
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি–সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আজ বৃহস্পতিবার একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেওয়ার পর এনসিটি পরিচালনায় চুক্তি–সম্পর্কিত পুরো প্রক্রিয়ায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রিট আবেদনকারী পক্ষ। শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক ‘নো অর্ডার’ দেন।
রিট আবেদনকারীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পর চুক্তিপ্রক্রিয়ার ওপর স্থিতাবস্থা চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়। আদালত নিয়মিত লিভ টু আপিল করতে বলেছেন। যেহেতু বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন, সে ক্ষেত্রে সরকারের এ বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে এনসিটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত স্থগিত করার দাবিতে আগামী শনি ও রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল।
আজ সকালে চট্টগ্রামের এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর তারা দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে। এতে সিবিএর সাবেক নেতা-কর্মীরাসহ কর্মচারীদের একাংশও অংশ নেয়।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন বলেন, শনিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করা হবে। রোববার একইভাবে আট ঘণ্টা প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তিনি বলেন, সরকার যদি এনসিটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল না করে, তাহলে রোববার বিকেলের পর থেকে বন্দর অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি–সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে রিট আবেদনটির ওপর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে বিভক্ত রায় হয়। দ্বৈত বেঞ্চের বিভক্ত রায়ের পর বৃহস্পতিবার রিট খারিজ করে রায় দিলেন বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ।
রায় ঘোষণার পর চুক্তি–সম্পর্কিত পুরো প্রক্রিয়ায় স্থিতাবস্থা চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রিট আবেদনকারী পক্ষ। বিকেলে শুনানি হয়। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব এবং আইনজীবী আনোয়ার হোসেন শুনানিতে ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী শুনানিতে ছিলেন।
পরে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক প্রথম আলোকে বলেন, রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিটটি খারিজ হয়ে গেছে। এরপর চুক্তি–সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার ওপর স্থিতাবস্থা চেয়ে রিট আবেদনকারী পক্ষ চেম্বার আদালতে আবেদন নিয়ে যান। চেম্বার আদালত নো অর্ডার দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। ফলে সরকারের চুক্তি–সম্পর্কিত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
যদিও রিট আবেদনকারীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় সরকারের এ বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুনানিতে চেম্বার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে যে, হাইকোর্টের রায়ের ওপর যদি স্থিতাবস্থা না দেওয়া হয় তাহলে সরকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যাবে। আদালত বলেছে, পূর্ণাঙ্গ আপিল দাখিল করতে। তখন আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, যদি স্থিতাবস্থা না দেওয়া হয় তাহলে চুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। তখন আদালত প্রথমিকভাবে বলেছেন যে কোনো কিছু হবে না, আপনারা আপিল ফাইল করে আসেন।’
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ২০০৭ সালে নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
চালু এই টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক হয়।
এ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন গত বছর রিট করেন।
বর্তমানে এই টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগপর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের এই টার্মিনাল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।