্বাচন ও রোপণে আমরা রেলওয়েকে একটি সহযোগিতামূলক প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কোনো সাড়া পাইনি।’

আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, ‘রেললাইনের দুই পাশে বনের জায়গা রেলওয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের সহযোগিতা না পেলে আমরা কিছু করতে পারি না।’

ইয়াছিন নেওয়াজ আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, রেললাইনের দুই পাশে শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, ছাতিম ও সোনালু ফুলের চারা রোপণ করতে। এতে বন্য প্রাণীদের জন্য খাদ্যের সংস্থান হতো, সৌন্দর্যও বাড়ত।’

দোহাজারী–কক্সবাজার পথে ট্রেন

সময় লাগতে পারে ‘৩০ বছর’

চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান—এ তিনটি বনের ভেতর দিয়ে রেললাইন গেছে।

এ কাজে সরকার ২০৭ একর ডি–রিজার্ভ (সংরক্ষিত বনের স্ট্যাটাস থেকে বাদ দেওয়া) বনভূমি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করে। কেটে ফেলা হয় প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার গাছ। এরপর তিনটি বনের জীববৈচিত্র্যগত ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৭ লাখ ২০ হাজার চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফেরেনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেন, প্রাকৃতিক বন ফেরানো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। চারা লাগানোর পর সেটি যদি টিকেও যায়, তবু প্রাকৃতিক বন ফিরিয়ে আনতে কমপক্ষে ৩০ বছর লেগে যাবে।

গত বছরের এপ্রিলে রেললাইন পরিদর্শন করার অভিজ্ঞতা থেকে অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেন, ‘এক মাইলের মতো হেঁটেছি। রেললাইনের পাশে অনেক জায়গায় খুব কম চারা দেখেছি। কিছু আকাশমণির চারা দেখা গেছে। চারা রোপণের কাজটি ঠিকঠাক হয়নি।’

অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেন, বর্ষায় রেললাইনের দুই পাশে মাটি ধুয়ে যাচ্ছে। মাটির ক্ষয় হচ্ছে। নানামুখী ডিস্টার্বেন্স (প্রতিবন্ধকতা) আছে। ফলে প্রাকৃতিক বন ফিরে পাওয়া কঠিন।