গ্রেপ্তারের পর ডিবির গাড়িতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
গ্রেপ্তারের পর ডিবির গাড়িতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানব পাচার মামলায় রিমান্ডে

এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ‎ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানব পাচার আইনের এক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত এ আদেশ দেন।

ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গতকাল সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্যমতে, তাঁর বিরুদ্ধে ফেনী ও ঢাকায় মোট ১১টি মামলা রয়েছে।

এর মধ্যে রাজধানীর পল্টন থানায় এক ব্যবসায়ীর দায়ের করা মানব পাচারের মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়।

বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ঢাকার সিএমএম আদালতে আনা হয়। বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে তাঁকে এজলাসে তোলা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক রায়হানুর রহমান জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। তাঁর আবেদনে বলা হয়, মামলার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, আত্মসাৎকৃত ও চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র শনাক্ত করার জন্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।

রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন।

রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে ২৪ হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন এই আসামি। তথাকথিত ১/১১ সরকারের সময় এই আসামিসহ অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করতেন এবং তাঁদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। এ আসামি রাজনৈতিক নেতাদেরও ধরে এনে নির্যাতন করতেন। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! যাঁকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। টাকার ভাগ কারা কারা পেয়েছেন, কোথায় কোথায় তাঁরা টাকা পাচার করেছেন, তা জানতে আসামিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় এই মামলা করেন আফিয়া ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আলতাব খান। এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়াও মামলায় সাবেক প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা সিন্ডিকেট চক্র গড়ে তুলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য করে সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থী জঘন্য অপরাধ করেছেন। মামলার আসামি সাবেক সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তাঁর পরিবারের সদস্য অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবহির্ভূতভাবে ‘প্রবাসী’ নামক একটি অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে চক্রকে সহযোগিতা করেছেন। পরস্পর যোগসাজশে মামলার বাদীর সরলতার সুযোগে ভয়ভীতি ও বল প্রয়োগ করে মানব পাচারের উদ্দেশ্যে তাঁর কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে প্রত্যেকের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের ১২ কোটি ৫৬ লাখ ১ হাজার টাকা আদায় করেছেন। এ ছাড়া তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে তা আত্মসাৎ করেছেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এক-এগারোর পটপরিবর্তনে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন। পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। এই কমিটির অধীনেই তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়।

২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসরগ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে দুই দফায় (২০১৮ ও ২০২৪) ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। পরে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান এবং জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন।