
আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? একজন জেন–জি হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমার চোখে ভেসে ওঠে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা। ঘটনাগুলো হয়তো খুব ছোট, কিন্তু আমার কাছে এগুলো একটি বড় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে দেশে একজন মানুষের সম্মান তাঁর পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, সেই দেশে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এ কথা কীভাবে বলি?
রাজশাহীর তানোরের দরগাডাঙ্গা এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আমার সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও আমাকে ভাবায়। দোকানের কর্মচারী আমাকে একটি ভালো কাপে চা দিয়েছিলেন। আমি দুই চুমুক দেওয়ার পর হোটেলের মালিক এসে আমার হাত থেকে কাপটি কেড়ে নেন। এরপর অন্য একটি পুরোনো, আলাদা কাপে চা দেন। ঘটনাটি আমাকে এতটাই অপমানিত করেছিল যে পরে আর চা খাওয়ার রুচি হয়নি। কাপ বদলে দেওয়ার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম এই উপলব্ধিতে যে আমার পরিচয়ের কারণে আমাকে অন্যদের থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে।
এই বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে। শুধু পরীক্ষার নম্বর, মুখস্থবিদ্যা কিংবা সনদ অর্জনের মধ্যে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
করোনাকালেও তানোরের কাসার দিঘি এলাকায় দিনমজুরের কাজ করতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমাদের গ্রামের কয়েকজন সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলাম। সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত পরিশ্রমের পর বিকেলে নাশতা হিসেবে মুড়ি, পেঁয়াজ ও মরিচ মাখিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু খাওয়ার জন্য আমাদের কোনো প্লেট বা বাটি দেওয়া হতো না। সারা দিন কাজের সময় সঙ্গে রাখা গামছার ওপরই নাশতা দেওয়া হতো; যদিও যাঁরা নাশতা পরিবেশন করতেন, তাঁরা নিজেরা গামলা বা প্লেটে করে খাবার নিয়ে আসতেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, আমাদের মধ্যে অনেকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। এর পরের দিন থেকে আমাদের প্লেট বা গামলায় নাশতা দেওয়া শুরু হয়।
এই ঘটনাগুলো আমাকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—একজন মানুষকে সম্মান পাওয়ার জন্য কেন তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের পরিচয় দিতে হবে? একজন দিনমজুরের কি সম্মানের সঙ্গে খাবার খাওয়ার অধিকার নেই? ক্ষুদ্র জাতিসত্তার একজন মানুষকে ভালোভাবে ব্যবহার করার আগে তাঁর পরিচয়, পেশা কিংবা পদমর্যাদা জানার প্রয়োজন কেন হবে?
রাজশাহীর তানোরের দরগাডাঙ্গা এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আমার সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও আমাকে ভাবায়। দোকানের কর্মচারী আমাকে একটি ভালো কাপে চা দিয়েছিলেন। আমি দুই চুমুক দেওয়ার পর হোটেলের মালিক এসে আমার হাত থেকে কাপটি কেড়ে নেন।
আমার কাছে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ মানে শুধু আইনের চোখে সমান অধিকার নয়; দৈনন্দিন জীবনেও সেই সমতার বাস্তব চর্চা। এখনো বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে খাবার দিতে অনীহা, আলাদা কাপ-গ্লাস ব্যবহার করা কিংবা অসম্মানজনক ভাষা ও সুরে কথা বলার মতো অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায়। কখনো কখনো আমাদের ভাষা ও পরিচয়কে বিদ্রূপের বিষয় করা হয়। এ অভিজ্ঞতাগুলো মনে করিয়ে দেয়, বৈষম্য দূর করতে শুধু আইন নয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে আত্মপরিচয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস রয়েছে। তাঁদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের যথাযথ স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংবিধানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হলেও অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রত্যাশা করেন। আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আত্মপরিচয় ও স্বীকৃতির দাবিকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত হবে। নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে এ দেশের প্রতিটি মানুষ যেন সমান মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সুযোগ নিয়ে বাঁচতে পারেন।
এই বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে। শুধু পরীক্ষার নম্বর, মুখস্থবিদ্যা কিংবা সনদ অর্জনের মধ্যে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বাস্তবমুখী দক্ষতা, গবেষণার আগ্রহ এবং যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে শুধু কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করবে না, বরং অন্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলবে।
একইভাবে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। একজন নারী যেন রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা নিজের ঘরে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ন্যায়বিচার এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। নারীর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি তাঁর মৌলিক অধিকার।
একজন জেন–জি হিসেবে আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে তরুণদের মতামত গুরুত্ব পাবে, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে।
আমাদের ভবিষ্যতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। তাই পরিবেশ রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও মানুষের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।
একজন জেন–জি হিসেবে আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে তরুণদের মতামত গুরুত্ব পাবে, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে। সরকারের সঙ্গে আমাদের সব বিষয়ে মতের মিল হবে, এমন প্রত্যাশা করি না; বরং মতের অমিল থাকলেও যেন যুক্তি দিয়ে কথা বলা যায়, সমালোচনা করা যায় এবং ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ থাকে। কারণ, দেশকে ভালোবাসার অর্থ তার সবকিছুর সঙ্গে একমত হওয়া নয়; দেশকে আরও ভালো করার জন্য প্রশ্ন করা ও দায়িত্ব নেওয়াও দেশপ্রেমের অংশ।
আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ শুধু বড় বড় সেতু, রাস্তা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে উন্নত হবে না; সেই বাংলাদেশ উন্নত হবে মানুষের আচরণ, ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ ও মানবিকতায়। যেখানে একজন দিনমজুর, একজন কৃষক, একজন শিক্ষার্থী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন মানুষকে সম্মান পাওয়ার জন্য নিজের সামাজিক অবস্থান প্রমাণ করতে হবে না, যেখানে মানুষের পরিচয় তাঁর মর্যাদা কমিয়ে দেওয়ার কারণ হবে না।
আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষকে তাঁর পদমর্যাদা দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হবে, যেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতি মর্যাদা পাবে; নারীরা নিরাপদ থাকবেন; শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখাবে; আর তরুণেরা নির্ভয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবেন। কারণ, মানুষের মর্যাদা তাঁর পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়; মানুষ হওয়ার মধ্যেই তাঁর মর্যাদা নিহিত।
খোকন হাঁসদা, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়