রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান

সাক্ষাৎকার: রওনক জাহান

দেশের মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে, তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর এবারের আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং দেশের গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

প্রশ্ন

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের কাছে। তিনি বাংলাদেশে নারীবাদের পথিকৃৎ। কারণ, সবার আগে তিনিই ‘উইমেন ফর উইমেন’ প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। আমরা তাঁর জীবনকাহিনি শুনব। অন্য সবার মতো তাঁর শৈশব থেকেই শুরু করি। তাঁর মুখেই আমরা বাকি কথাগুলো শুনি। আপা, আপনাকে স্বাগত জানাই।

রওনক জাহান: ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

আমরা অন্য সবারটা একদম জন্ম থেকেই শুরু করি, তো আপনার জন্ম আমি দেখতে পেলাম ১৯৪৪ সালের ২ মার্চ। এটা ঠিক আছে তো?

রওনক জাহান: হ্যাঁ, ওটাই। আমার পাসপোর্টে ওটাই লেখা আছে।

প্রশ্ন

আচ্ছা। আপনার জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে?

রওনক জাহান: হ্যাঁ, আমার জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের একটা ছোট জায়গায়, বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্টের খাতরা বলে একটা জায়গায়। এটি সাঁওতাল–অধ্যুষিত একটা পাহাড়ি জায়গা। আমার আব্বু, যিনি ডিস্ট্রিক্ট বিসিএস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং উনি তখন ওখানে সার্কেল অফিসার হিসেবে খাতরায় পোস্টিং ছিলেন।

প্রশ্ন

ওনার নাম কী?

রওনক জাহান: ওনার নাম হচ্ছে আহমদুল্লাহ।

প্রশ্ন

আহমদুল্লাহ। আর আপনার আম্মার নামটাও একটু জেনে নিই।

রওনক জাহান: আমার আম্মার নাম হচ্ছে রাজিয়া বেগম। আমি এখন বলে দিতে চাই যে আমার পাসপোর্টে কিন্তু খাতরা জন্মস্থান বলে উল্লেখ নেই। আমার পাসপোর্টে উল্লেখ আছে ঢাকা। কারণ, আমি ১৯৬৫ সালে যখন পাসপোর্ট করতে যাই, তখন যদি আমি বলতাম যে এটা পশ্চিমবঙ্গের কোনো জায়গা, তাহলে আমি কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট আনাতে পারতাম না, পাসপোর্টও পেতাম না। ঢাকায় আমাদের বাড়ি ছিল, অতএব ঢাকায় বলা হয়েছে।

প্রশ্ন

কোনো অসুবিধা নেই। আমার যেমন, মানে বাস্তব জন্মতারিখ যেটা, সেটা পরে আব্বার ডায়েরিতে পেয়েছি আর আমার সার্টিফিকেটের জন্মতারিখ তো আলাদা বা পাসপোর্টের জন্মতারিখ আলাদা। যাহোক, তো ১৯৪৪ সালের পরে আপনারা ’৪৭–এর পরেই কি এই পূর্ববঙ্গে চলে এলেন?

রওনক জাহান: হ্যাঁ, আমার আব্বু যে প্রথম বর্ধমান ডিস্ট্রিক্টে, মানে ’৪৭ সালের আগে পুরো সময়টা ওনারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছিলেন। ওনারা বর্ধমানে ছিলেন, বাঁকুড়ায় ছিলেন, তারপর মেদিনীপুরে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে সব অফিসারকে বলা হলো যে একটা অপশন দাও, তোমরা কোথায় কাজ করবে। যারা মুসলমান অফিসার ছিল, তারা তো সবাই পাকিস্তানের পক্ষে অপশন দিল। অতএব ’৪৭–এর পরে আব্বু চলে আসেন, তখন প্রথম ওনার পোস্টিং হয় কুমিল্লায়। তারপর পশ্চিমবঙ্গের কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার যেসব জায়গার কথা মনে আছে, আমি প্রথম স্কুলেও যাই কুমিল্লায়। তারপর বাগেরহাটে আমরা ছিলাম, সেখানে স্কুলে যাই। তারপর ভোলায় আব্বু পোস্টেড হন, সেখানেও একটা ইন্টারেস্টিং স্মৃতি, সেটা আমি বলব। তারপর মুন্সিগঞ্জে ছিলাম, তারপর নারায়ণগঞ্জে ছিলাম। আর তারপর ঢাকায় এলাম, যখন আমি কলেজে পড়ি। অতএব স্কুলগুলো সব বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্টে ছিল।

প্রশ্ন

আপনার ব্যাপক অভিজ্ঞতা হলো। ভোলায় ইন্টারেস্টিং স্মৃতির কথা বলছিলেন, ওটা...

রওনক জাহান: হ্যাঁ, সেটা বলব। কিন্তু তার আগে আমি আমার জন্মের কথাটা একটুখানি বলি, যেটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি। এ জন্যই বললাম যে এসব গল্প ছোটবেলায় শোনার পর যে আমাদের দেশের নারীদের জীবনগুলো কেমন, সে সম্বন্ধে একটা অল্প বয়সী মেয়েরও ধারণা হয়। সেই যুগে আমাদের বলা হতো না যে কেমন করে জন্ম হয়েছে। কিন্তু অনেক পরে তখন আম্মু বললেন যে ওই যে খাতরা নামের জায়গাটা, সেটা একটা পাহাড়ি জায়গা। আর ওখানে পানি ও রকম পাওয়া যেত না। পাতকুয়া থেকে পানি তুলতে হতো। তা আমার যেদিন জন্ম, সকাল থেকে আম্মুর প্রসববেদনা আরম্ভ হয়েছে। কিন্তু আব্বু সেদিন একটা ট্যুরে যাবেন। অতএব আম্মু সকালে কিন্তু আব্বুকে বলেননি যে আসলে ওনার এখন ব্যথা আরম্ভ হয়েছে। আম্মু বললেন যে সেই ব্যথা নিয়ে উনি পাতকুয়া থেকে পানি তুলে দিয়েছেন। আব্বু গোসল করে গেছেন ট্যুরে। সন্ধ্যাবেলায় এসে আব্বু দেখেন, আম্মু ও রকম ব্যথায় কাতর। আব্বু বেশ কড়া মেজাজি ছিলেন। তখন স্ত্রীকে এমন দেখে আব্বু আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিয়েছেন। যাহোক, তারপর গিয়ে একজন দাই, ওখানকার ট্রেইনড দাই নিয়ে এলেন আর অনেক গভীর রাত্রে আমার জন্ম হয়। তারপর আম্মু বললেন যে আমার জন্মের পরে আমি অত বেশি কান্নাকাটি করছিলাম না। তখন আম্মু ভাবলেন যে আচ্ছা বাচ্চাটা কি বেঁচে আছে? তারপর উনি শোনেন, চুকচুক করে একটা শব্দ হচ্ছে। তারপর উনি দেখেন, আমি আমার ওই হাতগুলা চুষছি। তারপর আম্মু আমাকে জানান, খিদে পেলেই সব সময়ই নাকি আমি ও রকম চুকচুক করে শব্দ করতাম। আম্মু বুঝতেন, আমার খিদে পেয়েছে। এই যে আম্মু জন্ম দিলেন ছয়টা বাচ্চা, কিন্তু সব কটি বাচ্চাই আসলে বাড়িতেই হয়েছে এবং সব কটিই...

প্রশ্ন

আপনি কত নম্বর?

 রওনক জাহান: আমি হচ্ছি নাম্বার টু। কিন্তু যখন...

প্রশ্ন

কয় ভাইবোন?

রওনক জাহান: আমরা ছয় ভাইবোন।

প্রশ্ন

কয়জন ভাই, কয়জন বোন?

রওনক জাহান: আমরা তিনজন তিনজন।

প্রশ্ন

আচ্ছা। আচ্ছা এখন যদি...

রওনক জাহান: ভোলারটা...

প্রশ্ন

ভোলারটা একটু বলেন।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ, ভোলার কথা বলতে চাই; যেহেতু আমরা বিভিন্ন মফস্সল স্কুলে পড়ছিলাম। আপনাকে বলে নিই যে আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন আব্বু সব সময় ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই সমানভাবে লেখাপড়ার ওপর জোর দিতেন। খুব ছোটবেলা থেকেই জানতাম যে আমরা লেখাপড়া করব, বিদেশে যাব। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। সব সময় পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে। আর তারপর স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাব, ডিগ্রি নেব। দেশে ফেরত এসে দেশকে সার্ভ করতে হবে। যদি কোনো মেয়ের ছবি পত্রিকায় উঠত যে সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, একটা স্কলারশিপ নিয়ে গিয়েছে, ওই ছোটবেলা থেকে আমাদের এগুলো দেখিয়েছেন আব্বু। এগুলো দেখে আমরা অভ্যস্ত। আরেকটা ইন্টারেস্টিং জিনিস বলতে চাই, সেটা হচ্ছে, আব্বু কোনো দিন ছোটবেলায় আমাদের—মেয়েদের—পুতুল নিয়ে খেলতে দিতেন না। বলতেন, না, ছেলে–মেয়ে এক খেলনা দিয়ে খেলবে। তো যাহোক, বাকি মেয়েরা খেলছে, তখন মনে একটু একটু আফসোস হতো। অনেক পরে, মানে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডে পড়ি, ষাটের দশকের শেষের দিকে, তখন নারীবাদী আন্দোলন আরম্ভ হচ্ছে এবং তখন পড়ে দেখলাম, ওখানেও অনেকে যেটা আর্গুমেন্ট করছে যে আসলে ছোটবেলাতেই যদি মেয়েদের আলাদা করে দেওয়া হয় যে এই খেলাটা—পুতুল খেলাটা—মেয়েদের আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খেলাটা ছেলেদের, তাহলে অনেক অল্প বয়সেই মেয়েদের মধ্যে একটা জেন্ডার স্টেরিওটাইপিং হয়ে যায়। তখন আমি ভাবলাম, সেই পঞ্চাশের দশকে কেমন করে ওনার মাথায় এটা এল যে না, মেয়েরা আলাদা খেলনা নিয়ে খেলবে না। তবে দুঃখের ব্যাপার যে আব্বুর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার আমার তেমন সুযোগ হয়নি। কারণ, আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসার দুই মাসের মধ্যে উনি মারা গেলেন।

প্রশ্ন

ওনার তখন বয়স কী রকম হয়েছিল?

রওনক জাহান: ওনার বয়স তখন ৫৭ বছর। খুবই আরলি। তখনো চাকরিতে ছিলেন। আচ্ছা, এখন ভোলার গল্পটাতে যাই, যেটার সঙ্গে আমার ছোটবেলা কী কী ভ্যালু নিয়ে বড় হয়েছি, সেটা বলছি। আব্বু ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, উনি খুব আইন মেনে চলতেন। ওনার বসরা যদি বলে, এইটা করে দাও, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আব্বু কিন্তু সেটা কখনো মানতেন না। তা আমরা যখন বাগেরহাটে থাকি, ওটা ’৫৪; … ভাষা আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন; তো তখন ওখানের একজন আওয়ামী লীগ নেতা পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন—শেখ আবদুল আজিজ, তো উনি তখন ছাত্র এবং আওয়ামী লীগার। তখন ওনার বিরুদ্ধে একটা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে দিয়েছে। তারপর তখন আব্বুর ওপরে যে এসডিও, উনি বলছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, এতে ইয়ে করে দাও। আব্বু  দেখেন যে আসলে তো কোনো রাষ্ট্রদ্রোহ নেই। আব্বু তো খুব কড়া। উনি তো বসের কথা শুনবেন না। একদম সকালেই গিয়ে কোর্ট খুলে আব্বু এই মামলা ডিসমিস করে দিয়েছেন। তারপর তো…আচ্ছা যাহোক, আব্বু তো শহরে খুব হিরো হলেন। তারপর যুক্তফ্রন্টের ইলেকশনের পরে আর যে মুহূর্তে আবার ওই সেকশন ৯২ তিন মাসের মাথায় হয়ে গেল তো সঙ্গে সঙ্গে আব্বুকে একটা পানিশমেন্ট পোস্টিং দিয়ে দেওয়া হলো, যেটা হচ্ছে ভোলা। ওটা সবাই জানতেন যে আব্বুর পানিশমেন্টটা কী। আব্বুর বড় দুটি মেয়ে এবং উনি তাদের পড়াতে চান। অতএব আমি তখন ক্লাস নাইনে উঠেছি। ভোলায় কিন্তু কোনো গার্লস স্কুল নেই। আমার বোন তখন কলেজে, ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে। এদিকে আমি ক্লাস ফাইভ থেকে স্কলারশিপ পাই। আমাকে কোনো একটা স্কুলে এনরোল্ড হতে হবে। তা এখন আব্বু ওখানে গিয়ে দেখলেন যে ভোলায় একটা গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল আছে, হাইস্কুল। তারপর আব্বু ল রুলস দেখেন যে রুলসে আছে, সরকারি কর্মচারীর কোনো সন্তান—লেখা নেই ছেলে কিংবা মেয়েসন্তান—একটা গভর্নমেন্ট স্কুল থাকলে সেই চাইল্ডকে অ্যাডমিশন দিতে বাধ্য। তো আব্বু গিয়ে হেডমাস্টারকে বলেন যে আমার মেয়ে চাইল্ড, তো আপনার স্কুলে ভর্তি করেন। তো বলে, না, আমাদের তো বয়েজ স্কুল, আমরা মেয়েকে ভর্তি করব না। আর তারপর আব্বু বলেন, না, আপনি এনরোল্ড রাখেন, যাতে ও স্কলারশিপগুলো পায়। বলে, ঠিক আছে, আমি এনরোল্ড করব, ক্লাসে আসতে পারবে না। শুধু পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে। অতএব আমার পুরো ক্লাস নাইনটা আমি ওই বাসায় বসে পড়তাম। আমাকে অঙ্ক ছেড়ে দিতে হতো। কারণ, বাসায় বসে তো আর নিজে নিজে আলজেব্রা–জিওমেট্রি শেখা যায় না। কিন্তু ওই পরীক্ষার সময় আমি হেডমাস্টারের ঘরে গিয়ে বসে পরীক্ষা দিতাম। তখন আমার সামনে পিয়ন, পেছনে কাজের লোক। এ রকম চারটা, মানে প্রহরীর মতন তারা। আমি মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ি, তা স্কুলে নিয়ে যেত। আর সারা স্কুলের সব ছেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখত যে একটা মেয়ে এই স্কুলে পড়ে এবং পরীক্ষা দিতে আসবে। তো ওইভাবে তখন ক্লাস নাইনটা পড়ে তারপর মুন্সিগঞ্জে এলাম আরকি।

প্রশ্ন

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন মুন্সিগঞ্জে?

 রওনক জাহান: ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম মুন্সিগঞ্জে। আমি বলব যে মুন্সিগঞ্জের স্কুলটা আমার স্কুলজীবনে আসলে খুব একটা ইম্পরট্যান্ট রোল প্লে করেছে। ওখানে যে স্কুলে ভর্তি হলাম, ওটা প্রাইভেট এভিজেএম গার্লস স্কুল বলে। ওখানে একজন শিক্ষক ছিলেন ওনার নাম ছিল চিন্তাহরণ দে। উনি যে বিএ পাস করা কিংবা একটা ভালো একটা ডিগ্রি নেওয়া, তা নয়। উনি সারা জীবন বিয়ে করেননি, কিন্তু স্কুলটাই ছিল ওনার জীবন এবং উনি ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সকাল থেকে স্কুলে পড়ে থাকতেন। তো আমি যখন এসে ভর্তি হলাম ক্লাস নাইনে শেষের দিকে, তখন উনি কয়েক মাসেই ধারণা করলেন যে আমি খুব ভালো রেজাল্ট করব। তখন উনি আমাকে খুব ইন্সপায়ার করতেন। আর মুন্সিগঞ্জের ওই জায়গায় লেখাপড়ার দিকে খুব চর্চা ছিল। ছেলেদের স্কুলটা ভালো ছিল। ওখানে আমাদের সময়ে বলা হতো, প্রতিবছর স্ট্যান্ড করা মানে ছেলেদের স্কুল থেকে প্রথম দশজন। তো মেয়েরা সাধারণত ও রকম প্রথম দশজনের কেউ হতো না। তো উনি তখন কিন্তু আমাকে এসে বলতেন, এমনকি আমার আব্বুকেও বলতেন যে আপনার মেয়ে স্ট্যান্ড করতে পারবে, আমাদের স্কুলে রাখেন। তো এই যে টিচারদের শুধু ক্লাসরুমে পড়ানো তা নয়, তাঁদের ইনস্পাইরেশনাল রোল যে তুমি পারবে, তোমার মধ্যে একটা প্রতিভা আছে—একজন শিক্ষক যদি এ ধরনের ফিডব্যাক দেন, মা–বাবা হয়তো দিচ্ছেন কিন্তু মা–বাবার বাইরে আরেকজন যখন দিচ্ছেন, এটা অল্প বয়সে মানুষের মনে একটা বিরাট সাহস জোগায় আর স্বপ্ন দেখায়। তো আমার জন্য আমি বলব যে চিন্তাহরণ বাবুর একটা বিশ্বাস ছিল। তারপর আমি ক্লাস নাইন থেকে যখন টেনে উঠেছি, তখন আমরা নারায়ণগঞ্জে বদলি হয়ে গেলাম। তখন চিন্তাহরণ বাবু এসে আব্বুকে বললেন, আপনার মেয়ে এখানে পড়ল, এখন যদি নারায়ণগঞ্জে মর্গ্যান স্কুলে ভর্তি করেন, ও হয়তো ভালো রেজাল্ট করবে, কিন্তু যদি মুন্সিগঞ্জ থেকে ভালো রেজাল্ট করে, তাহলে ওই স্কুল তো সরকারের অনুদান পাবে। তখন আমি যেহেতু চিন্তাহরণ বাবুকে আমিও এত পছন্দ করতাম, আমি আব্বুকে বলে আমি আবার ক্লাস টেন বাসায় পড়লাম। আমার মনে হয় আমি টেনে হয়তো প্রায় ছয় মাস স্কুলে গেছি। তারপর আমি নারায়ণগঞ্জে সেন্টার হওয়া সত্ত্বেও মুন্সিগঞ্জের ওই স্কুল থেকে দিলাম পরীক্ষা এবং সত্যি চিন্তাহরণ বাবু যা বলেছিলেন, আমি ওই প্রথম দশজনের মধ্যে সেভেনথ হলাম; মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট হলাম। ওই স্কুলটা সে জন্য অনুদান পায়। কিন্তু আমি বলব যে এই যে শিক্ষকের বিভিন্ন রোল থাকে, আমি আমার জীবনে এ রকম কয়েকজন শিক্ষকের…

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান
প্রশ্ন

চিন্তাহরণ বাবুর মাধ্যমে…

রওনক জাহান: হ্যাঁ। এমন শুধু চিন্তাহরণ বাবু নন, আমি বাগেরহাটে দেখেছি, কুমিল্লায়ও দেখেছি। সেই যুগে প্রতিটি স্কুলে এ রকম এক–দুজন শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওই ঘরে, প্রতিটি জিনিস দেখে দিচ্ছেন এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিজের বাড়ি থেকে ফলটল নিয়ে আসছেন। অর্থাৎ ওই স্কুলটাই তাঁদের প্রাণ, স্কুলটাতেই তাঁরা ডেডিকেটেড। যখন ছোটবেলায় দেখা যায় যে কিছু মানুষ আছেন পৃথিবীতে, যাঁরা আসলে নিজের কথা ভাবছেন না, নিজের পরিবারের কথা ভাবছেন না, কমপ্লিটলি ডেডিকেটেড টু দেয়ার ওয়ার্ক, টু দেয়ার ইনস্টিটিউশন—এটা অল্প বয়সে মানুষকে নিজের চরিত্র গঠনে অনেক সাহায্য করে।

প্রশ্ন

নিশ্চয়ই। তারপর কলেজ কোথায় হলো?

 রওনক জাহান: তখন আমি ইডেন কলেজে ভর্তি হলাম। আমরা তত দিনে ঢাকায়। আব্বু একটা ছোট দুই রুমের ঘর করেছিলেন। ইডেন কলেজের ক্লাস তখন হতো বকশীবাজারে। ইডেনে তখন ইন্টারমিডিয়েটও ছিল। তারপর বিএ ক্লাস হতো।

প্রশ্ন

কলেজে আপনার রেজাল্ট কেমন হলো?

 রওনক জাহান: কলেজেও তো ভালো রেজাল্ট হলো। আমি আইএতে থার্ড হলাম। ’৫৭ থেকে ’৫৯ আমি ইডেন কলেজে ছিলাম। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। সেখানে ’৫৯ থেকে ’৬৩ পর্যন্ত পড়ি।

প্রশ্ন

আপনার একটা লেখায় পড়লাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন মেয়ে অল্প ছিল। আপনাদের সঙ্গে কোনো ছেলে যদি কথা বলতে চাইত, তাহলে মেয়েদের যে কমন রুম, সেখানে গিয়ে স্লিপ দিয়ে অতি অল্প সময়ের জন্য কথা বলতে পারত।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ। আমি জানি না আজকালকার মানুষের কতটা ধারণা আছে। তখন অনার্সে পলিটিক্যাল সায়েন্সে ৩৫ জনের মধ্যে আমরা মেয়ে মাত্র ২ জন ছিলাম। ইকোনমিকসে ও রকম ৩৫ জনের মতো ছাত্র, কিন্তু ১ জন মেয়ে পড়ত। অতএব প্রতিটা সাবজেক্টে এ রকম পাঁচজনের বেশি মেয়ে প্রায় ছিলই না। তখন যে নিয়ম ছিল, তাতে আমার কয়েকটা জিনিস খুবই খারাপ লাগত। যেমন আমরা গিয়েই একদম মেয়েদের কমনরুমে বসে থাকতাম। খারাপ লাগত যেটা, ঘণ্টা পড়লে আমরা মেয়েরা গিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, টিচার এলে তখন টিচারের সামনে আমরা গিয়ে ফ্রন্ট রোতে বসতাম। আমরা দুজন মেয়ে ফ্রন্ট রোতে, এর পাশে জায়গা থাকলেও ছেলেরা ওখানে বসত না। পেছনে বসত ওরা। আমরা সো কল্ড কো–এডুকেশনে সহ শিক্ষায় আছি। এই যে আমরা গিয়ে আমাদের যে ক্লাসটা, তাতে সাহস করে আগেই গিয়ে ঢুকতে পারছি না। তারপর ঘণ্টা বেজে গেলে টিচার দাঁড়িয়ে থাকতেন, আমরা আবার বেরিয়ে যেতাম। তারপর আমরা গিয়ে আবার কমনরুমে বসে থাকতাম। তারপর যা বলেছি যে যদি ছেলেরা কথা বলতে চাইত, তখন পিয়ন ছিল আদম আলী, তাকে একটা স্লিপ দিত। মধুর ক্যানটিনে গিয়ে ছেলেরা বসে খাচ্ছে, কিন্তু আমরা গিয়ে ওখানে বসে চা–নাশতা খেতে পারতাম না।

প্রশ্ন

এমনকি আপনি নাকি ক্লাসে প্রশ্নও করতেন না?

 রওনক জাহান: না। জেনারেলি যেমন আমি ভালো ছাত্রী ছিলাম, স্যাররা যদি কোনো প্রশ্ন করতেন, তখন সব উত্তর তো প্রায় আমার জানাই ছিল। কিন্তু আমি অনেক সময় হয়তো একটা–দুইটা দিতাম উত্তর, তারপর চুপ করে থাকতাম। কারণ, দেখতাম, আমি যদি সব কটার উত্তর দিই, তাহলে পেছন থেকে ছেলেরা ভীষণ নাখোশ, তারা টিপ্পনী কাটত—এসব। সে জন্য ক্লাসে খুব একটা কথা বলতাম না। শিক্ষকেরাও জানতেন, সবাই জানতেন যে আমি ফার্স্ট ক্লাস পাব। কিন্তু ওই যে মেয়েরা একদম সাবলীলভাবে উঠে দাঁড়িয়ে সবার সামনে কথা বলবে, ওটার কোনো রেওয়াজ তখন ছিল না। তখনকার দিনে ছাত্রীদের মধ্যে খুব কম মেয়েই ছিল যারা এবং বেশির ভাগই যারা হয়তো হয় রাজনীতি করেছে, স্বল্পসংখ্যক মেয়ে কিংবা যারা নাটক–থিয়েটার এসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারাই হয়তো ছেলেদের সঙ্গে একটু–আধটু কথা বলত।

প্রশ্ন

আপনি কি তখন শাড়ি পরে ক্লাসে যেতেন?

 রওনক জাহান: হ্যাঁ। আমরা তো...না, আমি যখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে কিংবা সেকেন্ড ইয়ারে, তখন আমি সালোয়ার–কামিজ পরতাম। তারপর বোধ হয় থার্ড ইয়ারে এবং লাস্ট দুটো ক্লাসে আমরা শাড়ি পরেই যেতাম। আমি ’৬৫ সালে যখন প্রথম হার্ভার্ডে গেলাম, তখন জানুয়ারির শীত। তো যাওয়ার আগে আমি জানি যে শীতের মধ্যে ওখানে যাব, বুট–টুট এগুলা পরতে হবে। আমি অনেক ভাবলাম, দেখলাম সালোয়ার–কামিজ নিয়ে যাওয়াটাই ভালো। তারপর এখান থেকে কিছু শাড়ি, কিছু সালোয়ার–কামিজ নিলাম। তারপর ওখানে যখন গেছি, আমার আগের সেমিস্টারে পাকিস্তান থেকে আরেকটি মেয়ে এসেছিল ফিজিকস পড়তে; ও আমাকে বলল, না না, তুমি তো সালোয়ার–কামিজ পরে বাইরে যেতে পারবে না, তোমাকে শাড়ি পরতে হবে। আমি বললাম, কেন? ওই বেচারি জানাল, ও যখন সালোয়ার–কামিজ পরে গেছে ক্লাসের দিকে হার্ভার্ড স্কয়ারে, ওকে কে নাকি বলেছে, আরে, তুমি ঘুমের পোশাক নাইট স্যুট পরে এখানে চলে এসেছ কেন? পায়জামা বলতে ওরা ভাবত যে এটা ঘুমের পোশাক। তখন ও খুব লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসে। তার পর থেকে সে শাড়ি পরে যেত। আমেরিকাতে তখনকার সময়ে মেয়েদের পোশাক বলতে স্কার্ট বুঝত ফরমাল ড্রেস কিংবা মেয়েদের বা সাউথ এশিয়ান মেয়েরা শাড়ি পরে এটা জানত। সালোয়ার–কামিজ কখনো দেখেনি। আমরাও যে চার বছর আমি হার্ভার্ডে ছিলাম, শীতের মধ্যে শাড়ি পরে তার নিচে বুট পরতাম। আমার সঙ্গে আমেরিকান মেয়ে যারা ছিল, তারা প্যান্ট প্যান্ট পরতে আরম্ভ করল সত্তরের দশকে। ’৬৫–তে আমি যখন ছিলাম, তখন মেয়েদের শীতের মধ্যে স্কার্ট পরতে হতো। আমরা যখন ডাইনিং রুমে যেতাম, তখন ওই স্কার্ট পরে ওদের নামতে হতো, আমরা অবশ্য সব সময় শাড়ি পরেই ছিলাম। এখন সময়ের পরিবর্তনে সব রকমের পোশাক পরেই সবাই সবখানে যেতে পারে এবং সেটা নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের সময়ে যে রীতিনীতি, যেটা মেয়েদের জীবনকে অনেক কনস্ট্রেইন করে আর অসুবিধাও তো করে। সেই শীতের মধ্যে শাড়ি পরা যেমন আমি বাংলাদেশে দেখেছি, তেমন আমেরিকায় গিয়েও দেখেছি যে মেয়েদের জীবনের চারদিকে অনেকভাবে গণ্ডি টেনে দিচ্ছে আরকি।

প্রশ্ন

তারপর আপনার ওখানে পিএইচডি হলো।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ, হার্ভার্ডে আমার পিএইচডি হলো।

প্রশ্ন

আপনার সঙ্গে আরও যেসব মেয়ে গেছে, অনেকেই তো শেষ করেনি। এমনিতেই মেয়ের সংখ্যা ওখানেও কম ছিল, যাদের মধ্যে আপনার লেখায় পড়লাম যে অন্যরা অনেকেই পিএইচডি শেষ করতে পারেনি।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ। তখন হার্ভার্ডেও গ্র্যাজুয়েট স্কুলে প্রতিবছর পিএইচডিতে ৩৫ থেকে ৪০ জন ছাত্রছাত্রী নিত। এর মধ্যে হয়তো তিনটা–চারটা মেয়ে। হার্ভার্ডে তখন আমাদের গভর্মেন্ট ডিপার্টমেন্টে মাত্র একজন মেয়ে যিনি শিক্ষক ছিলেন, বাকি সব পুরুষ। এ ছাড়া হার্ভার্ডে আমি যে চার বছর পড়েছি, ওইখানে আমিই একমাত্র সো কল্ড থার্ড ওয়ার্ল্ড এশিয়ার স্টুডেন্ট। সো কল্ড থার্ড ওয়ার্ল্ডের আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকা থেকে কোনো ছেলেও নেই মেয়েও নেই। অতএব ওটা একদম মানে সাদাদের সাদা চামড়ার শ্বেতাঙ্গদের…। আর তখন মেয়েরা যে বেশির ভাগই যেহেতু ওটা খুব হাইলি কম্পিটিটিভ জায়গা, যেমন আমি এখান থেকে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে গেছি, আমি হচ্ছি একদম বেস্ট এখানকার, কিন্তু ওইখানে তো সারা পৃথিবীর বেস্টরা এসে গেছে, অতএব ওইখানে তো আমি তখন অ্যাভারেজ। অতএব ওইখানে ভালো করতে হলে তো আমাকে আরও বেশি ভালো করতে হবে। ওই কম্পিটিশনের জন্য এবং বিশেষ করে পৃথিবীতে সবখানেই আমাদের সময়ে, শুধু আমাদের দেশে নয়, বিদেশেও দেখেছি যে মেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো হলেও ওই যে সবার সামনে দাঁড়িয়ে সাহস করে কথা বলবে, একজন প্রতিবাদ করবে, টু ফাইন্ড ওয়ানস ওন ভয়েস—এই জিনিসগুলো আমাদের দেশেও যেমন মেয়েদের সাপ্রেস করে রাখা হতো, ওখানেও তখন এটা ছিল। অতএব কম্পিটিশন করতে হলে তখন অনেক কনফিডেন্স দরকার হয়। অতএব অনেক মেয়ে লেখাপড়ায় ভালো হলেও যখন খুব অ্যাগ্রেসিভ একটা এনভায়রনমেন্টে ছেলেরা কম্পিট করছে, তখন অনেক সময় মেয়েরা সাহস হারিয়ে ফেলে এবং মনের সাহস না থাকলে তখন ঝরে পড়ে। হ্যাঁ, সেটা তখন আমি অনেককে দেখেছি। কিন্তু আমি আরও অনেক জায়গায় লিখেছি যে আমি যখন এখান থেকে গেছি, এটা আমার জন্য কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না। আসলে হার্ভার্ডে আমার যে চার বছর; সেখানকার যে শিক্ষা ও ওখানে লেখাপড়া করে ভালো করা, আমার নিজের আইডেনটিটি ও নিজের যে একটা সেলফ কনফিডেন্স—এসব গড়ার পেছনে দোজ ওয়ার ভেরি ট্রান্সফরমেটিভ ইয়ারস।

প্রশ্ন

আপনার জন্য ল্যাঙ্গুয়েজ কোনো প্রবলেম হয়নি?

 রওনক জাহান: ল্যাঙ্গুয়েজ নিশ্চিত প্রবলেম ছিল। ইন দ্য সেন্স, বাংলাদেশ থেকে আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে আসিনি, বাংলা মিডিয়ামে পড়েছি; ইংরেজি ভালো লিখতে পারছি, কিন্তু বলার তো কোনো অভ্যাস ছিল না। ওখানে গিয়েই তো প্রথমে সবার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে হচ্ছে। এখন বেশির ভাগই ওখানে যারা আছে—যারা হচ্ছে হোয়াইটস—আমেরিকান ও কিছু ইউরোপিয়ান, তাদের জগতের সঙ্গে তো এখনকার মতো নয় যে একমুহূর্তে হোয়াটসঅ্যাপের মারফত গ্লোবালাইজেশনে সবাই জানে যে ওখানে কী হচ্ছে—ওরা কী ধরনের সিনেমা দেখে, খাবার খায়—এগুলোর কোনোটার সঙ্গেই তো আমি পরিচিত নই। আমি যাওয়ার আগে তো কোনো দিন এখান থেকে হটডগও খেয়ে যাইনি, হ্যামবার্গারও নয়। প্রথমে গিয়ে প্রায় ছয় মাসে আমি অনেক ওয়েট লুজ করেছি। কারণ, ওদের রান্না সব কাঁচা মনে হতো। খেতেই পারতাম না।

প্রশ্ন

তারপর ধীরে ধীরে এগুলো সবই শিখলেন, প্র্যাকটিস করলেন।

রওনক জাহান: না, যেটার কথা আমি বললাম, ওই যে মনের সাহস। কারণ, আমার তো একদম দৃঢ়প্রতিজ্ঞা, পিএইচডি শেষ করতেই হবে। অতএব আমি করব। এই গোল (লক্ষ্য) যদি রাখা হয়—আমাকে এটা করতেই হবে, আমি করবই। তখন নিজেকে আমি বলেছি, মানুষ একটা চ্যালেঞ্জের সামনে পড়লে দুই রকম হয়—অনেকে চ্যালেঞ্জ নিতে পারে না, আবার অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ থাকলে আরও বেশি, মানে নিজেকে আরও ওপরে তুলতে পারে। আর আমি আরেক জায়গায় বলেছি যে হার্ভার্ডে গিয়ে কয়েকটা কথা ওখানে প্রচলিত ছিল, যেটা আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল এবং সব সময় আমি মনে রাখতাম। প্রথম কথা শুনলাম যেটা, তোমার যে অ্যাম্বিশন, তোমার যে সেটা স্কাই ইজ দ্য লিমিট। এটা আমার খুব ভালো লাগল। কারণ, তার আগে এখানে সব সময় ছোটবেলা থেকে মেয়েরা এটা করতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না—এই কথাই শুনতে হয়েছে। ওখানে গিয়ে শুনলাম, হ্যাঁ, তুমি যা চাও, তুমি তোমার ক্ষমতায় যা চাও—স্কাই ইজ দ্য লিমিট—এটা আমার খুব ভালো লাগল। দ্বিতীয় কথাটা হলো—যখন এসব চ্যালেঞ্জ ফেস করছি তখন—সিঙ্ক অর সুইম। তোমাকে হয় সাঁতার কাটতে হবে আর সাঁতার না কাটতে পারলে ডুবে যাবে। তো এখন চয়েজ তোমার—তুমি কি ডুবতে চাও? আমি আগেই ঠিক করেছি যে আমি ডুবব না। আমাকে এখন সাঁতার কাটতেই হবে। আমি ইংরেজি যদি না বলে অভ্যস্ত থাকি, তাহলে বলতে হবে। আমাদের সময়ে যেটা ছিল, আমরা যখন পড়াশোনা করেছি, বাংলা মিডিয়ামে পড়ে এলেও ইংরেজি হয়তো বলতে পারতাম না, কিন্তু আমাদের লেখা এবং ইংরেজি বই পড়েছি।

রওনক জাহান। জন্ম অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়ায়
প্রশ্ন

লেখাপড়ার মান ভালো ছিল। আপনাদের সময় সবারই ইংরেজি খুব ভালো ছিল।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ, ইংরেজিতে আমরা ভালো লিখতে পারতাম। আমাদের রিটেন যেসব অ্যানসার করছি এবং দেখেছি, আমার সঙ্গে হার্ভার্ডে যারা ছিল, তারা তো খুব অবাক হতো। ওয়েস্টার্ন পলিটিক্যাল ফিলোসফার ওদের থেকে আমি ঢাকা থেকে ভালো পড়ে গেছি। যে ফিলোসফির বইগুলো ওরা পড়েছে, তার থেকে আমি আরও অনেক বই পড়েছি। তারপর ওরা ভাবত, আমি হয়তো ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি জানব। কিন্তু আমরা তো এখানে বসে ওয়েস্টার্ন সিভিলাইজেশন, ওয়েস্টার্ন হিস্ট্রি—আমেরিকার ছেলেমেয়েরা আমেরিকান হিস্ট্রি জানত, ইউরোপিয়ান হিস্ট্রি সম্বন্ধে ওদের অত ধারণা ছিল না—ওদের থেকে অনেক ভালো জানতাম। আমাদের রিটেন, যা আমাদের নলেজ, এটাও ওদের সমতুল্য—অনেক ব্যাপারে ওদের থেকে আমি এগিয়ে ছিলাম। শুধু যেটা ছিল অসুবিধা সেটা হচ্ছে, সাহস করে সেমিনারে লোকের সামনে কথা বলা কিংবা লোককে একটা প্রশ্ন করা। প্রথমে খুবই লাজুক ছিলাম। আমার তো কথা বলে অভ্যাস নেই। আমাকে কেউ সরাসরি প্রশ্ন করলে হয়তো একটু বলে চুপ করে থাকতাম। যেহেতু ওখানকার পড়াশোনার ধরনটা একটু অন্য রকম ছিল, টিম ওয়ার্ক করতে হতো—সেমিনারে আমরা তিনজন টিম হিসেবে কাজ করছি—তখন আমিও ধীরে ধীরে ওদের সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করে দিলাম। তারপর যখন পিএইচডির জন্য আমাদের একটা কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা দিতে হতো—যেখানে আমরা যারা প্রথম ব্যাচে যাব পরীক্ষা দিতে, আমরা ২০ জনের মতো প্রায় ছয় মাস একসঙ্গে ওই যে প্রেপ করতাম—তখন আমরা একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করতাম, তারপর প্রিপারেশন নিতাম। আমি তখন এসবের মধ্যে ঢুকলাম। এই করে করে আমার যে কথা বলার একদম অভ্যাস ছিল না—কারণ, কোনো হোস্টেলেও এ দেশে ছিলাম না; শুধু ঘরে, আমার ফ্যামিলির মধ্যেই ছিলাম। ক্লাসে, লাইব্রেরিতে যেতাম আর রেজাল্ট ভালো করতাম। এ ছাড়া আমার তো খুব বেশি এক্সট্রা কারিকুলামে অভ্যস্ত ছিলাম না—ওখানে গিয়ে যখন অপরচুনিটি হলো এবং জানতাম, আমাকে এগুলো করতে হবে। দেখলাম, আমিও ধীরে ধীরে সাহস পাচ্ছি, তখন আমিও কথা বলেছি। আমার জন্য হার্ভার্ডে যাওয়াটা, তারপর এত রকম প্রফেসরের কাছ থেকে ক্লাস নেওয়া, বিভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা; ছোটবেলায় বিদেশ সম্বন্ধে আমাদের অনেক ট্রাভেল বই ছিল, পড়েছি। ওখানে গিয়ে যেসব মিউজিয়ামে যাচ্ছি, সেসব মিউজিয়াম, আর্টিস্টের কথা—এগুলো আমি বইতে পড়েছি। তারপর হঠাৎ করে গিয়েই তো ইম্প্রেশনিস্ট এরা এক্সপ্রেশনিস্ট—এসব চোখের দেখা, এগুলোতেও ইন্টারেস্ট ছিল, থিয়েটার অপেরা এগুলোতে। নিজে গিয়ে তখন দেখতে পাচ্ছি। যখন আমি বলছি যে আমার পারসোনাল যে গ্রোথ, ডেভেলপমেন্ট এই চার বছরে, যে মানে অসম্ভব মানে একটা সুযোগও ছিল এবং আমি সেই সুযোগ নিতেও পেরেছি আরকি।

প্রশ্ন

আপনার লেখায় পড়লাম যে হান্টিংটন আপনার শিক্ষক ছিলেন এবং আপনাকে পছন্দ করতেন। তাঁর সম্পর্কে একটু বলবেন?

 রওনক জাহান: অবশ্যই। আমি ওনার বেশ প্রিয় ছাত্রী ছিলাম। আমি যখন হার্ভার্ডে গেলাম, হান্টিংটন তখন একটা নতুন বিষয় পড়াতেন। আমাদের একটা ফিল্ড ছিল, কম্পারেটিভ পলিটিকস আর ওখানে তখন তিনি পড়াতেন পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট। দেশে আমাদের সময়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সে শুধু কনস্টিটিউশনাল হিস্ট্রি পড়ানো হতো সেই দেশের কনস্টিটিউশন—এসব আমার কাছে একেবারে ড্রাই এবং আমার একেবারে পছন্দ ছিল না; কিন্তু কারেন্ট পলিটিকস নিয়ে বিশেষ কিছু পড়ানো হতো না। এখানে আমার সহপাঠী ইকোনমিকসের, এরা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট নিয়ে পড়ছিল। এখানে যখন দেখতে গেলাম, তখন দেখলাম যে পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট বলে একটা সাবজেক্ট আছে এবং একটা দেশের রাজনীতি কী, মানে ডেভেলপড হচ্ছে নাকি হচ্ছে না; গণতন্ত্র এগোচ্ছে নাকি এগাচ্ছে না; এটা কী করে আমরা মেজার করব, ইন্ডিকেটরগুলো কী—এসব নতুন জিনিস হঠাৎ যখন তিনি পড়াচ্ছেন, তখন আমার এই সাবজেক্টের প্রতি খুবই অ্যাট্রাকশন হলো। আমি ওনার ক্লাস তখন আরম্ভ করলাম এবং ওনার একটা থিওরি, যেটা আমিও পরে আমার থিসিসে ব্যবহার করেছি—পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্টের ওয়ান অব দ্য ইন্ডিকেটর হচ্ছে ইনস্টিটিউশনালাইজেশন—পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউশনগুলো গ্রো করছে কি না এবং সেটারও আবার কিছু ইন্ডিকেটর আছে, যেটা দিয়ে আমরা বিচার করতে পারব যে এটা গ্রো করছে কি না। যেমন একটা ইন্ডিকেটর হচ্ছে, একটা ইনস্টিটিউশন ইনস্টিটিউশন কি না, সেটা দেখতে হলে অনেক বছর তাকে বেঁচে থাকতে হবে; কিন্তু সেই অনেক বছরের মধ্যে সময়ের পরিবর্তন হবে, নতুন ডিমান্ড হবে, সেই ডিমান্ডের সঙ্গে সে এডাপ্ট করে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারছে কি না, সে কি ওই যখন আরম্ভ হয়েছিল সেই যুগের মধ্যে ফসিলড হয়ে আছে নাকি নতুন...ইনস্টিটিউশনটা ভেঙে পড়ছে না, কিন্তু ইনস্টিটিউশনের কাজকর্ম সবকিছুই ডিমান্ডের সঙ্গে সঙ্গে চেঞ্জ হচ্ছে। তারপর যেমন আরেকটা ছিল যে একটা হচ্ছে রেসপন্সিভনেস এ সমস্ত ডিমান্ডে আরেকটা হচ্ছে পার্টিসিপেশন। যা–ই হোক, এ রকম অনেক নতুন নতুন কনসেপ্ট তিনি যখন দিচ্ছিলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে ক্লাস, এমনকি লেকচার, তারপর সেমিনার ক্লাসও করেছি। তিনিও আমাকে খুবই পছন্দ করতেন। তাঁর যে সব ধরনের আইডিয়াজ আমি মেনে নিয়েছি, তা নয়। যেমন ওনার...এখন তো ওই যে ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন নিয়ে তো অনেক আলোচনা আছে। পরে কিংবা তখনো যেমন আমার থিসিস, যেটা আমি লিখেছিলাম, সেখানে পুরো আইয়ুব রেজিমের আমি অনেক ক্রিটিক্যাল ছিলাম এবং যেহেতু আমি আমাদের দেশে তখন দেখছিলাম যে আইয়ুব রেজিম আমরা কেউ পছন্দ করছিলাম না এবং ওটা...কিন্তু আমেরিকাতে যখন আমি হার্ভার্ডে গেলাম, তখন ওখানকার প্রফেসররা আইয়ুব খানকে এবং হান্টিংটনও আইয়ুবকে একদম বিরাট, মানে মাথায় তুলে প্রশংসা করছেন। কিন্তু এসব ব্যাপারে আমি ডিজঅ্যাগ্রি করেছি ওনার সঙ্গে। হার্ভার্ডে তো ওই সুযোগ ছিল, প্রফেসরের সব কথা যে আমাকে শুনতে হবে, তা না—কিছু বিষয়ে আমি তখন দ্বিমত প্রকাশ করতেও পারি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে সব সময় অনেক সাহায্য করেছেন। যেমন ১৯৬৮ সালে আমি যখন এখানে থিসিসের জন্য ডেটা কালেকশনে আসব, আমার একটা ছোটখাটো গ্র্যান্টের দরকার ছিল। তখন আমি হান্টিংটনকে গিয়ে বললাম,  তিনি সঙ্গে সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে বলেন, ‘তুমি একটা প্রপোজাল লিখে দাও।’ তারপর তিনি—অনেকগুলো ফাউন্ডেশনের বোর্ডে ছিলেন তিনি—সঙ্গে সঙ্গে আমার জন্য টাকা জোগাড় করে দিলেন। তারপর যখন ১৯৭১ সালে আমি বাংলাদেশেই ছিলাম এবং শেষের দিকে তখন আমার হার্ভার্ডের প্রফেসররা খুব চিন্তিত ছিলেন, আমার কী অবস্থা হবে—তাঁরা আমাকে একটা টিচিং অফার দেন। আবার হার্ভার্ডে চলে গেলাম এখানকার ঢাকা ইউনিভার্সিটি কাজ ছেড়ে দিয়ে। হান্টিংটন তখন সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের চেয়ার ছিলেন। তিনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে একটা রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট অফার করেন। আমি ওখানে ছিলাম ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত। হার্ভার্ডের ওই সেন্টারে বাংলাদেশের ওপর একটা সেমিনারে, মানে একটা টিচিং কোর্সের মতো থ্রু সেমিনার আমি দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, হয়তো আমেরিকাতে এবং মানে ওইটাই প্রথম ফরমাল একটা ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের জন্ম—মানে ১৬ ডিসেম্বর হলো আর আমি আমার কোর্সটা তখন ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ থেকে দিচ্ছি, কেমন।  দিজ ওয়াজ প্রবাবলি দ্য ফার্স্ট কোর্স অন বাংলাদেশ ইন অ্যানি ইউনিভার্সিটি হুইচ ওয়াজ রিকোগনাইজড অ্যাজ আ কোর্স। হান্টিংটন সেটা ফ্যাসিলিটেট করেছেন এবং সারা জীবনই আমার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। যখনই যেতাম, তখনই তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুমি যখনই আসতে চাও, হার্ভার্ডে আসো, আমাদের সেন্টারে থাকো।’ এর আগেও চিন্তাহরণ বাবু সম্বন্ধে আমি যেটা বললাম যে শিক্ষকেরা যে ছাত্রদের লেখাপড়া শেখানোর বাইরেও সারা জীবনই একটা মেন্টরশিপের রোল প্লে করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ভালো, তাদেরকে যেকোনো উপায়ে সাহায্য করতে হলে ক্যারিয়ারে তাঁরা সাহায্য করেন এবং আমি বলব যে সেদিক থেকে হান্টিংটনের সঙ্গে আমার সেই ধরনের একটা সম্পর্ক প্রিয় ছাত্রী হিসেবে ছিল, যদিও তাঁর কিছু কিছু আইডিয়াজ আমি নিয়েছি এবং কিছু কিছু আইডিয়াজ আমার পছন্দ হয়নি। সেই যুগে যেমন তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন আর আমরা তো সবাই তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলাম। যদি একটা ডেমোক্রেটিক এনভায়রনমেন্ট থাকে, তাহলে অনেক ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করা যায়, আবার অনেক ব্যাপারে আবার একমত থাকা যায়—এমন।

প্রশ্ন

আপনি তারপর হার্ভার্ড থেকে আবার বাংলাদেশে এলেন ৭৩ সালে?

রওনক জাহান:  না। আমি এলাম ৭২–এ। আমি তো বোধ হয় ৭১ এর সেপ্টেম্বরে গিয়েছিলাম, ৭২ এর মে মাসের দিকে এসেই আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারণ, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছিলাম সত্তর এর শেষের দিকে। মানে নভেম্বর নাগাদ। আর তারপর যারাই আমরা বাইরে চলে গিয়েছিলাম, তাদের সবাইকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলেছিল যে চাইলে ফেরত আসা যাবে। তখন আমরা চলে এসেছিলাম। এরপর দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করি।

প্রশ্ন

তারপর ওমেন ফর ওমেন করলেন কবে?

 রওনক জাহান: ওমেন ফর ওমেন আমি করেছি ১৯৭৩ সালে। আর সেখানেও আমি বলব যে আমেরিকার প্রভাব কিছুটা আছে। কিছুটা তো আমি তো পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবেই ট্রেনিং লিখছিও। কিন্তু আমি যখন ’৭১ সালে নভেম্বরের দিকে হার্ভার্ডে গেলাম, তখন আমাদের দেশে যে মেয়েরা এত নির্যাতিত হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তারপর তাদের আর বাসায় নেওয়া হচ্ছে না, পরিবার নিচ্ছে না, এটা তখন পুরো আমেরিকার পত্রপত্রিকায় অনেক পাবলিসাইজড ছিল। তখন বাংলাদেশের মেয়েদের অবস্থা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলায় খুব আগ্রহ ছিল। এখন যেমন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জেন্ডার স্টাডিজ, উইমেন স্টাডিজ আছে, তখন আমেরিকায়ও ওই ধরনের কিছুই ছিল না। সে সময় নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে প্রথমবারের মতো এটা পড়ানো হচ্ছিল। তখন ওরা আমার খবর পায়। আমি হার্ভার্ডে ছিলাম। আমাকে বলল, ‘এসে বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে কিছু বলো।’ প্রথমে তো আমি বললাম, আচ্ছা আমি একটা ক্লাস নেব। কিন্তু আমার তো গবেষণা কিছু নেই, আমি এমনি জানি। কিন্তু ওরা বলল, ‘তুমি যতটা জানো।’ পুরো ব্যাপারটা যদিও আমার গবেষণার বিষয় নয়, কিন্তু একাত্তরে আমি এখানে ছিলাম। কী কী ঘটনা ঘটছিল, সেগুলা তো জানতাম। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে খুব গভীরে নাড়া দিয়েছিল যে এসব কী হচ্ছে! মানে দুই দিকের অবিচার কেমন একসঙ্গে হচ্ছে! বিশেষ করে এই যে মেয়েরা ঘরে ফিরতে পারছে না এবং পুরা ব্যাপারটাকে স্টিগম্যাটাইজ করা হচ্ছিল। তো শেষে আমি ক্লাসটা নিলাম একটু পড়াশোনা করে। তখন ওখানে কিছু নারীবাদী গবেষক দেখলাম যাঁরা ওদের মধ্যে একটা কালেকটিভের মতন। যেহেতু বাইরে থেকে ওনারা কোনো সাপোর্ট পাচ্ছেন না, যাঁরাই কাজ করছেন, তাঁরা প্রতি সপ্তাহে একদিন একত্র হচ্ছেন, তারপর কে কী গবেষণা করছেন, সেটা নিয়ে একজন আরেকজনকে সাহায্য করছেন। মেয়েদের একটা দলের মতো। তখন আমার দেশে আমি ভাবলাম যে এখানে যদি আমরা এ ধরনের কিছু গবেষণা করতে চাই মেয়েদের ব্যাপারে, কারও কোনো তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি… যদি এ ধরনের কিছু মেয়েকে সংগ্রহ করা যায়, যারা হয়তো এখন পর্যন্ত গবেষণা করছে না কিংবা চিন্তা করছে না, যারা লিখবে। তো সেই ভাবনা থেকে … প্রথম ’৭৩ সালে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে আমাকে মেয়েদের ওপরে লিখতে বলেছিল, আমি অনেক ইন্টারভিউ করে লিখেছিলাম। আমি বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কিছু শিক্ষককে বললাম, যার যে বিষয়, সেই বিষয়ে যারা পড়াশোনা করছে, তাদের বলে দেখো সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মেয়েদের সমস্যাগুলো লিখতে। একজন ছিলেন, উনি বোধ হয় নার্সদের নিয়ে লিখলেন। এভাবে প্রায় দুবছর আমার বাসায়ই আমরা ও রকম প্রতি সপ্তাহে দেখা করতাম। তারপর একটা বই করব বলে ঠিক করলাম।

প্রশ্ন

 তাহলে প্রধানত এটা ১৯৭১ সালের নির্যাতিত নারীদের ওপরে?

 রওনক জাহান: না, ওটার ওপরে নয়। কিন্তু মনে মনে নারীবাদী হলেও ওই নির্যাতিত নারীদের নিয়ে আমি হয়তো জীবনে কোনো দিন গবেষণার ব্যাপারে যেতাম না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবেই থাকতাম। কিন্তু যখন দেখছি যে আর কেউ এটা নিয়ে গবেষণা করছে না, লেখালিখি করছে না কিংবা অ্যাডভোকেসিও করছে না, কারণ কিছু তথ্য তো দিতে হবে, তখন আবার একই সঙ্গে স্বাধীন হওয়ার পর দেশের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে… তখন এই যে উন্নয়নের যে আলোচনা, সেখানে তো মেয়েরা–নারীরা যে আসলে কাজ করে, অর্থনৈতিকভাবে কাজ করে, এগুলা তো কেউ তখন স্বীকারই করতে চাচ্ছিল না। আমাদের তো তখন এই সব প্রমাণ করতে হতো। যেমন তার আগে ষাটের দশকে যে ওয়ার্কস প্রোগ্রাম হচ্ছিল, সেটা তো ছেলেরা করত। স্বাধীনতার পরে যখন পরিবারের ছেলেরা নেই, তখন তো মেয়েদেরও কাজ করতে হবে। সে সময় প্রথমবারের মতো নীতি পরিবর্তন করা হলো যে রোড মেইনটেন্যান্সের কাজে মেয়েরাও মাটি কাটবে। এখন তো সব কনস্ট্রাকশন সাইটে আমরা দেখি যে মেয়েরা কাজ করছে। কিন্তু লোকে ভুলে গেছে যে সত্তরের দশকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কী অবস্থা ছিল। আমার মনে আছে, আমি আমার রংপুরের কুড়িগ্রামে মেয়েদের মাটি কাটতে দেখেছি, রাস্তার কাজ করতে দেখেছি। তার আগে কিন্তু এটার অনুমতি ছিল না। বলা হতো, মেয়েরা কেন ঘরের বাইরে যাবে? ঘরে বসে না খেয়ে মরে যাক। আমাদের তখন অ্যাডভোকেসি করতে হয়েছে যে না, এগুলোর পথ খুলে দেওয়া হোক। এখন তো সব পেশায় মেয়েরা আছে। যখন আমরা স্বাধীন হলাম, তার আগপর্যন্ত তো মেয়েরা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিলেও ফরেন সার্ভিসে যেতে পারত না, পুলিশ সার্ভিসে যেতে পারত না। শুধু অডিটস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিস; পাকিস্তান আমলে দ্যাট ওয়াজ দ্য ওনলি সার্ভিস অ্যালাউড। এখন তো মেয়েরা সব সার্ভিসে যেতে পারে। তখনকার দিনে কোনো কিছু নিয়ে অ্যাডভোকেসি করার আগে প্রথমে তথ্য নিতে হয়, তারপর সে তথ্যের ভিত্তিতে আর্গুমেন্টগুলো করতে হয়। তখন মেয়েদের সম্বন্ধে কোনো গবেষণা ছিল না—মেয়েদের অর্থনৈতিক অবদান সম্বন্ধে, মেয়েদের লিগ্যাল স্ট্যাটাস কী, মেয়েদের পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস কী। তখন তো এই মৌলিক বিষয়ে কাজটা আরম্ভ করতে হয়েছে। আমি তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণা আরম্ভ করেছিলাম। ’৭৩ সালে প্রথম যে নির্বাচন হয়েছিল, সেই নির্বাচনের ভোটার্স বিহেভিয়ার; সেটা রমনা ধামরাই থানায়, অনেক সার্ভে করে আমি একটা বই লিখেছিলাম; মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট। যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে সার্ভে করে সেটার ভিত্তিতে মানে এমপিদের সম্বন্ধে প্রথম গবেষণা, প্রথম তথ্য—সেটা আমি করছিলাম। আমি এই রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়েই থাকতে পারতাম, যদি অন্যরা নারীদের নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করত। কিন্তু কেউ তো এটা নিয়ে কাজ করছিল না। সে জন্য সেটার পাশাপাশি আমি এটাও আরম্ভ করলাম। ১৯৭৫ সালে আমাদের একটা উদ্যোগ ছিল যে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ হবে ’৭৫ এবং বাংলাদেশ থেকে আমরা একটা বই বের করব ‘উইমেন ইন বাংলাদেশ’ বলে যেখানে বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের কী অবস্থান, সেটা নিয়ে বিভিন্নজন লিখবে। সেই বই, সেই যে ’৭৩ সাল থেকে আমার বাসায় যারা বিভিন্ন অধ্যায় লিখেছেন, আসতেন—আমরা একজন আরেকজনের সমালোচনা করতাম। সেই সময়, ’৭৫ সালের দিকে পৃথিবীর খুব কম দেশেই নারীদের সম্বন্ধে গবেষণা হয়েছে কিংবা বই লেখা হয়েছে। অতএব আমি বলব যে বাংলাদেশের ওই পাবলিকেশন ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ফার্স্ট, থার্ড ওয়ার্ল্ডের মধ্যে সেটা।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী রওনক জাহান
প্রশ্ন

  আচ্ছা। আমরা বাংলাদেশের বর্তমানটাকে একটু বোঝার চেষ্টা করব। আপনি তো আমাদের এই সব বিষয়ে গবেষণা করেছেন, পর্যবেক্ষণ করছেন, বই লিখেছেন রাজনীতি নিয়ে, ভোটার, এমপি ইত্যাদি নিয়ে। তো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর একটা আশাবাদ তৈরি হলো। ’৭৫ সালে বাকশাল হলো, আবার বাকশালের পর ১৯৭৫–এ ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবার নিহত হওয়ার পরে তো সামরিক শাসন শুরু হলো ’৯০–এর গণআন্দোলনের পরে আবার আশাবাদ তৈরি হলো। ’৯১ সাল থেকে আমরা ভাবলাম যে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। ২০০৬ সালে এসে দেখা গেল যে আবার একই জায়গায়। ২০০৮ নির্বাচন হলো। এরপর তো তিনটা নির্বাচন, জোচ্চুরি নির্বাচন হয়ে গেছে। আবার একটা নির্বাচন হলো এই ২০২৬–এ এসে, যেটার মধ্যে আবার প্রায় ৩০ পারসেন্ট ভোটার যে দলকে সমর্থন করে, তারা অংশগ্রহণ করল না, কিন্তু মোটামুটি একটা ভালো নির্বাচন হলো। সবটা মিলিয়ে গণতন্ত্র কি বাংলাদেশে এগোচ্ছে, নাকি একই জায়গায় লেফট–রাইট করছে? এটা হচ্ছে আমার প্রশ্ন।

 রওনক জাহান: আমি বলব যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা, সেটা কিন্তু আগেও ছিল; আরও বেশি আমি বলব যে এই গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়, সেটা সম্বন্ধে মানুষের ধারণা যে এটা একটা কমপ্লেক্স, মানে আকাঙ্ক্ষা থাকলেই তো হবে না, তার সঙ্গে সেটার যে ইমপ্লিমেন্টেশন এবং সেটার মধ্যে সমস্যা, সেটা সম্বন্ধে আমি বলব যে আমাদের ধারণা আরও অনেক পরিপক্ব হচ্ছে, আরও অনেক মানুষ সেটা বুঝতে পারছে। অতএব, জিনিসটাকে সেই মানদণ্ডে দেখলে। দ্বিতীয়ত, আমি বলব যে কিছু ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি হচ্ছে, যেমন আমি বলি যে ৭২ সালে যখন আমরা স্বাধীন হলাম, যেহেতু তার পেছনে এত বছরের সংগ্রাম শুধু যে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম তাই তো নয়, তার সঙ্গে আমরা জানতাম যে আমরা যে একটা গণতান্ত্রিক দেশ হব, যেহেতু পাকিস্তান সেনাবাহিনী… এবং আমরা এটা ধারণাই করে নিয়েছিলাম যে এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না আমাদের মনে। কিন্তু আমাদের তারপরে যখন এটা আমরা ইমপ্লিমেন্টেশনের দিকে গেলাম, তখন নানান রকম বাধা তখন হলো এবং তারই ফলে প্রথম একটা সলিউশন যেটা হলো, এরপর আর্মি এল। নব্বইয়ে যে মানুষ যখন এটা করল, এটা তারপরেও যখন ভালো মানে ভাবা হচ্ছিল যে এর পরে গণতন্ত্র স্মুথ হলো না। কিন্তু একটা অ্যাচিভমেন্ট যেটা হয়েছে, সেটা এভাবে দেখা যায় যে তখনকার আন্দোলনটা আমরা তখন ধারণাই করেছিলাম যে এটা একটা মিলিটারি রুলের বিরুদ্ধে। গণতন্ত্র বলতে ওই যেটা সামরিক শাসন নয়, রাজনীতিবিদেরাই শাসন করবে, তাহলেই গণতন্ত্র এসে যাবে। এর পর থেকে কিন্তু সামরিক শাসকেরা আর সরাসরি আসতে পারেনি, এক–এগারোর সময়ও পেছনে থাকতে হয়েছে এবং সামরিক শাসক ওরাও জানে যে এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। অতএব এই অ্যাচিভমেন্টটা হয়েছে। এরপর আমাদের যে অভিজ্ঞতা হলো, যেটা আমরা প্রথম ভেবেছিলাম যে রাজনীতিকেরা যদি ক্ষমতায় নিয়ে নেয়, ইলেকশন যদি হয় কিছু তাহলেই, রাজনীতি ও গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ানদের হাতে ক্ষমতা। এরপর তো আমাদের অভিজ্ঞতা আমরা দেখলাম যে সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ানরা ইলেকটেড হয়ে তারাও অগণতান্ত্রিক হয়ে যাবে। অতএব আমার মনে হয় যে এবারে ২০২৪–এর পরে এই শিক্ষাটা হয়েছে এবং এ জন্য এখন আমি বলব যে যত সহজে এর আগে যারা সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ান তারা যতটা অগণতান্ত্রিক হতে পেরেছেন, বহু বছর থাকতে পেরেছেন, এখন যদি প্রটেস্ট যেটা, সেটা খুব তাড়াতাড়ি আরম্ভ হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষের মধ্যে; অতএব সেই জন্য আমি সবসময় একটা গ্লাসকে অনেক সময় হাফ ফুল দেখা যায় হাফ ইয়ে দেখা যায় ওরকম ভাবে দেখছি। আমাদের সমস্যাটা কী, সেটা আমি একটু বলি। সেটা হচ্ছে এই যে আমাদের আকাঙ্ক্ষাটা সব সময় আছে, কেমন। গণতন্ত্রের জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষাটা এখনো আছে এবং এটাকে আমি খুব প্লাস হিসেবে দেখছি নিশ্চয়ই। আর একটা হচ্ছে আমাদের দেশের লোক প্রটেস্ট করে একটা মানে যেটা পছন্দ নয়, সেটাকে যে ফেলে দিতে পারে এবং সেটারও অনেক দেশে পারে না, এটা আমাদের একটা প্লাস পয়েন্ট হিসেবে দেখছি। কিন্তু যেখানে আমাদের সমস্যা, সেটা হচ্ছে আগে বলছি ইনস্টিটিউশনালাইজেশন কেমন। এখন ইনস্টিটিউশনালাইজেশনের জন্য কী লাগে—প্রথম হচ্ছে একজন লিডার নয় এই যে গণতন্ত্রকে আমি প্রতিষ্ঠিত আমি ইনস্টিটিউশনালাইজ করতে চাচ্ছি তাহলে সেটার জন্য একটা প্রসেস একটা টিম অব লিডার্স লাগবে যারা আসলে ট্রুলি কমিটেড যে আমি এটা করব। এটা একদিনের ব্যাপার নয়, একটা প্রসেসের ব্যাপার আছে। এরপর একটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার আছে, যেটাকে আমি প্র্যাকটিস করব। আমাদের ঘাটতি এই সব কটা জায়গায় আছে বারবার যে উই ডোন্ট হ্যাভ আ টিম অব লিডার্স, যারা ট্রুলি এটাকে প্রায়োরিটি দিয়ে কমিটেড জানে যে এটার জন্য সময় লাগবে, তারপরে কি প্রসেসটা সম্বন্ধে যে গণতান্ত্রিক প্রসেসে আমি আগাবো একটু দেরি হচ্ছে; কিন্তু তারপরে এই না করে একজন তখন বলল না; বরং একজনের হাতে ক্ষমতা চলে গেলে একটা ডিসিশন মেকিং হয়ে গেলে কুইকলি হয়ে যাবে; সে রকম পথে যদি চলে যায়। অতএব … আমরা ধরে রাখতে পারছি না। আমি যদি একটু ভারতের উদাহরণ দিই আর আমি আমেরিকারও উদাহরণ দেব ফাউন্ডিং ইয়ার্সে। ভারতও যখন নাকি ’৪৭ সালে তখন একটা টিম অব লিডার্স ছিলেন নেহরু। তাঁর পাশেও অন্যরা ছিল; যারা সবাই আসলে এই ব্রিটিশ স্টাইল পার্লামেন্টারি সিস্টেমে বিশ্বাস করত এবং তাঁরা তখন ওরকম একটা প্রসেস প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য রেডি ছিল এবং সবাই যাচ্ছিল। যেমন আমি একখানে পড়ছিলাম যে তখনকার যে একজন স্পিকার ছিলেন, তিনি অতটা মানে নেহরুর তুলনায় অত পরিচিত নন, তিনি একদিন নেহরুকে বললেন যে আমি এসে আপনার সঙ্গে দেখা করব, তখন নেহরু তাঁকে বললেন, না, আপনি পার্লামেন্টের স্পিকার, আমি প্রাইম মিনিস্টার হলেও এটা উচিত হবে না যে আপনি আমার কাছে আসবেন, আমি আপনার কাছে যাব। অতএব একটা প্রসেস একটা ইনস্টিটিউশনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এগুলো তো প্র্যাকটিসের ব্যাপার। অতএব এগুলো যেহেতু নেহরু প্রথম দিকে এবং তাঁদের একটা টিম ছিল, তারা এই প্রসেসগুলো বিশ্বাস করছিলেন, সে জন্য এটা প্রথম দিকে ছিল। কিন্তু এখন আপনি ভারতেও দেখছেন, যদি এ রকম টিম না থাকে, যদি প্রসেসটা কেউ না মেনে চলতে চায়, সবাই যদি বলে একজনই সব, তাহলে তো ওই একটা শক্ত জিনিসও আবার যে জন্য আজকাল লেখা হচ্ছে গণতন্ত্রের শুধু আগে আমরা বলতাম গণতন্ত্র কেবল কনসলিডেশন এটা এখন অনেক লেখা হচ্ছে কনসলিডেটেড ডেমোক্রেসি, যেটা সুসংহত, সেটার আবার ডিক্লাইন ব্যাক স্লাইড হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী হচ্ছে। আমেরিকা তো যখন ফাউন্ডিং ফাদারস যখন হলো, অনেকে তখন তো ওয়াশিংটনকে রাজা বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ছিল। ওয়াশিংটন নিজে এটার পক্ষে ছিলেন না এবং এরপর একটা টিম ছিল তাদের এবং উনি নিজে এরপর বললেন যে না। ওরা ওই প্রসেসগুলো করেছিল, সেই আমেরিকা ; অতএব আপনার যদি… সে জন্য আমি বলছি জাস্ট নট ওয়ান লিডার বাট ইউ নিড এ গ্রুপ অব লিডার্স যারা প্রসেসকে ভ্যালু করে কেমন। আর লিডারশিপ ইজ ইম্পর্ট্যান্ট। এখন সেই আমেরিকাতে ট্রাম্প এসে কিংবা সেই ইন্ডিয়াতে মোদি এসে যদি সে রুলসকে তোয়াক্কা না করে; তার পাশে যারা আছে, তারা যদি তাকে এটা নিয়ে বাধা না দেয়, প্রসেস না মেনে যদি সুপ্রিম কোর্টকে তারা দলীয়করণ করতে চায়, নিজের মতো নিতে চায়, তাহলে তো একটা কনসলিডেটেড জিনিসও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমি বলব যে আমাদের দেশে মানুষ ধারণাটা আমার মনে হয় যে ইট ইজ আ ভেরি কমপ্লেক্স ম্যাটার। আর একবার পেয়ে গেলেই যে এটা হয়ে গেল তা নয়; এটাকে প্রতিদিন নার্চার করতে হবে, প্র্যাকটিস করতে হবে। প্র্যাকটিসের বাইরে গেলেই তখন ধরতে হবে। অতএব এই জিনিসটা আমাদের এখন মানে একজন আরেকজনের ওপরে দোষ আরোপ না করে যে আমরা এটা কীভাবে, যদি গণতন্ত্রের প্রজেক্টটা আমরা বিশ্বাস করি, আমরা তাহলে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব। এটা একটু ধীরস্থিরভাবে আমাদের যারা চিন্তা করে, তারা একটু ধীরস্থিরভাবে এটা নিয়ে আলোচনা করা দরকার, কিন্তু আমাদের দেশে আসলে ধীরস্থিরভাবে, প্রথম কথা তো আলোচনাই নেই,… আলোচনা মানে গালাগালি করে তার কোনো লাভ হবে না। ওই ‘ঠিক আছে আপা’।

প্রশ্ন

  আচ্ছা, আমি বলি ২৪–এর যে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান হলো প্রায় বিপ্লবের মতোই তো। কারণ, গ্রামগঞ্জেও হয়েছে কিন্তু প্রচুর নারী, প্রচুর মেয়ে অংশগ্রহণ করেছে, রাস্তায় লড়াই করেছে, পুলিশের সঙ্গে লড়াই করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েরা প্রথম যেদিন বের হয়ে এসেছে, সেদিনই আসলে সরকারের পতন ঘটেছে, মানে শুরু হয়েছে। এরপরে আমরা দেখলাম যে মায়েরা তাদের স্কুলের ছাত্র, কলেজের ছাত্র মানে সন্তানদের নিয়ে মায়েরা চলে এসেছিলেন পথে কিন্তু তারপরে যখন অন্তর্বর্তী সরকার হলো, নানা সংস্কারের আলাপ হলো, অনেকগুলো কমিশন হলো। সেই কমিশনগুলো থেকে যখন ছবি তুলত ইউনূস সাহেবসহ, দেখতাম যে নারী আর নেই। সব পুরুষ, সব পুরুষ। তার মানে নারী কমিশন হয়েছে তাদের ওপরে আক্রমণ হলো সেটারও খুব একটা প্রতিবাদ হলো না এবং যে ডানপন্থী পক্ষ থেকে আক্রমণ করা হলো, অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সঙ্গে আপসই করল এবং এখন সেই নারীরা কোথায় গেল, এখন তো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি এই পরিস্থিতিটাকে কীভাবে দেখেন?

 রওনক জাহান: একদিক থেকে তো হ্যাঁ, হতাশা খুবই হতাশাব্যঞ্জক, কিন্তু আমি বলব যে এখনকার যে নারী, যারা অল্প বয়সী, যারা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং এখন তারা ভাবছে যে কী হলো এবং তারা নিরাশ হচ্ছে, আমি বলব, যেকোনো আন্দোলনে থাকতে হলে তাহলে নিরাশ হলে তো চলবে না, কেমন। লক্ষ্য যদি থাকে তাহলেই চিন্তা করতে হবে যে আমি কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাব, আমার এখানে অবস্ট্যাকলগুলো কী কী, বাধাগুলো কী এবং এই বাধাগুলোকে আমি তাহলেই কীভাবে ওভারকাম করে আমরা এগোব। …এটা শুধু যে বাংলাদেশে হয়েছে, তা না, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হয়েছে যে যখনই মেয়েরা স্বাধীনতা আন্দোলনে কিংবা অন্যান্য আন্দোলনে মেয়েরা, তখন আন্দোলনের মধ্যে অনেক সময় মেয়েরা থাকে। কিন্তু তার পরে অনেক সময় যে এই যে ক্রমাগত অংশগ্রহণ করা, ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা, সেগুলোর মধ্যে তখন মেয়েদেরকে পুশ ব্যাক করা হয়, তখন মেয়েরা থাকে না, কারণ মেয়েরা হচ্ছে আন্দোলনের সময় এটা স্বল্পমেয়াদি, স্বল্পক্ষণের জন্য মেয়েরা আসছে। কিন্তু তার পরে যেটা টেকওভার করে সেটা হচ্ছে অর্গানাইজড প্রেশার গ্রুপগুলো থাকে, পলিটিক্যাল পার্টি থাকে, ট্রেড ইউনিয়ন থাকে—এসব থাকে এবং সেখানেই আসলে মেয়েদের ও রকম অংশগ্রহণ নেই। অতএব তখন আর মেয়েরা, রাস্তার মেয়েরা তো আর ওটার ভেতরে ঢুকতে পারছে না তারপর ডিসিশন মেকিংগুলো আবার একটা ছোট গ্রুপের হাতে চলে যাচ্ছে। এখন আমি বলব যে মেয়েদের প্রথমেই এখন যারা, এই নারী আন্দোলনের মধ্যে… তাদের দেখতে হবে যে তাদের পেছনে, মানে কন্সটিটুয়েন্সি সাপোর্টটা অন্য মেয়েদের সাপোর্টে কতটা আছে। যেমন যারা শ্রমিক আন্দোলন করছে, তাদের হাতে শ্রমিকেরা রয়েছে কেমন। এবং তারা রাস্তায় গিয়ে ও রকম করে করতে পারে কিংবা পেজেন্ট মুভমেন্ট তাদের হাতেও যদি থাকে …। এখন নারীদের যেটাতে দুর্বলতা সেটা হচ্ছে যে নারীদের নারী ইস্যুগুলোতে যদি তারা আরও অনেক মেয়েকে সংযুক্ত না করতে পারে যে এই ইস্যুতে সব মেয়ে এক যে এটা এই দল কিংবা ওই দল, ওই দল নয় তারা ওইখানে যদি একটা কন্সটিটুয়েন্সি সাপোর্ট দেখাতে পারে কিংবা যদি তারা তাদের ইস্যুগুলোকে এমন পর্যায়ে নিতে পারে, যেটা ইউরোপে ওরা নিয়েছে, আমেরিকাতেও নিয়েছে, যেমন ওই যে প্রো–চয়েস তখন ছিল যে ইস্যু যে এই ইস্যুতে কে কে কোন পথে আছে এবং তুমি যদি এই ইস্যুতে না থাকো, তাহলে কিন্তু এর পরে ভোট জিততে পারবে না। এখন আমার মনে হয় আমাদের এখনকার সময়ে নারীর প্রতি ওই যে যে সহিংসতা এবং তারপরে আমি শুনছি যে এই যে সাইবার বুলিং—এগুলো যে মেয়েদের বিরুদ্ধে অনেক কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলা হচ্ছে, এখন এই দুইটা এই সব ইস্যুতে মেয়েদের নট অনলি যে এই এই ইস্যুগুলোকে নিয়ে, সমস্ত মেয়েদের মধ্যে একটা ইউনিটি করা এবং সব মানে সমবয়সী পুরুষদেরও ওই আন্দোলনটার মধ্যে নিতে হবে, যাতে একটা বিরাট ক্যাম্পেইন, সেইং নো টু দিস থিংস, হ্যাঁ। এই করে যাতে এবং যারা এটার পক্ষ নেয় তারা ইলেকশন করে ভোট পাবে না কিংবা তারা কোথাও মানে ওই রকমের একটা বিরাট ক্যাম্পেইন করতে হবে। কারণ তা নইলে এখন যেটা হচ্ছে অল্প কিছু মেয়ে এবং তারপরে তারা হয়তো প্রতিবাদ করছে, নারী আন্দোলনেও নারীদের যে সমস্ত মানে প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল, তাদের লিডারশিপও অনেক মানে পুরোনো এই যে অল্পবয়সী মেয়েরা তারা হয়তো বিভিন্ন অর্গানাইজেশনে আছে; কিন্তু নারী আন্দোলন বলতে নারীদের ইস্যু নিয়ে …। আমার মনে হয় একটা নতুন প্রজন্মের নারী আন্দোলন দাঁড়িয়ে যাবে, তারা আসছে। হ্যাঁ, তাহলে আমি বলব কিন্তু দাঁড়ালেও তাদেরকে প্রথমে যে এটা মনে রাখতে হবে যে তাদের পেছনে গ্রাসরুটস সাপোর্ট দরকার হবে যে তাদের পেছনে গ্রামের মেয়েদের ওয়ার্কিং ক্লাস মেয়েদের আমাদের নারী আন্দোলনের একটা মানে দুর্বলতা অনেক দিন ধরে ছিল যে লোকে সব সময় এটাকে খুব ডিসমিস করে দিতে পারত এই বলে যে এটা তো মধ্যবিত্ত নারীদের আন্দোলন। এখন নারীদের এই যে যারাই নারী আন্দোলন এখন করবে তাদেরকে মেজরিটি অব উইমেন, যারা ওয়ার্কিং ক্লাস উইমেন আরবান পুওর উইমেন রুরাল উইমেন তাদের ইস্যুজগুলো কী সেটা মানে তাদেরকে তো এটা দেখতে হবে এবং কারণ হচ্ছে কি দলগুলোরও তো তাদেরও তো নারী কর্মী, এসব রয়েছে এবং তারা যদি পার্টির ছেলেরা যদি বলে যে না তোমরা নারীদের রোলটা হচ্ছে এ রকম বিশেষ করে আমি বলব যে যারা ধর্মভিত্তিক দল করে, তারা একদিকে বলবে হ্যাঁ, মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে পারে, চাকরি করতে পারে, কিন্তু মেয়েদের একটা সীমিত রোলের মধ্যে থাকতে হবে, হ্যাঁ। তারপর কিংবা তারা ড্রেস কোড নিয়ে একটা কথাবার্তা বলবে, অতএব ওই সবারকে সাপোর্টগুলা সব গ্রুপের সাপোর্টগুলোকে নারী হিসেবে কয়েকটা কমন ইস্যু যেটা আছে, যেটা বলব একটা হচ্ছে ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন আরেকটা হচ্ছে, এই যে বুলিং যে হচ্ছে, যেটা শুধু মেয়েরা এই ইস্যুতে যাতে সব রকম মেয়েদের নিতে পারে, প্লাস ইয়াং ছেলেদের যাতে তারা নিতে পারে, তাদের সঙ্গে এভাবে একটা বিরাট ক্যাম্পেইন তাদের পেছনে জনবল থাকতে হবে, তো জনবল যদি না থাকে তাহলে তো কোনো আন্দোলন সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না, হ্যাঁ।

প্রশ্ন

এবার আমার আরেকটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন যদি অনুমতি দেন। হ্যাঁ, বলেন। আমাদের স্যারের সঙ্গে, রেহমান সোবহান স্যারের সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কীভাবে, বিয়ে হলো কীভাবে?

 রওনক জাহান: আচ্ছা পরিচয় হচ্ছে প্রথম ওনার লেখা আমি পড়ছিলাম এবং আমি যখন থিসিস করছি হার্ভার্ডে, তখন ওনার ডিসপ্যারিটির ওপরে যে লেখা, সেগুলো আমার খুব কাজে দিয়েছে। এ ছাড়া আমি এসে ঢাকায় ওনার প্রথম বইটা বেসিক ডেমোক্রেসিস ওয়ার্কস প্রোগ্রাম ওই বইটা যখন পেলাম, ওটা আমাকে দারুণ কাজে দিয়েছে, কারণ তার আগে আমার হার্ভার্ডে যেসব প্রফেসর ছিলেন, তাঁরা খুব এই ওয়ার্কস প্রোগ্রাম বেসিক ডেমোক্রেসির পক্ষে ছিলেন। আর ওনার বইটা পড়েই আমি তখন দেখলাম যে আরে না, এগুলাকে তো আইয়ুব খান তাদের রাজনীতির জন্য ব্যবহার করছে, এই পারসপেক্টিভটা প্রথম ওনার বই থেকে পেলাম এবং ওনার অনেক তথ্যও ছিল, যেগুলা আমি খুব ব্যবহার করতে পেরেছি। ওনার সঙ্গে প্রথম এর পরে ওনারা তখন ফোরাম বলে একটা কাগজ বের করছিলেন, তো তখন আমি যেহেতু তখন তো আর এ রকম নিউজ আমি বসে থাকতাম, কখন সাত দিন পরে নিউজপেপার আসবে, ওটা পড়ে দেশের খবর, তখন তো আর দেশের খবর পাওয়া যেত না, ওই তখন ফোরাম কাগজটা আসত হার্ভার্ডে, তখন আমি ওটাও মানে পড়তাম আমার জন্য খুব কাজে দিয়েছে উনসত্তরে, তখন কারণ আমি তো কারেন্ট সময় পর্যন্ত দেখছিলাম আপ টু ডেট থাকতে হচ্ছিল এবং আমি ইনফ্যাক্ট তখন ওরা বলেছিল ১০ ডলার দিলে এক বছরের সাবস্ক্রিপশন দেবে তখন আমি ওই ওই বলে পোস্টাল অর্ডার আমি পাঠিয়েও ছিলাম। আচ্ছা, তারপরে তো ওটা আসে না আমি তো খুব মানে ভীষণ বিরক্ত। তো যাহোক তারপরে ’৭০ সালে ওনার সঙ্গে প্রথম আমার পরিচয়। তখন রচেস্টারে পাকিস্তানের ওপরে একটা কনফারেন্স হচ্ছিল আর ওই কনফারেন্সটাতে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের সব নামকরা সব ইকোনমিস্টরা, মাহবুবুল হক থেকে আরম্ভ করে সরতাজ আজিজ তারা সব এসেছিল আর বাংলাদেশ থেকে শুধু রেহমানই এসেছিল আর আমরা কয়েকজন তখন আমি সবই পিএইচডি করে আমি তখন কলাম্বিয়াতে ওই পোস্টডক করছি, হার্ভার্ডের আর দুজন ছিল আব্দুল্লাহ আলমগীর তারপরে শামসুল বারী শিকাগো থেকে আমরা অল্পবয়সী কিছু ছিলাম তো এখন তখন সব থেকে হিটেড ডিবেট তখন বারবার হচ্ছে তো মানে এই যে ডিসপ্যারিটি—এগুলো আমাদের সেই যে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তো এখন ওখানকার যারা পশ্চিম পাকিস্তানে, তারা তো খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে এবং একজন ওদের আমি যেটাকে বলি একটা কোনো খেলা দেখতে হয় ক্রিকেট ওদের ১১টা খেলোয়াড়ই আছে আর আমাদের একমাত্র খেলোয়াড় হচ্ছে রেহমান, তখন সে গিয়ে বারবার ওরা যা–ই বলুক, সেটার উত্তর কেমন রেহমানই দিতে পারছে এবং আমাদের এই এক খেলোয়াড়ই সবাইকে কুপোকাত করতে পারছে। অতএব আমরা তো মানে যারা বিশেষ করে অল্পবয়সী যে আমরা দারুণ তখন মানে ভীষণ ফ্যান ক্লাব মানে হয়ে গেলাম যে আমাদের ইনস্ট্যান্ট হিরো যে আমাদের নট অনলি মুখ রক্ষা আমাদের খেলাটা ওই জিতিয়ে দিল একা তো একাই ১০০। তো তারপরে তো তখন রেহমান তখন নিউইয়র্কে এক দিনের জন্য এসেছিল তখন আমাকে রেহমান তো যথেষ্ট বামপন্থী, তখন আমাকে বলল ইকবাল আহমেদ আরও কিছু ওদের সঙ্গে আমি একটা ওর একটা আলোচনার ব্যবস্থা করে দিতে পারি কি না, তো তখন আমি ইকবাল আহমেদকে তারপরে ফিরোজদেরকে চিনতাম, তখন আমি একটা ওই একটা লাঞ্চের ব্যবস্থা করলাম আর কি তখন ওই ওখানে এটা কত সালে ওই ৭০–এ। ইকবাল আহমেদ আমি জানি না হোয়েদার ইউ নো ওই যে কিসিঞ্জারের ওই কেসে পরে পড়েছিল আর কি তো হি ওয়াজ ভেরি ওয়েল নোন লেফটিস্ট লিডার। তো তারপরে তো যাহোক তো রেহমান তো এমনিতে ও হি হ্যাজ আদার ইন্টারেস্টস সিনেমা দেখতে পছন্দ করে, খেতেই পছন্দ করে, তারপরে আমাকে বলল যে আমি ওকে ভিলেজে নিয়ে যেতে পারব কি না, তো আমিও তো অবশ্যই আমারও এ রকম সিনেমা দেখায় এসব হবি আছে, আমি ওকে নিউইয়র্কটা একটু ঘুরিয়ে দেখালাম। তারপরে যখন আমি এখানে দেশে এলাম তখন তো প্রফেসর রাজ্জাক এখানে ছিলেন এবং প্রফেসর রাজ্জাকও আমি বলব, আমার জীবনে আমার ওপরে আরেকটা দারুণ একটা ওনার, মানে ইনফ্লুয়েন্স, কারণ আমি যখন এখানে চাকরি করতে আরম্ভ করি, আমি খুবই অল্প বয়সে এখানে খুব তাড়াতাড়ি, আমি যেমন প্রথম আমার এই চাকরিটা আমি এজ আ রিডার অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে এলাম আমার বয়স তখন তিরিশও হয়নি এবং ইন মাই আরলি থার্টিজ আমি হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হয়ে গেছি, এখানে অতএব তখন আমার এখানে যা যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং বন্ধুত্ব কামাল হোসেন কিংবা হামিদা, রেহমান, তাঁর স্ত্রী সালমা, বদরুদ্দীন উমর, সালাউদ্দিন সাহেব… প্রফেসর রাজ্জাক সব সময় আমাকে ওনার বাসায় দাওয়াত করতেন এবং আমার বন্ধুবান্ধব যারা হলো, তারা সবাই আমার থেকে বয়সে বড়, কিন্তু ওই সার্কেলটাই আমার একমাত্র সোশ্যাল সার্কেল।

 কিন্তু প্রথম থেকেই রেহমানের… আমাদের মধ্যে যে কানেকশন, সেটা হচ্ছে, বেশির ভাগ লোকের সঙ্গে আমাদের দেশে তারা এমনি আড্ডা দেয়; কিন্তু রেহমানের আবার গবেষণার প্রতি সব সময় একটা আগ্রহ আছে। আমি যেসব গবেষণা করছিলাম, ওই যে এমপিদের ওপরে, রেহমান তো খুব আগ্রহী ছিল। ও সব সময় আমি কী লিখছি, সেটা দেখতে চাইত, সেগুলা ব্যবহার করত। মানে ক্রিটিক ক্রিটিসিজম করত। এখানে তো কেউ কারও লেখা পড়ে কোনো মন্তব্য করে না। তো রেহমান অ্যাট লিস্ট ওয়াজ জাস্ট অ্যাবাউট দ্য ওয়ান পারসন যে সব সময় আমার গবেষণাগুলোয় আগ্রহ দেখাত এবং ওরও রাজনীতিতে আগ্রহ আছে। অতএব আমাদের একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক ছিল।  … এ ছাড়া আমি তো ওর পরিবারেরও বন্ধু ছিলাম। ওর স্ত্রী সালমাও মেয়েদের নিয়ে লেখালিখি করত। সো উই ওয়্যার কমন ফ্রেন্ডস এবং আমরা একটা–দুইটা কাজ একসঙ্গে করেছিও। ’৯৬–এর একটা কনফারেন্সে কাজ করেছি, তার আগে ’৯৩–এও যখন প্রথম সিপিডি আরম্ভ করে, তখন গভর্ন্যান্স নিয়ে যখন পড়াশোনা করছিল, তখনো আমি ওর সঙ্গে কোলাবোরেট করেছি। বিয়েটা অবশ্যই আমি বলব যে এটা ও রকম কোনো পরিকল্পিত কিছু না। আসলে যে বয়সে মেয়েরা বিয়ের কথা ভাবে, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি খুব সচেতন সিদ্ধান্তেই ছিলাম যে বিয়ে করব না। সে জন্য বহু বছর আমি বিয়ে করিনি এবং সিদ্ধান্তটা আমি সচেতনভাবেই নিয়েছিলাম। কারণ, চারপাশে যা দেখছিলাম যে বিয়ে তো একটা প্রতিষ্ঠান এবং সেই বিয়েতে মেয়েদের যে প্রধান ভূমিকা, যেটা হচ্ছে যে ইউ হ্যাভ টু বি আ ওয়াইফ অ্যান্ড আ মাদার। স্ত্রীর একটা রোল রেসপন্সিবিলিটি আছে, মায়ের একটা রোল রেসপন্সিবিলিটি আছে। আমি চিন্তা করে, অনেক আগে দেখেছিলাম যে এই দুটো রোলে আমি মোটেই ভালো নই। এই সব রোল রেসপন্সিবিলিটি খুব হেভি; এগুলা আমার জন্য নয়। আমি নিজের মতন কাজ করতে চাই, স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই। কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে ব্যক্তিগত জীবনে আলোচনা করার দরকার নেই। আমার জন্য জীবন হবে নির্ঝঞ্ঝাট, এই যে আমার একা থাকা। অতএব আমি সেভাবেই ছিলাম। রেহমানের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে হঠাৎ যখন রেহমান বলল, তখন এই সিদ্ধান্ত নিতে আমার বেশ একটু চিন্তাই করতে হয়েছে যে আসলে তো আমি একাই ছিলাম, বিয়ে করলে একটা বিরাট একটা রেসপন্সিবিলিটির মধ্যে পড়তে হবে কি না! তো যা–ই হোক, রেহমান আমাকে নিশ্চিত করল, ‘না, তুমি যেভাবে আছ, সেভাবেই থাকতে পারবে। যা এডজাস্টমেন্ট করার, আমি করতে পারব।’ আমিও পরে চিন্তা করে দেখলাম যে আমি যা যা করতে চেয়েছি, আমি যদি ৬০ বছরের মধ্যেও যদি সেটা অর্জন করতে না পারি, এরপরও যদি সেটা অর্জিত না হয়, তাহলে তখন আমি নিশ্চয়ই অন্য কাউকে দোষ দেব না যে তোমার জন্য আমার জীবনের এই এইটা হয় নাই। অতএব আই অ্যাম আ মাচ মোর রিল্যাক্সড পারসন।

প্রশ্ন

  বিয়েটা কত সালে হলো?

 রওনক জাহান: এখন তো প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে; ২০০৫ সালে। আমি বলব যে, আমি এমনিতে যে রকম, ভেবেছিলাম যে অনেক সমস্যা হবে, সে রকম কিছুই হয়নি। এবং আমার মনে হয়, আমাকে ওই যেসব ভূমিকা পালন করতে হয়, এটা আমাকে পালন করতে হচ্ছে না। আর দ্বিতীয়ত, উই হ্যাভ বিন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড কলিগস ফর আ লং টাইম। অতএব আমাদের মধ্যে সব সময় এই লেখালিখি আর দেশের কথা… আমাদের যে রকম আলোচনা সব সময় ছিল, সে রকমই আছে। আগেও আমরা সিনেমা দেখতে যেতাম, খেতে যেতাম, থিয়েটার দেখতে যেতাম। সেগুলো আমরা চালিয়েই যাচ্ছি। অতএব আমাদের মধ্যে অনেক অনেক ব্যাপারে অনেক মিল আছে। তবে একটা ব্যাপারে মিল নেই এবং আমার মনে হয় মাঝেমধ্যে কমপ্লিমেন্টারিটিটা ভালো। আমি আমি বেশ অস্থির এবং আমি খুব ঘুরতে পছন্দ করি। আমি অনেক বেড়াই এবং কোনোখানে গেলে আমি একটার পর একটা জিনিস দেখতে থাকি। জাদুঘরে যাচ্ছি, এখানে ছোটাছুটি করতে পছন্দ করি। রেহমান হচ্ছে খুব যাকে আমি বলব, ইংরেজিতে অ্যাংকরড। মানে ধীর–স্থির এবং সে একখানে বসলে বসেই থাকতে পছন্দ করে। অতএব আমি আগে যতটা ছোটাছুটি করতে পারতাম, এখন যেহেতু হি ইজ ভেরি অ্যাংকরড পারসন, সে তখন বলবে, না। বড়জোর একটু আধা ঘণ্টা হেঁটে বলবে, এখন একটা কফি খাওয়া যাক। তারপর দুই ঘণ্টা হয়তো কফিতেই চলে গেল। আমি হলে ১০–১৫ মিনিটে কফিটা শেষ করে আরেক জায়গায় গিয়ে আরেকটা জিনিস দেখতাম। এখন আর ও রকম ভাবে কাটে না। না!

প্রশ্ন

আপনারা খুবই ভালো আছেন। বাইরে থেকে দেখে আমাদের খুব ভালো লাগে। আপা, আমরা শেষ করে ফেলব, আপনি কি আর কোনো কিছু নিয়ে বলতে চান, বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদী কি না?

 রওনক জাহান: আমি বাংলাদেশ সম্বন্ধে সব সময় আশাবাদী। এ জন্য আমি বলব, যেটা একটু আগে আলোচনা করছিলাম যে হ্যাঁ, গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের যে আশা ছিল, সেটাকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে পারিনি। বাংলাদেশের যে কোর, যেটা একদম মৌলিক মতাদর্শ, এই সেকুলারিজম, যেটা নিয়ে পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা হলাম, এ জন্য যে ওরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র;  আমরা এটা নই হয়তো, ওই টু নেশন থিওরির মধ্যিখানে যেটা ছিল, সেটা থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম। এবং এটা এটার মানে এই নয় যে আমরা সেকুলার হওয়া মানে এই নয় যে আমরা আমরা মুসলমান নই। আমরা প্র্যাকটিসিং মুসলমান ছিলাম, কিন্তু প্র্যাকটিসিং মুসলমানও রাষ্ট্রের ব্যাপারে, সমাজের ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে এবং এটা আমার মনে হয়েছিল সব সময় যে এটা আমাদের একটা মূল মতাদর্শ। কিন্তু এখন সেই আদর্শ এখনকার প্রজন্মের কাছে কতটা, সেটা আমি দেখছি। সেই আদর্শের প্রশ্ন সামনে পড়ছে এবং বিশেষ করে আমি বলব যে অল্পবয়সীরা, আমরা তো আর সব সময় থাকব না, কেন যে এখনকার প্রজন্ম এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে; নানা রকম অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করতে চাচ্ছে! আমার মনে হয় যে এই দুটো ব্যাপারে আমরা পিছিয়ে গেছি। কিন্তু তখন আমরা যে রকম গরিব ছিলাম, আমাদের শিক্ষার হার যে রকম ছিল, তারপর স্বাস্থ্যের হার, তারপর মেয়েদের–নারীদের শ্রমবাজারে যে অংশগ্রহণ, নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার, তারপর আমাদের অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে হোক, হ্যাঁ, অনেক হয়েছে। লোকে বলতে পারে যে কিছু লোক টাকা করেছে, বৈষম্য বেড়েছে কিন্তু গড়পড়তাভাবে তখন যে গ্রামের শিশুরা স্কুলে যেতে পারত না, মানুষ খেতে পারত না, কাপড় নেই, খালি পা; মানুষ কিন্তু নিজের শ্রম দিয়ে, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে এবং বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৃজনশীল এবং ঝুঁকি নিতে পারে। এই যে অভিবাসীরা কোথায় কোথায় যাচ্ছে, আমি যখন বাইরে যাই, নারীদের দেখি, তারা গ্রাম থেকে এসেছে, সবার হাতে একটা মুঠোফোন। তারপর বিমানবন্দরে যখন যাই, আমি বলি, তোমরা কী করে এই চাকরিতে এলে? তখন ওরা বলে যে কোনো ছোট গ্রাম থেকে এসেছে। কিন্তু ওরাও ওই মুঠোফোনে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে, তারপর আবেদন করে তারা আসে। আমাদের এই শ্রমজীবী শ্রেণিতে অনেক মেয়ে আছে দারুণ সাহসী, দারুণ ঝুঁকি নিতে পারে এবং সবার ওপরে আমি বলব যে হ্যাঁ, কিছু লোক আমাদের দেশে খারাপ, কিন্তু অনেক লোক আছে যারা আসলে সৎভাবে বাঁচতে চায়, প্রতিবেশীকে সাহায্য করতে চায়, করে, মানুষের মনে দয়ামায়া আছে, এখনো একটা সেন্স অব কমিউনিটি আছে। সে জন্য আমি বলব এবং এর আগে যেটা বললাম যে একটা জিনিস যদি অন্যায় হয়, তারপরে কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ সেটার প্রতিবাদ করে, পরিবর্তন করে। নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা, একটা ব্যবস্থার পরিবর্তন করা…এগুলার এই সক্ষমতা অনেক দেশেই নেই। আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত মানুষ করতে পারছে। অতএব সেটা দেখে আমি বলব যে আমি এখনো আমাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী এবং আমরা যখন অনেক ব্যাপারে কিছু হচ্ছে না বলে ভাবছি, কিন্তু যারা বিশেষ করে আমাদের বয়সী, তারা যদি আমরা একটু ভেবে দেখি যে কত কত ব্যাপারে আমরা এগিয়ে গেছি! কিছু ব্যাপারে আমরা এগোতে পারিনি, কিন্তু অনেক ব্যাপারে নিজের চেষ্টায় আমাদের এগিয়েছি। এখানে তো কোনো খনিজ সম্পদ নেই, শুধু মানুষদের দিয়েই আমরা করেছি। এখন পরবর্তী ধাপ যেগুলো আছে, এইগুলোকে আমি যেটা বলছি যে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখতে হবে। আমাদের শিক্ষাকে আমরা বর্ধিত করেছি। মানটা নেই, কিংবা দক্ষতা নির্মাণের সঙ্গে চাকরি হচ্ছে না। অ্যাডাপটেশন কিছু দরকার এই দ্বিতীয় প্রজন্মে। প্রথম প্রজন্মে আমরা অনেকগুলো ইনোভেশন করেছিলাম যেটা আবেদ কিংবা জাফরুল্লাহ… এরা করেছিল ইনোভেটিভ থিঙ্কিং করে। নতুন মডেল এখনো দরকার আছে। এ রকম ইনোভেটিভ মডেল করে, যেটা আমাদের জন্য উপযুক্ত। এ রকম করে দেশটাকে আবার এগিয়ে নিতে হবে।

প্রশ্ন

তাহলে আমরা শেষ করি। আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং আমাদের প্রথম প্রজন্মের নারী অধিকারকর্মী, নারী সংগঠক ও শিক্ষাবিদ রওনক জাহানের সঙ্গে কথা বলে খুবই ভালো লাগল। আমার মনে হয়, আপনাদেরও ভালো লেগেছে। তিনি বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী। আমরা এই আশাবাদ নিয়ে এই অনুষ্ঠান শেষ করতে চাই। যে যেখানে থাকেন, ভালো থাকেন। আপা, আপনাকে ধন্যবাদ।

 রওনক জাহান: হ্যাঁ, আপনাকেও ধন্যবাদ।