ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের এক পাশে নেটে ক্রিকেটের অনুশীলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি দল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের এক পাশে নেটে ক্রিকেটের অনুশীলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি দল

কান ধরে ওঠবস করানো শিশুরা মাঠে আর খেলতে আসেনি

আজ মঙ্গলবার বেলা সোয়া তিনটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের এক পাশে নেটে ক্রিকেটের অনুশীলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি দল। আরেকটি দল মাঠের মাঝামাঝি অনুশীলন করছে। মাঠে অন্য সময়ের মতো ছিল না কোনো কিশোর–তরুণ। এই মাঠে খেলতে আসা ‘বহিরাগত’ ২৫–৩০ শিশু–কিশোর–তরুণকে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও গত রোববার ভাইরাল হয়। কান ধরে ওঠবস করানোর পর থেকে ওই শিশু–কিশোরেরা মাঠে আর খেলতে আসেনি বলে জানালেন আজ মাঠে অনুশীলনে থাকা কয়েকজন।

যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেটিতে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্বমিত্র চাকমা লাঠি হাতে ২৫–৩০ জন কিশোর ও তরুণকে কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন। ভাইরাল এই ভিডিওর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের মুখে সর্বমিত্র চাকমা ডাকসু থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেও নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন একাধিকবার। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বমিত্র চাকমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদের সই করা চিঠিতে বলা হয়, একজন ছাত্র ও ডাকসু সদস্যের এ ধরনের আচরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তথা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ, সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের অধীনে। আজ মাঠটিতে এই প্রতিবেদক দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন।

ওরা আর আসেনি

আজ খেলার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তবিভাগীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা মাঠে অনুশীলণ করছিলেন। এসব শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিয়মিত খেলেন এই মাঠে। তেমন একজন মো. নাঈম হোসেন। তিনি মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রথম আলোকে বলেন, চার মাস ধরে তিনি নিয়মিত খেলছেন। ‘বহিরাগত’ কিশোর–তরুণদের কেউ কেউ আজিমপুর থেকে আসে, বেশির ভাগ আসে পুরান ঢাকা থেকে। যেখানে নেটে অনুশীলন চলছিল, সেদিকটা দেখিয়ে তিনি বলেন, দেয়ালের ওই পাশে একটি বাঁশ রেখে সেটা বেয়ে ওই ছেলেরা মাঠে ঢুকত। শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তিনি আর তাদের দেখেননি। আজকেও ওরা মাঠে আসেনি। তিনি বলেন, কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনাটি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের। ঘটনার পর থেকে ‘বহিরাগত’ শিশু–কিশোর ও তরুণদের মাঠে খেলতে আসা একেবারেই কমে গিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুশীলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি দল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র আজমাইন আদিবও মাঠে নিয়মিত আসেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ঘটনাটি এ মাসের শুরুর দিকের। যখন শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছিল, তখন তিনি মাঠে ছিলেন। তিনি ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি বলেন, ওই দিনের পর থেকে তিনি ওই শিশু–কিশোর–তরুণদের আর মাঠে খেলতে আসতে দেখেননি। এত মানুষের সামনে কান ধরে ওঠবস করানোর কারণে তারা খুব বিষণ্ন ছিল।

মাঠে অনুশীলন করতে আসা শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন, মানিব্যাগ, সাইকেল চুরির ঘটনা সত্য বলে জানান আজমাইন আদিব। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় বহিরাগতদের সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনাগুলো যখন ঘটেছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলে শিশুদের ‘শাস্তি’ দেওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না বলে তিনি মনে করেন।

আজমাইনের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহিত হাসান বলেন, যদি চুরি ঠেকানো যেত, তাহলে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনা ঘটত না।

এই তিন শিক্ষার্থী মনে করেন, সমস্যা সমাধানে কান ধরে ওঠবস করানো কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। মৌখিকভাবে কিছু বললেই হতো।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সর্বমিত্র চাকমা জিমনেসিয়ামে আসা কয়েকজন তরুণকেও কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে জিমনেসিয়ামে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, মাঠে ও জিমনেসিয়ামে কান ধরে ওঠবস করানোর বিষয়টি নিয়ে তাঁরা নিজেরাও বিব্রত। খেলার জায়গা না পেয়ে অনেকেই এখানে খেলতে আসে। এর মানেই তারা চুরির সঙ্গে জড়িত, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারের অনুমতি থাকলে কার্ড দেখে ঢুকতে দেওয়া উচিত। খেলার সময় শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন, মানিব্যাগের মতো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখার জন্য তালা দেওয়ার মতো বক্স কর্নার রাখা যেতে পারে। কিন্তু ‘বহিরাগত’, ‘বহিরাগত’ বলে বলে কাউকে অপদস্থ করার অধিকার কারও নেই।

ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা গেছে, ইনডোরে কেউ ভলিবল খেলছেন, কেউ ব্যাডমিন্টন খেলছেন। তাঁদের মধ্যে বহিরাগত কেউ আছেন কি না, জানতে চাইলে ওই ছাত্ররা বলেন, ‘মনে হয় না।’

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কার্ড দেওয়া হবে

ভাইরাল ওই ভিডিও নিয়ে সমালোচনার জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সর্বমিত্র চাকমা লিখেছিলেন, ‘এমন অনেক ঘটনা আছে অহরহ। প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে দেয়াল সংস্কারের ফাইল ফিরে আসে, বলা হয় বাজেট নেই। এদিকে প্রতিদিন আমাদের শিক্ষার্থীরা মোবাইল হারায়, মানিব্যাগ হারায়, সাইকেল হারায়। বারবার মানা করার পরও আসে, স্টাফদের ওপর ঢিল ছুড়ে পালায় দেয়াল টপকে। এদিকে দেয়ালও বেহাল। প্রশাসনের অসহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য এর চেয়ে আর কী করার আছে?’

সর্বমিত্রের করা এমন অভিযোগ এবং মাঠে ও জিমনেসিয়ামে হেনস্তার বিষয়ে জানতে চাইলে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুটো ভিডিওই আমি দেখেছি। বহিরাগত হলেই এমন আচরণ, এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। যে শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছিল, তারা খেলতেই এসেছিল।’ তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, এ লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কার্ড দেওয়া হবে। কার্ড পাঞ্চ করে তাঁরা প্রবেশ করতে পারবেন।

জিমনেসিয়ামের ইনডোরে ভলিবল খেলছে একদল শিক্ষার্থী

সর্বমিত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব পক্ষকেই আইন মেনে চলতে হবে। একতরফা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও দোষ দেওয়া যাবে না। দেয়াল ঠিক করার জন্য আর্থিক সংস্থান ছিল না, সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমস্যা সমাধানে পদ্ধতিগত উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। সেটা করতে গিয়ে কিছু বিষয় সামনে চলে এসেছে। যেমন নিরাপত্তাকর্মীদের কিছু গাফিলতি আছে, তাঁরা বহিরাগত ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ দিয়ে বাড়তি আয় করেন। আবার সাবেক ছাত্র পরিচয় দিয়ে অনেকে ধমক দিয়ে রাতে ঢুকে পড়েন, নিরাপত্তাকর্মীরা ভয়ে কিছু বলেন না।

সর্বমিত্র কারণ দর্শানোর চিঠির জবাব দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, সর্বমিত্র আজ চিঠি গ্রহণ করেছেন। ফলে এখন থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর জবাব পেয়ে কর্তৃপক্ষ করণীয় ঠিক করবে।

তেঁতুলতলা মাঠে খেলতে গিয়ে কান ধরে ওঠবস

২০২২ সালে রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে খেলাধুলা নিষেধ করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছিল কলাবাগান থানা–পুলিশ। এলাকার ছেলেরা বেড়া কেটে মাঠে প্রবেশ করে খেলাধুলা করলে শিশু–কিশোরদের কয়েকজনকে ধরে এনে কান ধরে ওঠবস করিয়েছিল পুলিশ। সেই মাঠে থানা ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আটক হয়েছিলেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সৈয়দা রত্না। একপর্যায়ে তাঁর কিশোর ছেলেকেও আটক করা হয়েছিল। হাজতখানায় মা–ছেলের আটক থাকার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় নাগরিকদের মধ্যে।

সৈয়দা রত্না আজ প্রথম আলোকে বলেন, একদিকে মাঠের সংকট, অপর দিকে সব মাঠে খেলার সুযোগ না থাকায় শিশুদের খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠটিতে আজিমপুর থেকেও শিশু–কিশোরেরা খেলতে যেত। খেলার মাধ্যমে শিশুরা আনন্দ পায়, তারা খেলতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে চুরির ঘটনা ঘটে থাকলে তা বন্ধে মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারতেন মাঠটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। সেটি না করে চুরির অভিযোগ করে শিশুদের খেলতে বাধা দেওয়া এবং কান ধরে ওঠবস করানো অমানবিক ও অন্যায়। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠগুলো এলাকার শিশুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খুলে দেওয়া উচিত। শিশুদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব সবার উপলব্ধি করা উচিত।