শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় নূরে আলম সিদ্দিকীকে স্মরণ

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর স্মরণসভায় বক্তারা
ছবি: প্রথম আলো

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হলো ষাটের দশকের ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীকে। স্মরণসভায় অংশ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা বললেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চার খলিফার জ্যেষ্ঠ খলিফা ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন। ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে ফেলা যাবে না।

রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে প্রয়াত নূরে আলম সিদ্দিকীর নাগরিক স্মরণসভায় বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন। গত ২৯ মার্চ ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর স্মরণে রোববার বিকেলে নাগরিক স্মরণসভার আয়োজন করে নূরে আলম সিদ্দিকী স্মরণ নাগরিক কমিটি। অনুষ্ঠানে নূরে আলম সিদ্দিকীর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন, নিবেদিত সংগীত ও আবৃত্তি ছাড়াও ছিল আলোচনা পর্ব।

আলোচনা পর্বে প্রধান আলোচক ছিলেন ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের দিকে আলম ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলে আমার পড়ার টেবিলে বসেন। আমি বিছানায় বসা। বাগমার (ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আজিজ বাগমার) ভাই আধা শোয়া অবস্থায়। আড্ডা চলছে। হঠাৎ আলম ভাই বললেন, “এই দেশটাকে স্বাধীন না করলে চলবে না। আমাদের মান-মর্যাদা বলে কিছু থাকছে না।” ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ওই সময়টা বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার সময়। নূরে আলম সিদ্দিকীর সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচল যে কথাটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর চার খলিফার জ্যেষ্ঠ খলিফা। সত্তরের আগে থেকেই কথাটি চাউর হতে শুরু করেছিল।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘১৯৭৫ সালে সংসদে বঙ্গবন্ধু যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তখন গুটিকয় ছাড়া সবাই এর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এর বিরোধিতা করে পৌনে তিন ঘণ্টা বক্তব্য দিয়েছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। সেই বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমার মনে প্রশ্ন ছিল যে কেন তিনি এর বিরোধিতা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই প্রশ্নটি আর করা হয়নি। কিন্তু সেই প্রশ্নটি আমার বিবেকে রয়ে গেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি।’

নানক আরও বলেন, ‘নূরে আলম সিদ্দিকীর রাজনৈতিক জীবন বর্ণাঢ্য। আমার কষ্ট ছিল, তিনি কেন রাজনীতি থেকে অবসরে গেলেন। তাঁর মতো সাহসী ও গণতন্ত্রমনা একজন নেতাকে আমাদের প্রয়োজন ছিল। আমরা তাঁর জীবনকে জানব, সেখান থেকে নেওয়ার চেষ্টা করব।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘নূরে আলম সিদ্দিকীকে বঙ্গবন্ধু স্নেহ করতেন। স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জাতিকে মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর প্রণীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ কিছু সংগঠক ছিলেন। তাঁদের প্রথম কাতারে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছিল।’

শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূর বলেন, ‘নূরে আলম সিদ্দিকী বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি আমাদের পিতার মতোই আগলে রেখেছিলেন। নূরে আলম সিদ্দিকী জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তিনি আজীবন শ্রদ্ধা বহন করে গেছেন। রাজনীতি থেকে দূরে সরলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আজন্ম ভালোবাসা কখনোই কেটে যায়নি। বঙ্গবন্ধুও তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। অসাধারণ বাগ্মী নূরে আলম সিদ্দিকীকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করা যায় না। তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায় না। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তাঁকে তাঁর যথাযথ জায়গাটা দেওয়া হয় না।’

নূরে আলম সিদ্দিকীর ছেলে এবং ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘আজীবন প্রতিবাদী নূরে আলম সিদ্দিকী নিজেই বলে গেছেন তাঁর জীবনের প্রতিবাদী গল্প। সযত্নে তা ধারণ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। আত্মজীবনীমূলক বই আকারে এর সম্পাদনার দায়িত্ব তিনি অর্পণ করে গেছেন শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্র জাহীদ রেজা নূর, নিজের প্রেস সচিব কবি ও বাচিকশিল্পী অনিকেত রাজেশ এবং আমাকে। গল্পের নামও তিনি ঠিক করে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার আঙ্গিকে—“আমার গেছে যে দিন”।’ আগামী বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হতে পারে বলে জানান তিনি।

স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক আবেদ খান। তিনি বলেন, ‘নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমরা প্রায় সমসাময়িক। আমি সাংবাদিকতা শুরু করি ১৯৬২ সালে। তিনি ইত্তেফাক অফিসে যেতেন। আমরা কত গল্প করতাম! তিনি কথা বলতেন নাকি কবিতা বলতেন, আমার এখনো সন্দেহ হয়। অনেকে জানে না, ছাত্রলীগের ইতিহাসটা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সক্রিয়। ছাত্রলীগের নতুন প্রজন্ম অতীতের ছাত্রলীগকে ফিরিয়ে দেবে বলে আশা করি। আমরা হারিয়ে ফেলা অতীতকে খুঁজে বের করতে তাই। নতুন নেতৃত্বের কাছে আমরা সততা ও ত্যাগ প্রত্যাশা করি। মুক্তিযুদ্ধের পতাকাটা যেন কোনোভাবেই ভূলুণ্ঠিত বা পরাজিত না হয়।’

শিল্পী কামাল পাশা চৌধুরীর সঞ্চালনায় স্মরণসভায় অন্যদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ছেলে আবুল হাসান চৌধুরী, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান প্রমুখ বক্তব্য দেন।