
সদ্য ঘোষিত জাতীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিতে নতুন করে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা তুলনামূলক বেশি হবে। কিন্তু যাঁরা ইতিমধ্যে চাকরিতে আছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে হিসাবটা ভিন্ন। চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের কারণে তাঁদের বেতন একেক রকম হবে।
বর্তমানে সরকারি চাকরির গ্রেড ২০টি। এর মধ্যে বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির চাকরি হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ নিয়োগ হয় নবম গ্রেডে। অন্যান্য নিয়োগ শুরু হয় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে। যেমন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে নিয়োগ হয়। আর প্রধান শিক্ষকের পদটি দশম গ্রেডের।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী নবম গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা। নতুন বেতনকাঠামোয় তা দ্বিগুণ হয়ে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। কোনো কোনো পদে যোগদানের সময় একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টও (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) দেওয়া হয়।
এর বাইরে মূল বেতনের নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া পান সরকারি চাকরিজীবীরা। যেমন ঢাকায় ৫০ শতাংশ, অন্য বিভাগীয় শহরে ৪৫ শতাংশ এবং জেলা শহরে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া পান চাকরিজীবীরা। তবে গ্রেড ও এলাকাভেদে এতে কিছু ভিন্নতা আছে। বাড়িভাড়ার বাইরে রয়েছে সবার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা। আরও আছে সন্তানের জন্য শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং সরকারি দায়িত্ব ও যাতায়াতের জন্য টিএ বা ডিএসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা। এবার সব কর্মকর্তা–কর্মচারীর জন্য মোবাইল ফোনের ভাতাও যুক্ত করা হয়েছে। তবে বেতন গ্রেড অনুযায়ী এসব ভাতা নির্ধারিত হয়।
গতকাল সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন বেড়েছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। মূল বেতন, ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হবে। কার্যকর হবে গত জুলাই থেকে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এত দিন চালু থাকা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ অবলুপ্ত বা বাতিল হয়ে যাবে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই থেকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। আর বাড়িভাড়াসহ নতুন সব ভাতা যোগ হবে চতুর্থ ধাপে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। তবে এই সময়ে আগের ভাতা থাকবে।
স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। এসব গ্রেডের জন্য প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হবে। তাঁরাও সব ভাতা পাবেন চতুর্থ ধাপে।
ধরা যাক, একজন নতুন চাকরিজীবী চলতি বছরের জুলাইয়ে নবম গ্রেডে যোগ দিয়েছেন। পুরোনো কাঠামোয় এই গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা। নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, তাঁর মূল বেতন প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ বেড়ে হবে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হবে। তখন মূল বেতন দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাই থেকে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হলে তখন মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা আগের বেতনকাঠামো অনুযায়ী পাবেন।
২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতাগুলো কার্যকর হবে। তখন ঢাকায় কর্মরত নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার ৪৪ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে ২২ হাজার টাকা যোগ হবে। এর সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষাসহায়ক, উৎসব ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে তখন তাঁর মোট বেতন-ভাতা কমবেশি ৭০ হাজার টাকা হতে পারে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়ার সুযোগ আছে।
সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি দশম গ্রেড করা হয়েছে। চাকরির শুরুতে এই গ্রেডের পুরোনো মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা শুরুতে হবে ৩২ হাজার টাকা। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন হবে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা।
প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বাড়লে ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে মূল বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন হবে ২৮ হাজার টাকা। তৃতীয় ধাপে আরও ৪ হাজার টাকা যোগ হলে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩২ হাজার টাকা।
এর সঙ্গে ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে বর্ধিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হবে। তখন এই গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তা বা প্রধান শিক্ষকের শুরুতে মোট বেতন-ভাতা ৫০ হাজার টাকার বেশি হবে।
তবে নতুন চাকরিজীবীদের তুলনায় পুরোনোদের ক্ষেত্রে হিসাবটা ভিন্ন। কারণ, তাঁদের বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধার ওপর মোট বেতন নির্ভর করবে।
এক যুগের বেশি সময় ধরে চাকরি করা ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে তাঁর মূল বেতন ২২ হাজার ৪৫০ টাকা। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মোট বেতন পান প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। নতুন বেতনকাঠামো সম্পর্কে যতটুকু জেনেছেন, তার ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব করে তিনি দেখেছেন, প্রথম ধাপে জুলাই থেকে সবকিছু মিলিয়ে তাঁর মোট বেতন ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। আর সব ধাপ ও ভাতা যোগ হয়ে পূর্ণাঙ্গ বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে তাঁর মোট বেতন হতে পারে ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি। তবে তিনি মনে করেন, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে তখন হিসাবটি স্পষ্ট হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে ৮০ শতাংশ নিয়োগ হয় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের পদটি ১৩তম গ্রেডের। এ গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু হতো। নতুন কাঠামোয় তা শুরু হবে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে। সময়ের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে এই মূল বেতন সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ২০২৮ সাল থেকে নতুন একজন সহকারী শিক্ষকের মোট বেতন-ভাতা ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি হবে।
তবে পুরোনোদের ক্ষেত্রে তা বেশি হবে। যেমন ১৭ বছর চাকরি করা নোয়াখালীর একজন সহকারী শিক্ষক জানিয়েছেন, পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে তাঁর মূল বেতন এখন ২০ হাজার ৮০০ টাকা। তিনি মাসে ভাতাসহ প্রায় ৩৩ হাজার টাকা পান। নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথম ধাপে তাঁর মূল বেতন দাঁড়াবে ২৭ হাজার ৩০০ টাকার কাছাকাছি। এর সঙ্গে আগের কাঠামোয় বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা পাবেন। এতে তাঁর মোট বেতন–ভাতা হতে পারে ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। আর সব ধাপ বাস্তবায়িত হলে তাঁর মোট বেতন–ভাতা দাঁড়াবে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
সরকারি চাকরিতে সদ্য ঘোষিত বেতনকাঠামোতে নতুন ও পুরোনোদের বেতন কত হবে, সে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে এ–সংক্রান্ত সরকারি আদেশ জারির পর।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, নতুন বেতনকাঠামো–সংক্রান্ত আদেশ অর্থ বিভাগ থেকে আগামীকাল বা পরশু জারি করবে। তখন সব বিষয় স্পষ্টভাবে জানা যাবে।