পিঠে দুধের শিশুকে বেঁধে পাহাড়ের পাথুরে পথে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসছে এক শিশু। নীল রঙের টি-শার্ট পরা শিশুটির চুল উষ্কখুষ্ক। চোখেমুখে ধুলো, ঘাম, ময়লা আর ক্লান্তির ছাপ। তার পিঠে বাঁধা থাকা শিশুটিও কাঁদছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্মে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিও নিয়ে দাবি করা হয়েছে, ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পর মা-বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে দুই শিশু। কোথাও আবার বলা হয়েছে, বন্যায় মা-বাবাকে হারিয়ে ছোট বোনকে পিঠে নিয়ে ঘুরছে শিশুটি। কোথাও ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘বন্যায় মা-বাবা নিখোঁজ, পিঠে ছোট বোনকে নিয়ে জঙ্গলের পথে বালক!’
Jeet নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে নেপালের বন্যার ঘটনায় সঙ্গে জড়িয়ে। ক্যাপশনের লেখা ছিল, ‘নেপাল থেকে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ছোট্ট এক বালক তার ছোট বোনকে আগলে নিয়ে মা-বাবার খোঁজ করছে। তাদের মুখের কষ্ট আর আঁচড়ের দাগগুলো দেখুন।’ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৬ সেকেন্ডের ভিডিও ১৬ লাখের অধিক দেখা হয়েছে একটি অ্যাকাউন্টে।
লিংক: এখানে
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটির সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি প্রদেশ হা জাংয়ের একটি গ্রামের দৃশ্য।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শতাধিক পেজ ও প্রোফাইলে নেপালের দাবিতে ছড়িয়ে পড়েছে। নেপালের বন্যার সঙ্গে ছবিটিকে জড়িয়ে একটি আবেগপ্রবণ গল্পও যুক্ত করা হয়েছে।
ফেসবুকে আবার কেউ কেউ ভিডিওটির সঙ্গে ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর মার্কিন আলোকচিত্রী জো ও’ডনেলের তোলা বিখ্যাত ছবির তুলনা করছেন। ওই ছবিতে প্রায় ১০ বছর বয়সী এক বালককে দেখা যায়, যার পিঠে কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল তার মৃত ছোট ভাইয়ের মরদেহ। শিশুটিকে একটি দাহস্থলের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমও ভাইরাল ভিডিওটি নিয়ে আবেগধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে এসব প্রতিবেদনের কয়েকটিতে বলা হয়েছে, ভিডিওটি নেপালের বলে দাবি করা হলেও দাবিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুধু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নয়, ভারতের একাধিক মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও নীল রঙের টি-শার্ট পরা একটি শিশুকে আরেকটি কান্নারত শিশুকে পিঠে বেঁধে বহন করার ভিডিওটি নেপালের ভয়াবহ বন্যার সঙ্গে যুক্ত করে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
ভিয়েতনামের দুই শিশুর ভিডিও
নেপালের বন্যার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির বিভিন্ন কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড ব্যবহার করেও অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে ‘থিন দুয়েন’ (Thien Duyen) নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই অ্যাকাউন্টে গত ২৯ আগস্ট ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছিল।
লিংক: এখানে
মূল ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ি একটি রাস্তার পাশে থাকা ঘর থেকে দুটি শিশু ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসছে। সামনে আসার পর দেখা যায়, ঘেমে থাকা একটি ছেলে শিশু তার চেয়ে ছোট একটি কান্নারত শিশুকে পিঠে নিয়ে আশপাশে তাকাচ্ছে।
ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়, দুপুরের প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ছোট ছেলেটি তার ছোট ভাই বা বোনকে নিয়ে যাচ্ছে। ধুলায় মাখামাখি দুই শিশুকে দেখে সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেখানে নেপালের বন্যা, মা-বাবাকে হারানো কিংবা মা-বাবাকে খুঁজে বেড়ানোর কোনো তথ্য নেই।
পরবর্তী সময়ে ওই দুই শিশুকে নিয়ে একই অ্যাকাউন্টে ২ সেপ্টেম্বর আরও একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, ছেলেশিশুটির পিঠে থাকা ছোট শিশুটি কাঁদছে। পরে ক্যামেরার পাশ থেকে এক ব্যক্তি এসে দুই শিশুর মাথায় ক্যাপ পরিয়ে দেন। তাদের ঘর্মাক্ত মুখ মুছে দেন। বড় শিশুটির হাতে জুস এবং কান্নারত শিশুটির হাতে বিস্কুট তুলে দেওয়া হলে শিশুটির কান্না থেমে যায়। ভিডিওর শেষ অংশে তাদের হাতে কিছু খাবারের প্যাকেটও তুলে দিতে দেখা যায়।
লিংক: এখানে
দ্বিতীয় ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ময়লা-ধুলায় মাখামাখি এবং নিয়মিত গোসলের সুযোগ না পাওয়া এই দুই ছোট ভাই–বোনকে দেখে সবারই মায়া হয়।
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটিতে একই ধরনের আরও একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। এসব ভিডিওতে ভিয়েতনামের পাহাড়ি এলাকায় শিশুদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখা যায়। পাহাড়ি এলাকার ছোট শিশুদের সহায়তা করা, অসুস্থ শিশুকে খাবার উপহার দেওয়ার মতো ভিডিওও নিয়মিত পোস্ট করা হয়েছে অ্যাকাউন্টটিতে।
ভিডিওটির নেপাল-সম্পর্কিত দাবিটি খণ্ডন করে একাধিক ফ্যাক্টচেক ও ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্টেটসম্যানকে ওই ভিডিওর ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর থিন দুয়েনের নিজেই নিশ্চিত করেছেন, ভিডিওটি ভিয়েতনামের হা জাংয়ে ধারণ করা হয়েছিল।
লিংক: এখানে
এ ছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজমিটার গত ৩১ আগস্ট তাদের প্রকাশিত এক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে ভিডিওটির স্থান হিসেবে ভিয়েতনামের হা জাং প্রদেশের মেও ভ্যাক জেলার খাউ ভাই কমিউনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লিংক: এখানে
জঙ্গল থেকে শিশু উদ্ধার, ঘটনাটি ২০ আগস্টের
নেপালের বন্যার সঙ্গে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, ‘নেপাল বিপর্যয়ের তিন দিন দুই রাত পর একটা শিশু জীবিত উদ্ধার জঙ্গলে।’
ভিডিওতে দেখা যায়, একটি শিশু জঙ্গলের মধ্যে ছোট্ট একটি পাথরখণ্ডের পাশে বসে আছে। আশপাশে লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ভরা। কয়েকজন তাকে ঘিরে রয়েছে এবং উদ্ধার করার দৃশ্য ধারণ করছে।
ভিডিওটির স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড ব্যবহার করেও অনুসন্ধান করা হয়।
যাচাইয়ে নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি নেপালের পূর্ব নওয়ালপরাসি জেলার গেইনডাকোট পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভাগর এলাকার।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আড়াই বছর বয়সী সিভান তামাং নিখোঁজ হওয়ার পর টানা দুই রাত ধরে ঘন জঙ্গলে তার সন্ধানে অনুসন্ধান চালানো হয়। পরে ২০ আগস্ট সকালে ঘন জঙ্গলের ঝোপের মধ্যে শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
তবে এখানে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি রয়েছে। নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা ঘটে ২৬ আগস্ট। অন্যদিকে জঙ্গল থেকে সিভানকে উদ্ধার করা হয় ২০ আগস্ট।
নেপালের বন্যার সঙ্গে জড়িয়ে আরেকটি শিশুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, নেপালের বন্যার তিন দিন পর একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ২৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গর্তের ভেতর আটকে থাকা এক শিশুকে জুস খেতে দেওয়া হচ্ছে। এরপর উদ্ধারকর্মী ও আশপাশের লোকজন মিলে শিশুটিকে ওই স্থান থেকে বের করে নিয়ে আসছেন।
নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। এমন দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ২১ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৪ লাখ ১২ হাজারের বেশি বার।
মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেক নেটিজেনই এটিকে নেপালের বন্যা–পরবর্তী সময়ের শিশু উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে বিশ্বাস করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তবে যাচাইয়ে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক উদ্ধার কাজের নয়; এটি ভারতের একটি পুরোনো ঘটনার।
সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির বিভিন্ন কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা হয়।
এতে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি ২০২৬ সালের ১৫ মে ভারতের পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুরে ঘটে। প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনের সঙ্গে নেপালের দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির মিল পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরকরণ সিং নামের চার বছর বয়সী এক শিশু খেলতে গিয়ে বাড়ির কাছে খনন করা একটি গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যায়। প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
প্রসঙ্গত, নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগে শিশু উদ্ধারের বাস্তব ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৮ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ৬০ ঘণ্টা আটকে থাকা ছয় বছর বয়সী মানিশা মাগারকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সংবাদ ও ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।