
রাজধানীর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে অটোরিকশা থেকে নামার পরই পথশিশুদের দলটিকে পাওয়া গেল। তারা আমাকে আগে থেকেই চিনত। একটি শিশু বলল, ‘ভাই, আইছেন।’ আমি জানতে চাইলাম, সাইদুল (১২) কোথায়?
ততক্ষণে অটোরিকশা থেকে সাইদুলের মা ফাতেমা আক্তার ও বাবা মো. মোস্তফা কামাল নেমেছেন। পথশিশুদের দলের একজন দেখিয়ে দিল সাইদুল কোথায়। সে (সাইদুল) দাঁড়িয়ে ছিল একটি গলির মুখে। মা তাকে দেখে দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। শুরু করলেন কান্না। কিছুক্ষণ পর সাইদুলের বাবা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। শিশুটি মা-বাবাকে পেল পাঁচ বছর পর।
এটি একটি পথশিশুর পরিবারের কাছে ফেরার গল্প। এটি সম্ভব হয়েছে প্রথম আলোর ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টের কারণে। গত সোমবার সন্ধ্যায় এই পোস্ট দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, বাড়ি ফিরতে চায় সাইদুল। তার ঠিকানা কুমিল্লার মুরাদনগর। সঙ্গে মা ও বাবার নাম। যদিও পূর্ণ ঠিকানা সাইদুলের জানা ছিল না।
প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আমি পোস্টটির নিচে করা মন্তব্যগুলোর দিকে নজর রাখছিলাম। যাঁরা চিনতে পেরেছেন বলে মন্তব্য করছিলেন, তাঁদের সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করছিলাম।
একটা পর্যায়ে ‘রোদেলা আকাশ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হয়, ‘আমি চিনি, আমার ভাশুরের ছেলে।’ দ্রুত তাঁকে বার্তা পাঠাই। তিনি আমাকে একটি মুঠোফোন নম্বর দেন। নম্বরটিতে কল করার পর ওপাশের ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি শিশু সাইদুলের দাদা। যাচাইয়ের পর তাঁকে পরের দিন প্রথম আলো কার্যালয়ে আসতে বলি।
সাইদুলের সঙ্গে আমার পরিচয় চার দিন আগে। ১২ এপ্রিল ছিল বিশ্ব পথশিশু দিবস। এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের কাজে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। পুরানা পল্টন এলাকায় পথশিশুদের একটি দলের সঙ্গে ১০ এপ্রিল কথা হয়। এই দলের একজন সাইদুল। সে আমাকে জানায়, ছোটবেলায় ভুলক্রমে ট্রেনে উঠে ঢাকায় চলে আসে। সে বাড়ি ফিরতে চায়; কিন্তু নির্দিষ্ট ঠিকানা জানে না।
সাইদুল তখন বলেছিল, ঢাকায় এসে ক্ষুধার জ্বালায় সে পুরোনো লোহালক্কড়, তথা ভাঙারির দোকানে কাজ শুরু করে। বোতল টোকানোর কাজ করেছে। মানুষের সাহায্য চেয়েও চলেছে। থাকত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে (বিজয়নগর এলাকায়) একটি বটগাছের নিচে। পথশিশুদের একটি দলই তার পরিবার হয়ে উঠেছিল।
সেদিন কথা বলার সময় সাইদুল বলেছিল, ‘ভাইয়া, আমি বাড়ি যামু। আমারে বাড়ি নিয়া যান।’ আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, তাকে বাড়ি ফেরাতে সকল চেষ্টা করব।
পথশিশুদের নিয়ে প্রতিবেদনটি করার পর ১৩ এপ্রিল সাইদুলকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়ার অনুরোধ জানাই প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ কর্মীদের। সন্ধ্যায় একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার হিসাবে, ফটোকার্ডটিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ৩৪ হাজারের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী। মন্তব্য এসেছে ৮১৫টি। আর ফটোকার্ডটি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ার করেছেন ৬ হাজার ২০০ জন। অনেকে সেটি ডাউনলোড করেও শেয়ার করেছেন।
সাইদুলের চাচার ফোন
ফটোকার্ড প্রকাশের দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে মুঠোফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। অপর পাশের ব্যক্তি জানান, তাঁর নাম বোরহান উদ্দিন। নিজেকে তিনি শিশু সাইদুলের বড় চাচা পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে থাকেন, রাতেই সাইদুলের কাছে যেতে চান। আমি তাঁকে প্রথম আলো কার্যালয়ে আসতে বলি।
তখন রাত ১১টার কাছাকাছি। এক বন্ধুকে নিয়ে আমি প্রথম আলো কার্যালয়ে। বোরহান এসেছেন। সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি। তাঁদের কাছে শিশুটির হারিয়ে যাওয়ার সময়কার ছবি এবং শিশুটির মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ছবি রয়েছে। তিনি জানান, সাইদুলের মা-বাবা চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছেন।
শিশুটির বিষয়ে অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। বিষয়টি সহকর্মীদের জানালে তাঁরা পরামর্শ দেন, দিনের বেলা পুলিশের উপস্থিতিতে সাইদুলকে তার মা-বাবার কাছে বুঝিয়ে দেওয়াই ভালো হবে। আমি বোরহান উদ্দিনকে পরদিন সাইদুলের মা-বাবাকে নিয়ে আসতে বলি।
শিশুটির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বন্ধুকে নিয়ে সেই রাতেই যাই পুরানা পল্টন এলাকায়। তখন রাত সাড়ে ১২টা। রাস্তাগুলো সুনসান। পথশিশুদের দলটি যেখানে থাকবে বলেছিল, সেখানে নেই। খোঁজ করতে থাকি। এর মধ্যে শিশুদের দলের অনেকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তারা আমাকে চিনতে পারে। তারা বলে, ‘ফুয়াদ ভাই, ও (সাইদুল) আমাগো লগেই ছিল। আপনি দাঁড়ান। আমরা খুঁইজা আনতেছি।’ আমি শিশুদের সঙ্গে মেট্রোরেলের সচিবালয় স্টেশন, কাকরাইল অভিমুখের রাস্তা, মতিঝিল অভিমুখের রাস্তা খুঁজে দেখি। কোথাও সাইদুলকে পাওয়া যায়নি।
রাত একটা পেরিয়ে যায়। তখনো আমরা তাঁকে খুঁজছি। একপর্যায়ে অন্য পথশিশুরা বলে, তাদের কাছে একটা মুঠোফোন আছে। আমার নম্বর দিয়ে গেলে তারা সাইদুলকে পাওয়ার পর কথা বলিয়ে দেবে।
মন খারাপ করে যখন বাড়ি ফেলার জন্য অটোরিকশা খুঁজছি, তখন গলির মুখে সাইদুলকে দেখতে পাই। তাকে বলি, আমার সঙ্গে আমার বাসায় যেতে। সে রাজি হয়নি। পরে বলি সে যেন কারও সঙ্গে না যায়। তার মা-বাবা ঢাকার পথে রয়েছে। এ কথা শুনে সে কেঁদে ফেলে।
মায়ের সঙ্গে দেখা
সাইদুলের মা, বাবা, এক ভাই ও এক বোন এবং চাচা বোরহান উদ্দিন গতকাল সকালে প্রথম আলো কার্যালয়ে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে জানা যায়, সাইদুলের বাবা মোস্তফা কামাল অটোরিকশার মিস্ত্রি। মা ফাতেমা পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এই দম্পতির প্রথম সন্তান সাইদুল। তাঁদের এখন চার সন্তান।
মোস্তফা কামাল ছেলের টিকা কার্ড, নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সঙ্গে সাইদুলের ছোটবেলার ছবি ইত্যাদি প্রমাণ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ছয় বছর বয়সে চট্টগ্রাম থেকে সাইদুল হারিয়ে যায়। ছেলেকে খুঁজতে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, এলাকায় মাইকিং করেছেন; এমনকি কবিরাজের শরণাপন্নও হয়েছেন। ছেলেকে ফিরে পাননি, তবে আশা ছাড়েননি।
সাইদুলের মা-বাবা, ভাই, বোন ও চাচাকে নিয়ে যাই পুরানা পল্টনে। সেখানে গিয়ে সন্তানকে পেয়ে আপ্লুত হন সাইদুলের মা-বাবা। ফাতেমা সন্তানকে পেয়ে বলেন, জীবনেও ভাবেননি তাঁরা তাঁদের বড় ছেলেকে ফিরে পাবেন। তিনি কিছুক্ষণ পরপরই আমার ও প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন।
আমরা যখন থানায় যাব, তখন সাইদুলের বন্ধুদের বিদায় দেওয়ার পালা। সাইদুল বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে, হাত মিলিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিল। ছবি তুললাম আমার মুঠোফোনে।
দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় গেলাম সাইদুল ও তার পরিবারকে নিয়ে। পুলিশকে খুলে বললাম ঘটনা। তারা ডেকে আনল শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী শাহানাজ মনিকে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান এসে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাইদুলকে বুঝিয়ে দিলেন পরিবারের কাছে। পুলিশ সাইদুলকে পরিবারের কাছে ফেরানোর চেষ্টার প্রশংসা করল।
সাইদুলের মা-বাবা গতকাল তাকে নিয়ে কুমিল্লায় নিজেদের গ্রামের বাড়িতে গেছেন। সেখানে তার দাদা-দাদি অপেক্ষায় রয়েছেন নাতিকে দেখার। যাওয়ার আগে সাইদুলের কাছে জানতে চাইলাম, মা-বাবাকে পেয়ে কেমন লাগছে। এক শব্দে তার উত্তর, ‘ভালো’। রিকশায় যাওয়ার আগে সে হাত নেড়ে বিদায় জানায়, মুখে হাসি।