১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার ওপর নির্মিত ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান‍ে অতিথিরা। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার ওপর নির্মিত ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান‍ে অতিথিরা। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে

বেঙ্গলে হয়ে গেল গণহত্যার প্রামাণ্যচিত্রের বিশেষ প্রদর্শনী

আলোর মিছিল দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রামাণ্যচিত্রটি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অসংখ্য মানুষ ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্বালন করে সেই আলো হাতে যাত্রা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দিকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপর চালিয়েছিল নৃশংস গণহত্যা। সেই গণহত্যার কথা স্মরণ করে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে শুরু হয়েছিল ওই আলোর মিছিল।

মিছিলটি দিয়েই শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে নির্মাতা কাওসার চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’। আজ মঙ্গলবার প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠান হলো ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। প্রামাণ্যচিত্রটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান প্রমিতি প্রভা শ্রুতিলোকন কেন্দ্র ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই আয়োজন করে। মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর পরে এসেও প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসা সেই কালরাতের বর্বর গণহত্যার দৃশ্য দর্শকদের হৃদয় বেদনাবিধুর করে তোলে। প্রত্যক্ষদর্শী আর স্বজনহারাদের শোকাবহ বিবরণে চোখ ভিজে যায় অনেকের। মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় আবেগময় পরিবেশ।

শুরুতেই বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী দর্শকদের জানান, মহান স্বাধীনতা দিবসের স্মৃতিময় মাসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে এই প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনীটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। বারবার স্মরণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন।

নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা কাওসার চৌধুরী জানান, তিনি এই প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাণ শুরু করেছিলেন ১৯৯৬ সালে। শেষ করতে ৮ বছর সময় লেগেছে। প্রামাণ্যচিত্রটির দৈর্ঘ্য ৪৩ মিনিট। প্রথম প্রিমিয়ার প্রদর্শনী হয়েছিল ২০০১ সালে। যেহেতু রাতের ঘটনা, সে কারণে দীর্ঘ সময় ধরে রাতেই প্রামাণ্যচিত্রটির চিত্রগ্রহণসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছিল। এখন এই প্রামাণ্যচিত্রের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এতে প্রামাণ্যচিত্রটির একটি কিউআর কোড যুক্ত করা হয়েছে। এটি স্ক্যান করে যে কেউ বিনা মূল্যে প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে পাবেন।

প্রামাণ্যচিত্রটি নিয়ে আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর পরে জাতির এই মহান অর্জনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্রের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যাঁদের বয়স এখন ৭০ বছরের বেশি, বা যাঁদের মনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রয়েছে, তাঁদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে এর বিবরণ দিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, একটি মহল থেকে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের মহিমা ম্লান করে, গণহত্যার ভয়াবহতা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কাজেই তাদের এই দুরভিসন্ধি প্রতিহত করে নতুন প্রজন্মকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। সাহস করে সবাইকে সত্য কথাটি সামনে এসে বলতে হবে।

কালরাতের শহীদ অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার কন্যা মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বলেন, ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের ২৫ বছর পরও মিলনায়তনভর্তি দর্শক উপস্থিত হয়েছেন, এটা খুবই ভালো লাগার বিষয়। তিনি বলেন, শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্নভাবে ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চক্রান্ত চলছে। সেই রাতে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের’ যুদ্ধ হয়েছিল বলে একটি বয়ান দেওয়া হচ্ছে। এসব অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসা গণহত্যার দৃশ্য ও বিবরণ এখনো আমাদের বেদনায় মুহ্যমান করে তোলে। কাওসার চৌধুরীর মতো আরও অনেক নির্মাতার এমন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের এই কাজে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রামাণ্যচিত্রটি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের চার শিক্ষার্থী তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইউল্যাবের জাহারা নুসরাত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদনান মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পাওয়া আলম ও বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের মামুন সোবহানি।

নির্ধারিত আলোচনার পরে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মানজারে হাসীন মুরাদ ও শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান আফিস মুনীর উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।