আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ট্রাইব্যুনালে এসআই মিজবাহ

‘ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা আছে, তুমি অস্ত্র–গুলি সরবরাহ করো’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে চায়না রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান দিয়েছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন যাত্রাবাড়ী থানার অস্ত্রাগারের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার মিজবাহ উদ্দিন।

এসআই মিজবাহ বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানার অস্ত্রাগারে অবস্থানকালে বেতার অপারেটরের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান আন্দোলন দমনে চায়না রাইফেল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার পর তাঁরা অস্ত্রাগার থেকে চায়না রাইফেল ও চায়না রাইফেলের গুলি ইস্যু করা শুরু করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ আজ মঙ্গলবার এসআই মিজবাহ জবানবন্দি দেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় শহীদ ইমাম হাসানকে (তাইম) হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৮তম সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন তিনি।

২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থানার অস্ত্রাগার রক্ষণাবেক্ষণের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এসআই খন্দকার মিজবাহ উদ্দিন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত।

জুলাই আন্দোলনের সময়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দিতে এসআই মিজবাহ বলেন, যাত্রাবাড়ী থানার বিভিন্ন পয়েন্টে যখন বিভিন্ন সিনিয়র অফিসার স্যারেরা ফোর্স নিয়ে যেতেন, প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন সময় তাঁরা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে, মোবাইলে অথবা কোনো পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে ২০০ থেকে ৩০০টি গোলাবারুদ চাইতেন। সে সময় তিনি বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সরবরাহ করবেন কি না, এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান, তৎকালীন ডিসি ইকবালকে (ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন) জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বলেন, ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা আছে, তুমি অস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করো। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অস্ত্রাগারে আসা পুলিশ সদস্যের স্বাক্ষর রেখে গোলাবারুদ সরবরাহ করতেন।

‘অস্ত্রের হিসাব মেলাতে অন্যের নামে খারিজ’

নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পয়েন্টে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সরবরাহ করলেও দিন শেষে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গোলাবারুদের ব্যবহার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারতেন না বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এসআই মিজবাহ। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে গোলাবারুদের সঠিক হিসাব নিরূপণের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হলে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিনি ওসি আবুল হাসানকে অবহিত করেন। আবুল হাসান তাৎক্ষণিক বিষয়টি মোবাইলে ডিসি ইকবালকে জানান। ইকবাল তখন বলেন, ‘কমিশনার স্যার বিষয়টি জানেন, এ বিষয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না। এই গোলাবারুদসমূহ যাত্রাবাড়ী থানার সব অফিসার ও ফোর্সদের মাঝে বণ্টন করে খারিজের ব্যবস্থা করো।’ এই নির্দেশনার পর খরচ হওয়া গোলাবারুদগুলো সব অফিসার ও ফোর্সদের মধ্যে বণ্টন দেখিয়ে এজাহার তৈরি করা ও রুজু করা হতো বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

এসআই মিজবাহ বলেন, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সকালে ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী যাত্রাবাড়ী থানায় আসেন। এ সময় আন্দোলন দমনে তিনি সবাইকে কড়া ভাষায় নির্দেশনা দেন। সেদিন যাত্রাবাড়ী থেকে চায়না রাইফেল, চায়না রাইফেলের গুলি, শটগান, শটগানের গুলি, পিস্তল, ম্যাগজিনসহ বুলেট, সিসা বুলেট, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ইস্যু করা হয়।

এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি। তাঁদের মধ্যে ৯ জন পলাতক। তাঁরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক এসআই সাজ্জাদ উজ জামান।

কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। আজ তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।