সপ্রাণের প্রতিবেদন

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়গুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কার্যকর কাঠামোগত সুরক্ষার অভাব এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন সপ্রাণের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার  সংগঠনটি ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্বাচনকালীন সহিংসতা (২০০১-২০২৪): একটি কাঠামোগত পর্যালোচনা ও বর্তমান ঝুঁকি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায় সংগঠনটি।

সপ্রাণের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবাধিকারের বিষয় নয়, বরং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আগাম ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

সপ্রাণের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, উচ্ছেদ, শারীরিক আক্রমণ, বসতবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা এবং জমি দখলের মতো ঘটনার শিকার করা হয়।


প্রতিবেদনে যা আছে

প্রতিবেদনটি ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের সময়কালকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়েছে। তথ্যসূত্র হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর আর্কাইভ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণের ১০ দিন আগে থেকে শুরু করে ভোটের পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত সময়কে বিশ্লেষণের আওতায় আনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সহিংসতার ধরন অনুযায়ী তথ্য শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে—শারীরিক আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, যৌন সহিংসতা এবং ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত ঘটনা হিসেবে।

সপ্রাণ জানায়, অতীতের তুলনায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সহিংসতার ধরন কিছুটা ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের উত্তেজনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন করে ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। গুজব, পুরোনো ভিডিও ও আবেগপ্রবণ পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বিরোধকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ দিচ্ছে। এ কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার বদলে আগাম প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দুটি প্রধান ঝুঁকিপ্রবণ করিডর লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি উত্তরবঙ্গ করিডর—রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটকে ঘিরে। অন্যটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডর—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এসব এলাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ঘনবসতি, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে।

দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ

গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০১ সালের নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে। ওই সময়ে ৭৮টি বড় ধরনের ঘটনার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, যা এই সময়সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ঘটনার সংখ্যা ওঠানামা করলেও হামলার ধরন আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও পরিকল্পিত হয়েছে।

সপ্রাণ জানিয়েছে, সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল সরাসরি শারীরিক আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড। প্রায় ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনা ছিল মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতা, যার মধ্যে প্রাণনাশের হুমকি, এলাকা ছাড়ার আলটিমেটাম ও জমি দখল অন্তর্ভুক্ত। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ঘটনা ছিল যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যার মধ্যে ২০১৮ সালের সুবর্ণচরের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সপ্রাণের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতার মাত্রা নির্বাচনের দিনের তুলনায় বেশি থাকে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সংঘটিত হয়।

এই পটভূমিতে সংগঠনটি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রংপুর, দিনাজপুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা, সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো, অনলাইন গুজব নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল মনিটরিং ও ফ্যাক্ট চেক জোরদার করা এবং প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করা।