
‘প্রথম চাপে ৩০ টেকার গ্যাস পাইছিলাম। এত অল্প গ্যাসে তো এক ঘণ্টাও গাড়ি চলব না। আবদার কইরা আবার নিছি, এখন আরও ৩০ টেকার পাইছি। মোট ৬০ টাকার অইল। অহন আর পামু না। যা পারি এই গ্যাসে চলব। শেষ হইলে আবার লাইন ধরব।’
আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীর সাহিল ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন আবুল বাশার।
আবুল বাশার যাত্রাবাড়ী থেকে এসে সকাল সাড়ে আটটায় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আড়াই ঘণ্টা পর দুই দফায় পেয়েছেন মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস। এমন পরিস্থিতি তিন সপ্তাহ ধরে চলছে। কখনো কখনো চার-পাঁচ ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্যাসের জন্য।
শুধু আবুল বাশার নন, রাজধানীর সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের এখন দিনের বড় অংশ কাটছে গ্যাসের অপেক্ষায়। এতে কমেছে আয়, বাড়ছে ঋণ; কারও ঘুম হারাম, কারও পরিবারে টাকা পাঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত পাঁচটি সিএনজি ফিলিংস্টেশন ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও মধ্যরাত থেকে, কোথাও ভোর থেকে গাড়ি নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। সিএনজি স্টেশনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি, ছোট পিকআপ ভ্যানসহ নানা ধরনের গাড়ির দীর্ঘ সারি।
ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদেরও একই কথা—গ্যাসের চাপ কম। তাই গাড়িতে চাহিদামতো গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না।
শ্যামলীর সাহিল ফিলিং স্টেশনের কর্মী আবদুল্লাহ বলেন, ‘গাড়িচালকেরা নাশতার জন্য টাকা দিতে চায়। গ্যাস যেন একটু বাড়ায়া দেই। কিন্তু দেব কই থেইকা। গ্যাসের তো চাপ নাই।’
গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে শুধু সময় নয়, অনেকেই হারাচ্ছেন আয়ও। কিন্তু গাড়ির মালিককে প্রতিদিনের জমা ঠিকই দিতে হচ্ছে।
আবুল বাশার বলেন, ‘তিন দিন ধইরা আয় নাই। কত চালাইলাম, সেটা বিষয় না। প্রতিদিন মালিকের জমাটা দিতে অইব। নইলে পরের দিন গাড়ি পামু না।’
সব খরচ বাদে আগে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো বাশারের। কিন্তু গত কয়েক দিন গ্যাস-সংকটে গাড়ির মালিককে জমা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। সিএনজি চালিয়েই বাশারের পরিবারের খরচ চলে। বাড়ি বরিশালে। সেখানে স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মা আছেন। গ্যাস-সংকটে আয় কমে যাওয়ায় এক মাস ধরে পরিবারকে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।
দুশ্চিন্তা নিয়ে আবুল বাশার বলেন, ‘এক মাস অইল, তেমন টেকাপয়সা দিতে পারি না বাসায়। এমনে আর চলতাছে না।’
কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষা করছিলেন উবারে গাড়ি চালানো মোহাম্মদ বাবুল। বাড্ডা থেকে এসেছেন তিনি। আগের দিন সারা দিন গাড়ি চালিয়ে রাত ১২টায় গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
শুনেছিলেন, খালেক ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ তুলনামূলক ভালো। তাই সেখানে এসেছিলেন। কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল হলেও গ্যাস পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ স্টেশনের মেশিনে সমস্যা দেখা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় গ্যাস সরবরাহ।
দুপুর ১২টার দিকে বাবুলের গাড়িতে আর গ্যাস ছিল না। অন্য কোনো স্টেশনে যাওয়ার মতো জ্বালানিও নেই। কখন গ্যাস পাবেন, সেটিও নিশ্চিত নন।
বাবুল বলেন, ‘এক মাস ধইরা এমন চলতেছে। কখনো চার ঘণ্টা, কখনো পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করে গ্যাস পাই। এমনে অপেক্ষা কইরা গাড়ি চালাই কখন?’
বাবুল জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে বেশির ভাগ রাতেই বাসায় যেতে পারেননি তিনি। দিনে গাড়ি চালান, এরপর রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়ান। কখনো ভোররাতে, কখনো সকালে বাসায় ফেরেন। কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করে আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
এই গাড়িচালক বলেছেন, গতকাল রাতে খেয়েছেন কলা আর রুটি। আজ সকালেও একই খাবার। আগে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকার গ্যাস নিতেন। সংকট শুরু হওয়ার পর কখনো ৩০০, কখনো ৫০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন।
‘এমন চলতে থাকলে গাড়ি বন্ধ কইরা রাস্তায় নামতে অইব। কার কাছে যাব? কে উদ্ধার করবে এই বিপদ থেকে? পথ দেখতাছি না কোনো।’—এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাবুল।
খালেক ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার আব্দুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহে সময় বেশি লাগছে। এর মধ্যে মেশিনে সমস্যা হওয়ায় কিছু সময় গ্যাস দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ কেন—জানতে চাইলে খালেক ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার আবদুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহে সময় বেশি লাগছে। এর মধ্যে মেশিনে সমস্যা হওয়ায় কিছু সময় গ্যাস দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেশিন ঠিক হলে আবারও গ্যাস দেওয়া শুরু হবে।
গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে চালকদের আয়ে। গাড়ি যতক্ষণ রাস্তায় থাকে, ততক্ষণই আয়। অথচ দিনের বড় একটি সময় এখন কেটে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে।
গাবতলীর নন্দারবাগ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় শাহ আলমের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি কুমিল্লায়। স্ত্রী, সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবার তাঁর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল।
শাহ আলম বলেন, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে জমা দিতে হয় ১ হাজার ১০০ টাকা। গ্যাস, খাবারসহ সব মিলিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতে প্রতিদিন তাঁর খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় আগের মতো আয় করতে পারছেন না।
এ কারণে গ্রামের একটি সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করেছেন শাহ আলম। তিনি বলেছেন, ‘আয় থাকলে কি ঋণ করতাম?’
শাহ আলম আরও বলেন, প্রতি মাসে বাড়িতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পাঠাতে হয় তাঁকে। কিন্তু গত মাসে সেই টাকা জোগাড় করতে পারেননি। সমিতি থেকে নেওয়া ১৫ হাজার টাকা ঋণ এই মাসে শোধ করার কথা ছিল। আয় না বাড়ায় সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
‘এই মাসেও ঋণ করতে হবে। এ ছাড়া চলব কীভাবে? পরিবাররে তো আর না খাওয়া রাখন যাইব না।’—এভাবেই কথাগুলো বলেছেন নিরুপায় শাহ আলম।