গোলাম সাকলায়েন
গোলাম সাকলায়েন

পরীমনির সঙ্গে সম্পর্ক, চাকরি হারালেন পুলিশ কর্মকর্তা সাকলায়েন

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপন এ তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।

২০২১ সালের ১৪ জুন ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। সেই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান ডিএমপির তৎকালীন এডিসি সাকলায়েন। ওই ঘটনার মাস দুয়েক পর ৪ আগস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। সেদিন এই নায়িকা ও তাঁর সহযোগী আশরাফুল ইসলাম ওরফে দীপুকে আটক করা হয়। সেই রাতেই বনানী থেকে আটক করা হয় চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও তাঁর ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকে। পরদিন তাঁদের বনানী থানায় হস্তান্তর করে তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলা করা হয়। তখন পরীমনির বাসায় অভিযান নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, ওই অভিযানের তিন দিন আগে তৎকালীন ডিবির এডিসি সাকলায়েনের সরকারি বাসায় প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় কাটান পরীমনি ।

এরপরই ডিএমপি সাকলায়েনকে ডিবি থেকে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) পশ্চিম বিভাগে বদলি করে। এর পাঁচ বছরের মাথায় এসে আজ তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল সরকার।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মো. গোলাম সাকলায়েন, ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সাবেক এডিসি (ডিবি) গুলশান বিভাগে কর্মকালীন বাংলাদেশ পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে নৈতিকতাবহির্ভূত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জড়িয়েছেন। তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ওঠে আসে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এডিসি গোলাম সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধি মোতাবেক ‘অসদাচরণের’ অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এবং তাঁকে কারণ দর্শাতে বলা হয়।

২০২৩ সালের ১৯ মার্চ অভিযোগের জবাব প্রদানপূর্বক ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন সাকলায়েন। ওই মাসের ২৮ তারিখ তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, কারণ দর্শানোর জবাব, ব্যক্তিগত শুনানি এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে গুরুদণ্ড আরোপের সম্ভাবনা থাকায় আনীত অভিযোগগুলো তদন্তে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সাকলায়েনেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি ওই বছরের ১০ মার্চ নোটিশের জবাব দেন।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব, তদন্ত প্রতিবেদন, অপরাধের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনায় এডিসি সাকলায়েনের বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী বিধিমালা মোতাবেক তাঁকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান’ সূচক গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস মোতাবেক গুরুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়। জবাবে কমিশন তাঁকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো গুরুদণ্ড আরোপ করা যায় বলে পরামর্শ দেয়। এরপর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি চলতি বছরের ১৭ জুন অনুমোদন করেন।

আজকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঝিনাইদহের ইন–সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম সাকলায়েনকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) মোতাবেক ‘অসদাচরণ’–এর দায়ে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলায় প্রমাণিত অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় একই বিধিমালার ৪ (৩) (খ) বিধি মোতাবেক তাঁকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ সূচক গুরুদণ্ড প্রদান করা হলো।