এম হুমায়ুন কবির
এম হুমায়ুন কবির

ভূরাজনীতি

সক্ষম রাষ্ট্র, কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা যেমন তার বৈদেশিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও জাতীয় নীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। গত কয়েক বছরে এ দুই ধরনের পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে, যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।

বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোভিড–১৯ বৈশ্বিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা উন্মোচন করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি, খাদ্য ও সরবরাহশৃঙ্খলের নিরাপত্তাকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার চরিত্র বদলে দিয়েছে। অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি এখন পরস্পরকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে।

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিবাসন ও আঞ্চলিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রই এখন আরও কৌশলগত। ফলে পররাষ্ট্রনীতি আর শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক রূপান্তর, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সরবরাহশৃঙ্খলে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বদলেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনীতি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রের সামনে নতুন নীতিগত প্রশ্ন তুলেছে। এসবের উত্তর শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিতে নয়, পররাষ্ট্রনীতিতেও খুঁজতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা নয়; বরং বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাফল্য আজ আর যৌথ বিবৃতি বা উচ্চপর্যায়ের সফরের সংখ্যায় নয়; বরং সেই সম্পর্ক দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

অতএব বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনো একক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি সক্ষম রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যা পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিবেশে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে এবং নতুন সুযোগকে বাস্তব অর্জনে রূপ দিতে পারবে।

অংশীদারত্বের নতুন ভাষা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটছে অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। কয়েক দশক ধরে উন্নয়ন সহযোগিতা, স্বল্প সুদে ঋণ ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ছিল আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার প্রধান ভিত্তি। এলডিসি মর্যাদা সেই সুযোগ তৈরি করেছিল; কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী দেশ নয়, সক্ষম অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

এর অর্থ শুধু আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়া নয়; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধরনও বদলে যাওয়া। উন্নয়ন সহযোগিতার পরিবর্তে গুরুত্ব পাবে বিনিয়োগ, যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বাজারে প্রতিযোগিতা। ফলে কূটনীতিকদেরও নতুন বাস্তবতার উপযোগী আলোচনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

এখানেই অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক শক্তি আন্তর্জাতিক দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়ায়; আবার কার্যকর কূটনীতি নতুন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে এ দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমে কমে আসছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের আরেকটি তাৎপর্য হলো, ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব শুধু বাংলাদেশের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে না; বাংলাদেশ কী মূল্য সংযোজন করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। আঞ্চলিক সংযোগে ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনশক্তি এবং বৃহৎ ভোক্তাবাজার—এসবই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এগুলো কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে পারলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক লাভজনক হবে।

কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক না হলে, প্রতিষ্ঠান কার্যকর না হলে, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত না হলে দক্ষ কূটনীতিও দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না

ভবিষ্যতের কূটনীতিতে সম্পর্কের সাফল্য কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেই সম্পর্ক দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারে, তার ওপর।

তাই পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু নতুন অংশীদার খুঁজে পাওয়া নয়; বরং এমন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যার সঙ্গে অংশীদারত্বকে অন্য দেশগুলোও মূল্যবান বলে মনে করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক স্বার্থ ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকেও গ্রহণের মনোভাব থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক অবদানের ভিত্তিতে নতুন অংশীদারত্বের ভাষা গড়ে তুলতে হবে।

তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতিই যেন একটি দেশের কূটনৈতিক শক্তির প্রধান পরিচয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে কোনো রাষ্ট্র কতটা বিশ্বাসযোগ্য, অর্থনৈতিকভাবে কতটা সক্ষম এবং কৌশলগতভাবে কতটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার ওপর। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সামনেও এই তিনটি প্রশ্ন ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের সংস্কৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বানুমানযোগ্যতাই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি করে।

কোনো দেশ শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন অংশীদার ও কৌশলগত সহযোগীরা এমন রাষ্ট্রের সঙ্গেই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলে, যার নীতি স্থিতিশীল এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকর। ফলে বাংলাদেশের প্রথম চ্যালেঞ্জ বাইরের বিশ্বের কাছে নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়; বরং দেশের ভেতরে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলা, যা আন্তর্জাতিক আস্থাকে স্থায়ী করবে।

দ্বিতীয়ত, এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে বিশেষ সুবিধার পরিবর্তে প্রতিযোগিতাই হবে প্রধান নিয়ামক। আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নত করতে এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে হবে।

এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকাও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। কূটনীতির লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা নয়; নতুন বাজার সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি সহযোগিতা, দক্ষ মানবসম্পদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অন্যতম কাজ। অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক কার্যকারিতা এখন একটি অন্যটির পরিপূরক।

তৃতীয়ত, বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে; দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলও তার বাইরে থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করবে, তেমনি সতর্কতারও দাবি রাখবে। কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; আবার অপ্রয়োজনীয় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়াও জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্য ছিল সবার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। পরিবর্তিত বিশ্বেও সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা অটুট রয়েছে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ নিরপেক্ষ থাকা নয়; বরং প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করার সক্ষমতা বজায় রাখা। আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র অন্যের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে নয়, নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।

এই তিনটি চ্যালেঞ্জ পরস্পর-সম্পর্কিত। বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে ওঠে না, শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া কৌশলগত স্বাধীনতা টেকসই হয় না, আর সেই স্বাধীনতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পরিবেশও নিশ্চিত করা কঠিন। তাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য কোনো একটি সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া নয়; বরং এমন একটি সক্ষম রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে এই তিন শক্তি একে অন্যকে সমর্থন ও শক্তিশালী করে।

রাষ্ট্র শক্তিশালী হলে কূটনীতিও শক্তিশালী হয়

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনায় অনেক সময় আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহই পুরো মনোযোগ দখল করে নেয়। কোন দেশ কার কাছাকাছি গেল, কোথায় কোন চুক্তি হলো বা কোন সফর কতটা সফল হলো—এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য–ব্যর্থতার পূর্ণ ব্যাখ্যা এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

বাস্তবতা হলো, কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক না হলে, প্রতিষ্ঠান কার্যকর না হলে, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত না হলে দক্ষ কূটনীতিও দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। বিপরীতে আত্মবিশ্বাসী ও সুশাসিত রাষ্ট্র তুলনামূলক সীমিত সম্পদ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে।

এ কারণেই পররাষ্ট্রনীতিকে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, নৌপরিবহন, কৃষি, পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রের অগ্রগতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তি নির্ধারণ করে। বিশ্বের সঙ্গে একটি দেশের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে শুধু সে কী চায় তার ওপর নয়; বরং সে কী দিতে পারে এবং কতটা নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপরও।

বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যখন আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতির আকার, তরুণ জনসংখ্যা, আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডায় সক্রিয় উপস্থিতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে; কিন্তু সম্ভাবনা নিজে থেকেই সাফল্যে রূপ নেয় না। তার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কূটনীতি এই প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে এগিয়ে নিতে পারে, তার বিকল্প হতে পারে না।

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কোনো একক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের নয়; বরং রাষ্ট্র হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা, সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নির্ধারণ ও রক্ষা করা যায়। সেটি সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হবে।

পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অন্যদের অবস্থান নির্ধারণ করা নয়; নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করা। পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত ভিত্তি একটি বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি এবং দূরদর্শী রাষ্ট্র পরিচালনা। সে কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি একটি সক্ষম রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যার কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাবে।

  • এম হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি; সাবেক রাষ্ট্রদূত