
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আগামীকাল শুক্রবার শুরু হচ্ছে। এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি দুর্গাপূজা হচ্ছে। গত বছর ৩২ হাজার ৩৫১টি দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল।
ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ২৬১টি পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। সে হিসাবে ঢাকা মহানগরে তিনটি পূজা কমেছে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি যৌথভাবে আজ বৃহস্পতিবার সকালে এসব তথ্য জানিয়েছে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সংগঠন দুটি এই তথ্য জানায়। মতবিনিময়ে বলা হয়, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে, গমন নৌকায়।
মতবিনিময় সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে কয়েকটি জেলায় প্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। জেলাগুলো হলো সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইল। ফরিদপুরে ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে। সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা-লুটপাট হয়েছে। নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয়ে ডাকাতির খবর পাওয়া গেছে, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দুর্বৃত্তদের অনেকেই ধরা পড়েছে।
শারদীয় দুর্গাপূজার মধ্যে এমন হামলা দেখতে চান না বলে উল্লেখ করেন শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ নয়, রাষ্ট্রের আলোকিত চেতনা ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে এই সহিংসতার অবসান ঘটাতে হবে। শুধু দুর্গাপূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবলে হবে না। বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়তে চাইলে ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। দুর্বৃত্তদের বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমনটা দেখতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সময়সূচি
মতবিনিময় সভায় দুর্গাপূজার সময়সূচি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার দুর্গাপূজার শুভ বোধন। আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠী।
এবার মহাসপ্তমী দুই দিন-১৭ ও ১৮ অক্টোবর (শনি ও রোববার)। ১৯ অক্টোবর (সোমবার) মহা অষ্টমী। ২০ অক্টোবর (মঙ্গলবার) মহানবমী। ২১ অক্টোবর (বুধবার) বিজয়া দশমী-বিসর্জন। সেদিন বেলা তিনটায় ঢাকাসহ সারা দেশে বিজয়ার শোভাযাত্রা।
পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে তিনটি প্রধান কারণে আন্তরিকভাবে অভিনন্দিত করতে চায় তারা। প্রথমত, আগে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি ছিল এক দিন। দীর্ঘদিন ধরে এই ছুটি তিন দিন করার দাবি জানানো হচ্ছিল। দুই বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ছুটি এক দিন বাড়ানো হয়। এবার প্রধানমন্ত্রী ছুটি আরও এক দিন বাড়িয়ে মোট তিন দিন করেছেন। একটি ছুটি দশমীর পর দিন পড়েছে। তবে সেটিকেও পূজার ছুটি বলা হয়েছে। আগামী বছর শারদোৎসবে সরকারি বিধিবদ্ধভাবে তিন দিনের ছুটি ঘোষিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় কারণে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাঙালির দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়েছিল। রাষ্ট্রাচারে সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সব ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পাঠের ধারা চালু হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাতে ছেদ পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে কয়েকটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সব ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়েছে। এটা রাষ্ট্রাচারে স্থায়ীভাবে যুক্ত হবে বলে আশা পরিষদ ও কমিটির।
তৃতীয় কারণে পরিষদ ও কমিটি বলে, প্রধানমন্ত্রী জন্মাষ্টমীর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার।’ তারা চার দশক ধরে জাতীয় ঐক্য ও সমঅধিকারের লক্ষ্যে যে স্লোগান তুলেছিল, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, গত বছর যে ঘটনাগুলোয় মামলা হয়েছিল, তার অধিকাংশতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁরা পাহারামুক্তভাবে পূজা করতে চান। কিন্তু দেশের বাস্তবতা, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিবছরই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিবছরই কিছু কিছু প্রতিমা ভাঙার ঘটনা ঘটে। তবে এখন একটা আশার আলো হচ্ছে, অতীতে যেসব ঘটনা ঘটত, কোনো বিচার হতো না। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতো না। এখন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।