
সরস্বতীপূজার মণ্ডপের পুরোহিত প্রথমে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ভক্তদের শুদ্ধ করে নিচ্ছেন। চলছে ঢাক-কাঁসরের বাদ্য। ভক্তদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ফুল, দূর্বা, বেলপাতা ও তুলসীপাতা। সেসব নিয়ে করজোড়ে দেবীর প্রতিমার সামনে প্রার্থনায় বসছেন ভক্তরা। এরপর ভক্তরা পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন। এভাবে অঞ্জলি নেওয়ার পর প্রসাদ গ্রহণ করে উপোস ভাঙেন ভক্তরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে ৭৬টি মণ্ডপের সামনেই আজ শুক্রবার সকালে এমন চিত্র দেখা যায়। জগন্নাথ হলে সরস্বতীপূজার অঞ্জলি নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দুসম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার মানুষও আসেন।
অঞ্জলি গ্রহণ ছাড়াও ঢাক, ঘণ্টা, কাঁসর ও শঙ্খের বাদ্যে মুখর ছিল জগন্নাথ হলের পূজামণ্ডপগুলো। এ ছাড়া মণ্ডপে মণ্ডপে ধূপ ও প্রদীপের আরতি যেমন আছে, তেমনি আছে উলুধ্বনির সুর।
সরস্বতীপূজা উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে আজ পুণ্যার্থী ও সাধারণ মানুষের ছিল বিপুল উপস্থিতি।
জগন্নাথ হলের মাঠে আজ পূজা দেখতে আসেন শতাব্দী পুরকায়স্থ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কাজের সূত্রে সিলেটে থাকেন। স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন। বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। গতকাল তিনি ঢাকায় এসেছেন। আজ স্বামী ও বোনকে নিয়ে পূজা দেখছেন।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জের খেজুরবাগ এলাকা থেকে স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে সরস্বতীপূজা দেখতে এসেছেন টুম্পা সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নবাবপুর স্কুলে সরস্বতীপূজার অঞ্জলি নিয়েছেন। তারপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ঘুরতে এসেছেন। কারণ, এখানে একসঙ্গে অনেক সরস্বতীপূজা দেখা যায়, যা অন্য কোথাও দেখা যায় না।
জগন্নাথ হলের সরস্বতীর প্রতিমায় বৈচিত্র্য রয়েছে। বিশেষ করে পুকুরের মাঝের সরস্বতীর প্রতিমাটি প্রতিবছরই দৃষ্টি কাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এ ছাড়া এবার আলোচনায় এসেছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সরস্বতীর প্রতিমাটিও, যা বর্তমান সময়কে ধারণ করেছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সরস্বতীর প্রতিমায় দেখা যায়, দেবীর দুই হাতে দুটি বই। একটি বইয়ে লেখা, ‘আ হিস্ট্রি অব সুফিজম ইন বেঙ্গল’। অন্যটিতে লেখা, ‘মব কালচার অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’। দেবীর আরেক হাতে একটি একতারা। মব যখন আক্রমণ করে ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়ার পর একটি বহুতল ভবনের যে অবস্থা দাঁড়ায়, সেই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সরস্বতীর প্রতিমার পেছনের অবকাঠামোতে।
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবাশীষ পাল প্রথম আলোকে বলেন, জগন্নাথ হলে এবার ৭৬টি পূজা হচ্ছে। আগামীকাল শনিবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের সরস্বতী পূজার আয়োজন শেষ হবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। শান্তিপূর্ণভাবেই পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
হিন্দুসম্প্রদায়ের বিশ্বাসমতে, সরস্বতী জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী। দেবীর এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তাঁকে বীণাপাণিও বলা হয়। জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী হওয়ায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় হিন্দুসম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা সরস্বতীপূজার আয়োজন করে থাকেন। দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীর ফার্মগেটের তেজগাঁও কলেজেও সরস্বতীপূজা হয়েছে।
হিন্দুসম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব এটি। সন্তানেরা যেন জ্ঞান ও বিদ্যায় ভালো করতে পারে, সেই কামনায় হিন্দুসম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে এই পূজার আয়োজন হয়ে থাকে। অন্যান্যবারের মতো এবারও সারা দেশেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির ও বাড়িতে সরস্বতীপূজার আয়োজন করা হয়েছে।