
‘যেদিন সে জন্ম নিছে, সেদিন থেকে এমনি নরমালে খাইতে পারে নাই। বুকের দুধও খাইতে পারে নাই। অনেক কষ্টে তারে আমি বাঁচাইছি।’
বাক্প্রতিবন্ধী মেয়েকে বড় করতে গিয়ে দিনের পর দিন এভাবেই লড়াই করেছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার নিয়তি ম্রোং। মেয়েকে শুধু বড়ই করেননি, পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিতও করেছেন। স্কুল–কলেজের পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে সুমনা ম্রোং এখন চাকরি করছেন। হাল ধরেছেন সংসারেরও।
গত ৩১ জুলাই ধোবাউড়া সদরের বণিকপাড়ায় বসে মেয়েকে বড় করার লড়াইয়ের কথা বলছিলেন নিয়তি ম্রোং।
তবে সুমনার এই পথচলা সহজ ছিল না। ছোটবেলায় স্কুলে গিয়ে পড়া বুঝতে পারলেও নিজের কথা শিক্ষককে বোঝাতে গেলেই তৈরি হতো সমস্যা। কথা বলার প্রতিবন্ধকতার কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক নানা বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। তবে মেয়ের পাশে ছিলেন নিয়তি। মেয়ের হয়ে কথা বলেছেন, তাঁকে বুঝিয়েছেন। প্রতিবন্ধী মেয়ে বলে অবহেলা করেননি। অন্য সন্তানদের মতোই বড় করেছেন।
বাক্প্রতিবন্ধী মেয়েকে বড় করতে গিয়ে দিনের পর দিন এভাবেই লড়াই করেছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার নিয়তি ম্রোং। মেয়েকে শুধু বড়ই করেননি, পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিতও করেছেন। স্কুল–কলেজের পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে সুমনা ম্রোং এখন চাকরি করছেন। হাল ধরেছেন সংসারেরও।
পরিবারের সমর্থনে এগিয়ে যাওয়া
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এত দূর আসার পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাই বলেছেন সুমনা।
সুমনা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী মানুষকে যদি তাঁর পরিবার প্রথমে সমর্থন না করে, সে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। সে ক্ষেত্রে আমার পরিবার আমার সঙ্গে ছিল। তারপরও আমি অনেকগুলো বাধা পেয়েছি।’
প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবহেলা ও কটুকথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। এসব পরিস্থিতিতে পরিবারই তাঁকে সাহস জুগিয়েছে।
সুমনা বলেন, ‘অন্যরা অনেক কথা বলবে। সেগুলো কানে তুলবে না—আমার পরিবার আমাকে এটাই বুঝিয়েছিল।’
পরিবারের এই সমর্থন আর নিজের অধ্যবসায়েই শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন সুমনা।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে যে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সুমনা তার একটি উদাহরণ। শুধু সুমনা নন, ধোবাউড়ায় এমন আরও কয়েকটি উদাহরণ পাওয়া গেল।
পরিবারের এই সমর্থন আর নিজের অধ্যবসায়েই শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন সুমনা।
এক পা হারান কৃষক জামাল
ধোবাউড়ার চারুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জামাল হোসেন। একসময় ঢাকার কারওয়ান বাজারে ডিমের ব্যবসা করতেন। ২০১২ সালে টাঙ্গাইল থেকে পিকআপে করে ডিম আনার সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এক পা হারান তিনি।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর বদলে যায় তাঁর জীবন। জামাল বলেন, ‘যখন আমি ডিমের ব্যবসা করছি, তখন এলাকার ভাই–বেরাদার, আত্মীয়স্বজন আমার কাছে যাইতো, তাদের টাকা–পয়সা দিতাম। যখন আমি অ্যাক্সিডেন্ট করছি, তখন সবাই আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কারণ, আমি একজন প্রতিবন্ধী।’
শুধু তা-ই নয়, বাইরে কোথাও যেতে হলেও পরিচিতদের অনেকে তাঁর সঙ্গে যেতে চাইতেন না। সময় নেই বলে এড়িয়ে যেতেন।
এই অবহেলা জামালকে দমাতে পারেনি; বরং ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প করেন। নিজের জমিতে শুরু করেন কৃষিকাজ।
প্রথমে নিজে কিছু বিনিয়োগ করেন। পরে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে তোলেন শাকসবজির খামার। এই কাজে তাঁকে প্রেরণা জোগান তাঁর স্ত্রী। সন্তানেরাও বাবাকে সাহস জুগিয়েছে। প্রতিবন্ধী বলে অবহেলা করেনি। দুঃসময়ে পরিবারকে পাশে পেয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে কাজ শুরু করেন জামাল।
এখন নিজের খামারে উৎপাদিত ফসলের পাশাপাশি অন্য কৃষকদের কাছ থেকে শাকসবজি কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন জামাল। সবজির একটি দোকানও ভাড়া নিয়েছেন। বাড়ির উঠানে আছে গবাদিপশু ও ছাগল। সব মিলিয়ে জামাল এখন পুরোদস্তুর কৃষক। কৃষিকাজের আয় দিয়ে এক ছেলে ও এক মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন। জামালের আশা—সন্তানদের সফলতা একদিন তাঁর জীবনের কষ্ট ভুলিয়ে দেবে।
যখন আমি ডিমের ব্যবসা করছি, তখন এলাকার ভাই–বেরাদার, আত্মীয়স্বজন আমার কাছে যাইতো, তাদের টাকা–পয়সা দিতাম। যখন আমি অ্যাক্সিডেন্ট করছি, তখন সবাই আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কারণ, আমি একজন প্রতিবন্ধী।ধোবাউড়ার চারুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জামাল হোসেন
ট্রাইসাইকেলে বদলে গেল রাজুর চলাফেরা
ধোবাউড়ার কলসিন্দুর গ্রামের যুবক রাজু শেখ। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবে এ জন্য পরিবারের সদস্যরা তাঁকে অবহেলা করেননি। গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশতে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মতো চিন্তা করতে দিয়েছেন। ফলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। নিজের মতো করে কিছু করার উৎসাহ জাগে।
ইচ্ছাশক্তি থাকলেও চলাফেরায় সমস্যা হতো তাঁর। একসময় বিয়ারিংয়ের গাড়িতে চড়ে চলাফেরা করতে হতো তাঁকে। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা তাঁকে একটি ট্রাইসাইকেল দেয়। এখন সেটিতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন রাজু।
নিজের একটি দোকানও দিয়েছেন। সেখানে বসে ব্যবসা করেন। নিজের কাজ নিজেই করছেন, আয়ও করছেন।
সুমনা, জামাল ও রাজুর গল্প আলাদা। কারও জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা, কারও জীবনে তা এসেছে দুর্ঘটনার পর; কিন্তু তাঁদের তিনজনের গল্পেই একটি বিষয় অভিন্ন—পরিবার, সমাজ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও নিজের জীবন গড়তে পারেন।
ইচ্ছাশক্তি থাকলেও চলাফেরায় সমস্যা হতো তাঁর। একসময় বিয়ারিংয়ের গাড়িতে চড়ে চলাফেরা করতে হতো তাঁকে। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা তাঁকে একটি ট্রাইসাইকেল দেয়। এখন সেটিতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন রাজু।
শুধু সহায়তা নয়, দরকার সমান সুযোগ
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারী। তাঁর মতে, সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভালো কিছু করতে পারেন। সমাজে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তাঁদের সফল হওয়ার গল্প যত বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরা যাবে, মানুষ তত বেশি সচেতন হবে।
নাজমুল বারী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কোনো পণ্য উৎপাদন করলে সেটি বিক্রির ক্ষেত্রেও তাঁদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় ব্যবসার কাঁচামাল কিনতে তাঁদের মাঠে যেতে হয়। এ জন্য তাঁদের উপযোগী পরিবহনব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা দেখতে হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ৪০ লাখের কিছু বেশি। তাদের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূল সমস্যা শুধু চাকরি নিশ্চিত করা নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিভিন্ন স্থানে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভবন নির্মাণের সময় এসব বিষয় নিশ্চিত করার জন্যও কাজ চলছে।
ধোবাউড়ার সুমনা মনে করেন, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের একটু উৎসাহ ও সহযোগিতা একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাঁর নিজের জীবনই তার উদাহরণ। পরিবারের সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই নানা বাধা পেরিয়ে তিনি দাঁড়াতে পেরেছেন।
ফারজানা শারমীন বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট) থেকে প্রতিবছর এসব এনজিওকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রণোদনার হার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে তাঁদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, প্রবেশগম্যতা ও বিচারগম্যতা তথা সম–অধিকারের বিষয়টি প্রাধান্য দিতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
ধোবাউড়ার সুমনা মনে করেন, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের একটু উৎসাহ ও সহযোগিতা একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাঁর নিজের জীবনই তার উদাহরণ। পরিবারের সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই নানা বাধা পেরিয়ে তিনি দাঁড়াতে পেরেছেন।