গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) বদিউজ্জামান তপাদার, সানজিদা ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান ও নূর খান। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) বদিউজ্জামান তপাদার, সানজিদা ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান ও নূর খান। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল আলোচনা

ইচ্ছামাফিক গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ‘আর্বিট্রারি অ্যারেস্ট’ বা ইচ্ছামাফিক গ্রেপ্তারের ঘটনা যেন স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় অনেক ক্ষেত্রে কারণ জানানো হয় না। ‘ওপরের নির্দেশে গ্রেপ্তার’ বা ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকের’ মতো বেআইনি চর্চা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই সংস্কৃতি বন্ধে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়াকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি বিচারিক তদারকি ও স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ও আটক: আইনি কাঠামো ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা থেকে এ বক্তব্য উঠে আসে। রিড্রেসের সহায়তায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে।

কোন সংস্থা কীভাবে কাজ করবে, তাদের ক্ষমতার সীমা কোথায়, এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
সানজিদা ইসলাম, সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক

আলোচনায় অংশ নিয়ে নারী আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি) বলেন, আইনবহির্ভূত গ্রেপ্তার ও আটকের চর্চা রাষ্ট্রকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়। বিগত বছরগুলোতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বহু ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে যে কারও মুঠোফোন ট্র্যাক করা বা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সহজ হয়ে পড়ে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সানজিদা ইসলাম বলেন, অনেককে বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হলেও পরে রাষ্ট্র সেই ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে। বছরের পর বছর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষা করেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো তথ্য পায়নি। এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে প্রতিটি সংস্থার কার্যপরিধি ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোন সংস্থা কীভাবে কাজ করবে, তাদের ক্ষমতার সীমা কোথায়, এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

নিজের গুম হওয়ার কষ্টের স্মৃতি তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান। তিনি নিজেকে শুধু একজন রাজনীতিক নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার একজন ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবেই সবচেয়ে বেশি পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বলে উল্লেখ করেন। ‘ভুক্তভোগী’ পরিচয় ধরে রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য কাজ করার দায়বোধ তৈরি হয়।

মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমদের সংসদ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই সংসদে খুব কম সংসদ সদস্য আছেন, যাঁরা নিজেরা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হননি। গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা দুটি অধ্যাদেশ ভুক্তভোগীদের জন্য আশার জায়গা তৈরি করেছিল। কিন্তু এগুলো বাতিলের সুপারিশ দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক নামে যে প্রথা চালু রয়েছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গুম-সংক্রান্ত খসড়া আইনে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে উল্লেখ করে মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, সরকারের অনুমতির শর্ত থাকলে সেই তদন্ত কার্যকর হবে না। অধিকাংশ অভিযোগই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে এসেছে। ফলে তদন্তের জন্য সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হলে ভবিষ্যৎ ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ‘আর্বিট্রারি অ্যারেস্ট বা ইচ্ছামাফিক গ্রেপ্তার’ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। এখনো এটি স্বাভাবিক চর্চা মনে করা হয়। অনেক সময় গ্রেপ্তারের সময় কারণ জানানো হয় না। কাউকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর পরিবার অনেক সময় জানতে পারে না তিনি কোথায় আছেন, কোন মামলায় আটক আছেন কিংবা আদৌ তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কি না। অথচ আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, লিখিত অনুমোদন দেখানো এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক’ নামে যে প্রথা চালু রয়েছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ডিবি বা অন্যান্য সংস্থার কার্যালয়ে আসামি রাখারও কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ‘থানা ছাড়া অন্য কোথাও আসামি নয়’—এই নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

গ্রেপ্তার, আটক ও হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও অনিয়মের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। এটি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন মাত্রায় প্রকট হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের পর থানায় নেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ব্যতিক্রমী চর্চা গড়ে উঠেছে। পুলিশের কিছু সদস্য ব্যক্তিগত বা অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্যাতন, অর্থ আদায়সহ গুরুতর অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়েছেন। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বিচারিক পর্যবেক্ষণের ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সময় গ্রেপ্তারের প্রকৃত প্রক্রিয়া বা সময় সম্পর্কে যথাযথ প্রশ্ন করা হয় না। ফলে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়।

রাষ্ট্র নিজেই যখন নাগরিক নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেন রাজনীতিক ও অধিকারকর্মী তাসনীম জারা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই দুর্বল, ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে তাসনীম জারা বলেন, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে কোথায়, কতটা এবং কত সময় ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব, আইনজীবী হুমায়রা নূর বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের নিপীড়নমূলক আচরণ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বদিউজ্জামান তপাদার, মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান, ব্লাস্টের পরিচালক (লিগ্যাল) মো. বরকত আলী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ব্লাস্টের প্যানেল আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল ও প্রিয়া আহসান চৌধুরী এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক শাহরিয়ার সাদাত।