‘ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া চালু হয়ে গেছে’—বলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একটি ভিডিওতে এমন কথা বলতে শোনা যাচ্ছে তাঁকে। পাশে থাকা তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানও বলছিলেন, ‘যাঁরা এখনো পাননি, তাঁরা কমেন্ট করেন। সবাই পাবেন।’ ভিডিওটিতে পেছনে তাঁদের মেয়ে জাইমা রহমানকেও দেখা যাচ্ছে।
ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার করার পর শেয়ার করার অনুরোধও করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভিডিও ২৯ লাখের বেশি বার দেখা হয়, শেয়ার হয় ৪১ হাজার বার, পোস্টের নিচে মন্তব্য ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
কিন্তু যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, ভিডিওটি আসল নয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় সেই অনুষ্ঠানে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েও ছিলেন।
ভিডিওটি ভালোভাবে দেখলে তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানের কথা বলা ও নড়াচড়ায় অসংগতি ধরা পড়ে। যাচাই করে দেখা যায়, ওই অনুষ্ঠানে তোলা স্থিরচিত্র ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে।
এর আগে ‘শুক্রবার থেকেই ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে পাবেন ৫০০০ টাকা’—এমন ক্যাপশনে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট প্রচার করা হচ্ছে। এসব পোস্টে প্রথম আলোর লোগো যুক্ত করা হয়। একটি ওয়েবসাইটের লিংকও দেওয়া হয়, যেখানে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে।
যাচাই করে দেখা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন কার্যক্রম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। একই সঙ্গে প্রথম আলো এ–সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। প্রথম আলোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন এ রকম বিভ্রান্তিকর বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষও সতর্কবার্তা দিয়েছে। ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান না করতে এবং এ ধরনের প্রতারণা থেকে সচেতন থাকতে পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃত ঘোষণা কী
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আলোচনায় আসে ফ্যামিলি কার্ড। বিএনপি ভোটে জিতে সরকার গঠনের পর ২৪ ফেব্রুয়ারি জানানো হয়, আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচিটি চালু করা হবে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ১৪টি উপজেলার একটি করে ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বাছাই করা হচ্ছে এবং সেই ওয়ার্ডের প্রতিটি পরিবারের একজন নারী এই কার্ড পাবেন।
মন্ত্রী জানান, এই কার্ডের সুবিধাভোগী হবেন পরিবারের মা বা নারীপ্রধান। এর লক্ষ্য নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, যাতে পুরো পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হয়। আগামী চার মাসে পাইলট কার্যক্রম শেষ করে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি ওয়ার্ডে যোগ্য বিবেচিত প্রত্যেক পরিবারকেই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। বাছাইপ্রক্রিয়ায় কোনো অনলাইন আবেদন বা ঘরে বসে নির্বাচন নয়; বরং মাঠপর্যায়ে ‘ডোর-টু-ডোর’ তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েরা এই সুবিধা পাবেন।
কার্ডপ্রাপ্তরা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন, যা সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। একটি কার্ডে সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। একান্নবর্তী পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা আলাদা সুবিধা পেতে পারেন।
উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা তদারকিতে থাকবেন এবং ভুলত্রুটি এড়াতে দ্বিস্তরবিশিষ্ট যাচাই ব্যবস্থা রাখা হবে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।
আবেদনপ্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান অবস্থা
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোতে ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে। আগ্রহীদের আবেদন পদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট আবেদন ফরম থাকবে, যা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা সরকারের নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালে পাওয়া যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরির কাজও চলছে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় যাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র, রঙিন ছবি এবং সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং অনলাইনে আবেদন বা তাৎক্ষণিক ৫০০০ টাকা পাওয়ার দাবিটি ভিত্তিহীন।