
দেশজুড়ে ৮০টি সমিতির মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। পাঁচ দশক ধরে তুলনামূলক কম দামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিচ্ছে সংস্থাটি। আরইবিতে লোকসানে থাকা সমিতিগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয় লাভজনক কয়েকটি সমিতির আয়ে। কিন্তু এখন নিজেদের আর্থিক ঘাটতি কমাতে আরইবির ওপর চাপ তৈরি করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেওয়া নতুন প্রস্তাবে পিডিবি বলেছে, আরইবির লাভজনক সমিতিগুলোর জন্য তারা পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায়।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আরইবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে ৬ টাকা ২৪ পয়সায়। অথচ খুচরা পর্যায়ে গড়ে তারা বিক্রি করছে প্রায় সাড়ে আট টাকায়। প্রতি ইউনিটে এত বেশি আয় আর কোনো বিতরণ সংস্থা করে না। সর্বোচ্চ ৮ টাকা ৫৮ পয়সায় বিদ্যুৎ কেনে ডেসকো, আর বিক্রি করে ১০ টাকা ৪০ পয়সায়।
তবে আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে প্রকৃত মুনাফা করেছে মাত্র ১৩টি সমিতি। আর চারটি সমিতি লোকসান করেনি। বাকি ৬৩টি সমিতি টিকিয়ে রাখতে লাভজনক সমিতি থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। পিডিবির প্রস্তাব কার্যকর হলে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের বর্তমান কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। এটি সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশীজনদের নিয়েই পিডিবির প্রস্তাব যাচাই–বাছাই করা হবে। এরপর ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
লাভের সমিতিগুলো আলাদা হোক, চায় পিডিবি
পিডিবির দাবি, অন্য বিতরণ সংস্থার চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ পায় আরইবি। তাই আরইবি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে গড় পাইকারি দাম কমে যায়। প্রতি ইউনিটের পাইকারি দাম এখন ৭ টাকা ৪ পয়সা হলেও পিডিবি পাচ্ছে ৬ টাকা ৯৯ পয়সা। ভর্তুকির বেশির ভাগ খরচ হয় আরইবির পেছনে।
২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশীজনদের নিয়েই এই প্রস্তাব যাচাই–বাছাই করা হবে। এরপর ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।জালাল আহমেদ, চেয়ারম্যান, বিইআরসি
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আরইবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে ৬ টাকা ২৪ পয়সায়। অথচ খুচরা পর্যায়ে গড়ে তারা বিক্রি করছে প্রায় সাড়ে আট টাকায়। প্রতি ইউনিটে এত বেশি আয় আর কোনো বিতরণ সংস্থা করে না। সর্বোচ্চ ৮ টাকা ৫৮ পয়সায় বিদ্যুৎ কেনে ডেসকো, আর বিক্রি করে ১০ টাকা ৪০ পয়সায়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আরইবির ২১টি সমিতির গ্রাহক কাঠামো অনেকটাই ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির মতো। এসব সমিতিতে প্রতি ইউনিটে গড় বিল আসে ৯ টাকা ৩৬ পয়সা। অন্যদিকে বাকি ৫৯টি সমিতিতে গড় বিল ৭ টাকা ৮৫ পয়সা। তাই এই ২১টি সমিতিকে আলাদা করে শহরাঞ্চলের মতো পাইকারি দাম নির্ধারণ করলে পিডিবির আয় বাড়বে।
পিডিবির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, খুচরা পর্যায়ে সব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম একই। তবে পাইকারি দাম বিতরণ সংস্থা অনুসারে আলাদা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতির ৬৩ শতাংশই হয়েছে আরইবিকে কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার কারণে। আগামী বছর এই চাপ আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বোঝা কমাতেই আরইবি থেকে আয় বাড়ানোর উপায় বের করা হয়েছে। ভর্তুকির চাপ কমলে গ্রাহকের ওপর বাড়তি দামের চাপ তৈরি করা লাগবে না।
আরইবির আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছরে পরিচালন লোকসান কমাতে ১৩টি সমিতির মুনাফা থেকে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা ৬৫টি সমিতিকে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে লাভজনক সমিতিগুলোই পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামোকে টিকিয়ে রেখেছে। মুনাফায় থাকা সমিতিগুলোর বেশির ভাগই ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলগুলোয় অবস্থিত।
কেন্দ্র ভাড়া ও ভর্তুকির চাপে পিডিবি
পিডিবি বলছে, তরল জ্বালানি ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের জন্য মাসে গড়ে ১২ মার্কিন ডলার (১ হাজার ৪৭৬ টাকা) ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ২৫ ডলার (৩ হাজার ৭০ টাকা) পর্যন্ত কেন্দ্র ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া গ্রিড লাইন থেকে সরাসরি বড় গ্রাহককে সংযোগ দিলেও ডিমান্ড চার্জ (বিদ্যুৎ নিলে বা না নিলেও প্রতি মাসের ন্যূনতম বিল) পায় না পিডিবি। বিতরণ সংস্থার কোনো সেবা যুক্ত না থাকলেও তারা নিচ্ছে ডিমান্ড চার্জ। এটি পিডিবিকে পরিশোধ করা হলে ঘাটতি কমবে।
পিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আরইবির অধীনে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের ১৯টি বড় সংযোগ প্রক্রিয়াধীন। এগুলো চালু হলে আরও ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ পিডিবির ওপর তৈরি হবে।
সামনে আরইবির এমন সংযোগ বাড়তে থাকবে। অধিকাংশ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আরইবি। এসব বড় গ্রাহকের সংযোগ ৩৩ কেভির পরিবর্তে ১৩২ কেভি থেকে দেওয়া হলে প্রতি ইউনিটে পিডিবির ভর্তুকি কমবে ২ টাকা ২৪ পয়সা। কেননা, ৩৩ কেভির চেয়ে ১৩২ কেভি থেকে পাইকারি দাম বেশি।
বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা বোঝাতে চারটি বড় প্রকল্পের উদাহরণ দিয়েছে পিডিবি। এর মধ্যে অন্যতম জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প।
আরইবি চলে ক্রস সাবসিডি দিয়ে। মুনাফায় থাকা সমিতিগুলোই অন্য সমিতিকে চালিয়ে নেয়। তাই ২১টি সমিতির জন্য আলাদা দামের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিজেদের লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের দায় সবার ওপর চাপাচ্ছে পিডিবি।এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার এই প্রকল্পে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারলে বছরে তাদের আয় হবে ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। কিন্তু আরইবির মাধ্যমে সরবরাহ করা হলে সেই আয় কমে দাঁড়াবে ৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকায়। সরাসরি দিলে পিডিবি ডিমান্ড চার্জ পাবে ৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৯০৮ কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছে পিডিবি।
বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে বাড়বে ঘাটতি
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পর ৬ মে বিইআরসির কাছে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে আরইবি।
সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে তাদের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ কারণে খুচরায় দাম অন্তত ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া পাইকারি দাম ও হুইলিং চার্জ বাড়লে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ানো লাগবে।
আরইবির কর্মকর্তা বলছেন, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আরইবি বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর প্রায় ৭৭ শতাংশ। জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৫৭ শতাংশই তাদের আওতায়। আরইবির ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৫৬ শতাংশ যায় আবাসিক গ্রাহকদের কাছে, যাঁদের বেশির ভাগই কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দরিদ্র মানুষ। লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের এসব গ্রাহককে কম দামে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে লোকসান গুনতে হয় সংস্থাটিকে। এবার এই দুই শ্রেণির গ্রাহকের দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। ফলে পাইকারি দাম বাড়ানোর কারণে আরইবির খরচ বাড়লেও আয় বাড়বে না।
আরইবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের বাইরে গ্রাহক নিজেই ভর্তুকি দেয়। যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তারা বাড়তি দামে বিদ্যুৎ বিল দেয়। আবাসিকে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা। তার মানে, পিডিবির উৎপাদন খরচ সাড়ে ১২ টাকার চেয়ে বাড়তি দাম দেয় এসব গ্রাহক। এই বাড়তি দামই কম ব্যবহারকারীদের জন্য ভর্তুকি হিসেবে যায়। একইভাবে আরইবির ২১টি সমিতির বাড়তি আয় থেকে অন্য সমিতিগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। এটি ‘ক্রস সাবসিডি’ নামে পরিচিত, যা ভারসাম্য তৈরি করে।
আরইবির আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছরে পরিচালন লোকসান কমাতে ১৩টি সমিতির মুনাফা থেকে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ৬৫টি সমিতিকে। বাস্তবে লাভজনক সমিতিগুলোই পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামোকে টিকিয়ে রেখেছে। মুনাফায় থাকা সমিতিগুলোর বেশির ভাগই ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলগুলোয় অবস্থিত।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আরইবি চলে ক্রস সাবসিডি দিয়ে। মুনাফায় থাকা সমিতিগুলোই অন্য সমিতিকে চালিয়ে নেয়। তাই ২১টি সমিতির জন্য আলাদা দামের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিজেদের ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের দায়’ সবার ওপর চাপাচ্ছে পিডিবি।