
কিছু আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নোট–বাণিজ্য (কোনো মামলায় হাইকোর্টের আদেশের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে) এবং অনৈতিক লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে বলে উল্লেখ করেছেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তদন্ত সাপেক্ষে এতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। আজ রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
এর আগে ২৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। সেদিন বিকেলে দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি যোগদান করেন। পরদিন ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং শুক্র ও শনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি।
এ হিসাবে আজ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের প্রথম কর্মদিবস। সহকর্মী আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সকালে মতবিনিময়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আইনজীবীদের মধ্যে আমাদের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস সম্পর্কে একটা নোট বাণিজ্যের অভিযোগ আছে।…আমরা রাষ্ট্রকে ডিফেন্ড (রক্ষা বা সমর্থন) করছি। এই নোট–বাণিজ্যের অভিযোগে আমাদের অনেক আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পিক অ্যান্ড চুজের অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি কিছু অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আছে। এ রকম কিছু ব্যক্তিকে আমরা সন্দেহের তালিকায় রেখেছি, যারা এসবে সম্পৃক্ত।’
ওই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত বা জড়িত থাকতে পারেন—এমন কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হয় তাদের অফিস খালি করতে বার্তা দেওয়া হবে, অথবা শেষবারের মতো সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে পদে থাকতে পারেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘দেশের মানুষের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বলতে চাই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমাদের অফিস (অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়) যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। বরং রাষ্ট্রের পক্ষে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, মানুষের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা। সুনিশ্চিত করতে গিয়ে অতিজনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা, যেন আমাদের মাঝে না থাকে।’
‘এত ডেপুটি–সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দরকার আছে কি’ শিরোনামে ১২ মার্চ প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ১০৩ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ২৩০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) রয়েছেন।
এ বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্রই অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ হলো। সরকার নিশ্চয়ই সামনে চিন্তা করবে—এই অফিস কার্যকরভাবে চালাতে কী সংখ্যক আইন কর্মকর্তা দরকার। এই নিয়োগ আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেওয়া হয়ে থাকে। আসলে কোন সময়ে কতজন আইন কর্মকর্তা দরকার, তা রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করে থাকেন। সরকার নিশ্চয়ই ওয়াকিবহাল আছে।
ইতিমধ্যে একটি মূলধারার পত্রিকায় এ ধরনের প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে উল্লেখ করে রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘এটি সরকারের একান্ত সিদ্ধান্ত। তবে সরকার আমাদের কোনো মতামত চাইলে অবশ্যই আমরা আমাদের মতামত দেব। যেহেতু নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আমি নই, সরকার মতামত চাইলে দেব। তবে আমি মনে করি, উই নিড আ কমপিটেন্ট অ্যাটর্নি সার্ভিস (আমাদের একটি দক্ষ অ্যাটর্নি সেবা প্রয়োজন)।’
সংসদ অধিবেশন চলছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন কী—এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, রাষ্ট্রকাঠামোতে রাষ্ট্রের তিনটি যে অঙ্গ, তারা স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। নির্বাহী বিভাগ তার মতো কাজ করে। সংসদ এত দিন ছিল না, এখন আছে। সংসদ কিন্তু সার্বভৌম। বিচার বিভাগের একটা অতিরিক্ত দায়িত্ব হচ্ছে যে নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের কোনো ভুল সংশোধন কোনো বিষয় যদি থাকে...তা সংশোধন করার বিষয়টি বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত।
অন্তর্বর্তী সময়ের (বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা) অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে একটা আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এখানে যেকোনো অধ্যাদেশ একইভাবে পাস করতে হবে, একইভাবে গ্রহণ করতে হবে—এটা কিন্তু সাংবিধানিক বিধান নয়। সরকার চাইলে সেগুলো সংশোধন করে, সংযোজন করে, নতুন আইন করেও করতে পারবে। আমার মনে হয়, নতুন সরকার দায়িত্ব পালন করছে, এই বিচার বিভাগের জন্য বেটার আমি বলব যে বেস্ট যেটি, তারা সেটি করবে। এটা আমার প্রত্যাশার জায়গা থেকে বলতে পারি।’
অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগের আগপর্যন্ত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়ে নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এখন তিনি পদাধিকার বলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বার কাউন্সিলে দীর্ঘসূত্রতা—এটা আমাদের পীড়া দেয়। এ জন্য দ্রুত সম্ভব চেষ্টা করতে হবে, যা আমি করব (যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা ও স্বপ্ন পূরণ করা)। কারণ, এ স্বপ্নের সঙ্গে শুধু তারাই না, তাদের পরিবারও কিন্তু সম্পৃক্ত। আমাদের প্রত্যেকের (আইনজীবী) জীবনে এই ধাপ এসেছে। আমরা যে ধাপটি উত্তরণ করে আজকে এ জায়গায় এসেছি, যদি সেই কষ্ট তরুণ একজন আইনের শিক্ষার্থী, যার আইনজীবী হওয়ার আগ্রহ, তা যদি ভুলে যাই, তাহলে খুব কষ্টকর হবে।’
প্রথম কর্মদিবসে আজ বেলা আড়াইটার দিকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা, মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক।