
কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের দায়িত্ব সেই বাহিনীকেই দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘অপরাধীই যদি তদন্তকারী হয়, ন্যায়বিচার হবে কীভাবে?’
‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুমসংক্রান্ত আইন (খসড়া): প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা তাজুল ইসলাম। আজ বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে ‘নাগরিক কোয়ালিশন’ ও ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’।
প্রস্তাবিত আইনে বাহিনীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম।
প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুমসংক্রান্ত আইনের খসড়ার প্রসঙ্গ তুলে তাজুল ইসলাম বলেন, আইনগুলোতে তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে দেওয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও বাহিনীর কর্মকর্তা—উভয় পক্ষকেই ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘নো ম্যান শ্যাল বি আ জাজ ইন হিজ ওন কজ।’ অর্থাৎ কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারেন না।
গুমসংক্রান্ত আইনটি তৈরির ক্ষেত্রে গুম কমিশন, ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার, নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আইনটি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছিল, সংশোধন করা হয়েছিল। ১৭–১৮টি অধিবেশনে পর্যালোচনা করে আইনটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটি ‘ল্যাপস’ করিয়ে নতুন আইনে তদন্তের দায়িত্ব বাহিনীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তাজুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই কীভাবে সেই অভিযোগের তদন্ত করবে?
তাজুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইনে কারাদণ্ডের ঝুঁকি আছে। এতে এমনিতেই ‘ট্রমার’ মধ্যে থাকা পরিবারগুলো অভিযোগ করতে আরও ভয় পাবে।
তাজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোও গুম ও জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিতভাবে সহযোগিতা করছে না। তবে আয়নাঘর ও গুমের বিভিন্ন ঘটনায় আদালতে সাক্ষীরা বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন।
গুমের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা জাতি যেন ভুলে না যায়।
প্রস্তাবিত আইনগুলো সংসদে পাস না করে পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাজুল ইসলাম। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা যেন এই আইনের পক্ষে ভোট না দেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তরুণদের আত্মত্যাগের পর এমন আইন করা উচিত নয়, যা আবার গুমের ভয় ও সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুম–সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’–এর সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সাবেক গুম–সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন, মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, অলটারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন, গুমের শিকার ফাহাদ চৌধুরী দিপু, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক সমন্বয়ক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, দৈনিক ওয়াদার ম্যানেজিং এডিটর ফয়সাল মাহমুদ, সাবেক পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য জারিফ রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন প্রমুখ।