
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু একজন বিচারকের ভয়, পক্ষপাত, চাপ বা হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেছেন, এই স্বাধীনতা টেকসই করতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয় কাঠামো, সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন থাকতে হবে।
আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আইন বক্তৃতায় সৈয়দ রেফাত আহমেদ এ কথা বলেন। এতে মূল বক্তা ছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম ‘বিয়ন্ড জুডিশিয়াল ইনডিপেনডেন্টস: কনস্টিটিউশনাল আইডেনটিটি অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট ফর ইনস্টিটিউশনাল অটোনমি ইন বাংলাদেশ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এই বক্তৃতার আয়োজন করে।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতায় সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয় ও ইতিহাস, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ আরও বলেন, সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে শুধু বিচারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার অর্থে দেখলে হবে না। সাংবিধানিক স্বাধীনতা তখনই টেকসই হয়, যখন বিচারিক ক্ষমতার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সেই স্বাধীনতা ধরে রাখার মতো প্রয়োজনীয় কাঠামো, সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন থাকে।
বিচারকের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বলেন, একজন বিচারক স্বাধীন হতে পারেন, অথচ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচারবিভাগ পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসিত না–ও হতে পারে। বিচার বিভাগে নিয়োগ যদি বাইরের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পছন্দের ওপর নির্ভরশীল থাকে, বিচার বিভাগের প্রশাসন যদি কাঠামোগতভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা যদি বিচার বিভাগের পরিকল্পনাকে অন্য একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে, তাহলে শুধু বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা পুরো সাংবিধানিক দায়িত্ব বহন করতে পারে না।
সৈয়দ রেফাত আহমেদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বলতে এমন কাঠামো, কর্তৃত্ব ও বাস্তব সক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে বিচার বিভাগ বিচারিক ক্ষমতার সংরক্ষণ ও প্রয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলো পরিচালনা করতে পারে।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না বলে সতর্ক করেন সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তাঁর ভাষায়, একটি স্বায়ত্তশাসিত বিচার বিভাগ এমন হতে পারে না, যাকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। স্বাধীনতার সঙ্গে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সমন্বয় থাকতে হবে। বিচার বিভাগের জবাবদিহি হতে হবে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে নয়, আইনের কাছে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয় প্রসঙ্গে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সাংবিধানিক আদর্শের অভাব খুব কমই ছিল। কিন্তু বারবার যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা হলো এসব আদর্শকে স্থায়ীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো যথেষ্ট স্বাধীন, দৃঢ় ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বয়ান দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান একইভাবে দ্রুত তৈরি করা যায় না। প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ধৈর্য, ধারাবাহিকতা, নিয়ম, সংযম, স্মৃতি এবং সর্বোপরি এই গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন, কখনো কখনো একটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পাওয়া ব্যক্তিকেও ‘না’ বলতে হতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, ওই সময় সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে, তা সামনে এসেছিল। একই সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যাতে সাংবিধানিক মূল্যবোধ সাময়িকভাবে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের পর প্রশ্নটি শুধু ছিল না—কে ভিন্নভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আরও কঠিন প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতাকেই কীভাবে আরও টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়।
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে শুধু সাংবিধানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে টেকসই করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে তিনি বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি ওই সচিবালয়কে শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখেননি; বরং অর্থবহ বিচারিক স্বাধীনতার দিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। বিচারক নিয়োগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈধতা টিকে থাকতে হলে নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে মেধা, সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছ মানদণ্ডের ভিত্তিতে; ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নয়।
তবে স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতা কখনো অদক্ষতা, দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারী প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের ঢাল হতে পারে না। জবাবদিহি থাকতে হবে, তবে সেই জবাবদিহির মানদণ্ড ও প্রক্রিয়াও হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্থায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, কোনো সংস্কার যদি শুধু একজন সংস্কারকের মেয়াদকাল পর্যন্ত টিকে থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়; সেটি সাময়িক প্রশাসন। তাঁর মতে, চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও টিকে থাকবে। এর মাধ্যমে এমন একটি ‘শুভচক্র’ তৈরি হবে, যা নিজেই নিজের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করবে।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, একটি রাষ্ট্রকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন করে গড়ে তোলা যায় না। রাজনৈতিক ক্ষমতা যখনই এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়, তখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে উদ্ভাবন করা যায় না। প্রতিষ্ঠানের স্মৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আদালতের স্মৃতি থাকে, সংসদের স্মৃতি থাকে, সরকারি প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও স্মৃতি থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বারবার রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়, পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, অধীনস্থ করা হয় অথবা একের পর এক দায়িত্বশীল ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠন করা হয়, তখন সেই প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি হারিয়ে যায়।
বক্তৃতার শেষ অংশে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সাংবিধানিকতার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে শুধু কতবার সাংবিধানিক আদর্শ ঘোষণা করা হলো, তার ওপর নয়; বরং সেই আদর্শ সংরক্ষণ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান কতটা গড়ে তোলা যায়, তার ওপর। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমাদের বলে দেয়—কী সুরক্ষিত রাখতে হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আমাদের বলে দেয়—কীভাবে সেই সুরক্ষা টেকসই করা যায়।’
সাবেক প্রধান বিচারপতির মতে, ২০২৪ সালের ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাজনৈতিক বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সব সময় এক বিষয় নয়। একটি সাংবিধানিক মুহূর্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে একমাত্র প্রতিষ্ঠানগুলোই।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সংস্কার-অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কীভাবে ভিন্নভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, তা নয়; বরং কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, যাতে ক্ষমতাই সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম। এতে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক।